কত রকম কয়েদি যে দেখেছি তার লেখাজোখা নেই। তখন বার্মা ছিল ইন্ডিয়ার একটা প্রভিন্স। সেই সময়ের অখণ্ড বাংলাদেশে যত বাঙালি ছিল তার চারভাগের একভাগ বার্মায়। সেখান থেকে বাংলাদেশের তুলনায় দ্বিগুণ কয়েদি আসত কালাপানিতে।
এক বর্মি কয়েদিকে দেখেছি ঘানিটানা, রাস্তার পাথর ভাঙা বা ছোবড়া পেটার ভয়ে সেলের ভেতর উলঙ্গ হয়ে সারা গায়ে কাঞ্জি মেখে বসে থাকত। যেন বদ্ধ পাগল। আরেকজন, কোন। প্রভিন্সের মনে নেই গায়ে বিষ্ঠা মেখে থাকত। দুর্গন্ধে টেকা দায়। এই ধরনের সেয়ানা পাগলরা কিন্তু কাজের কাজটি গুছিয়ে নিতে পারত। জেল অথরিটিকে ধোঁকা দিয়ে ডিউটি মকুব করিয়ে নেওয়ার ফন্দিটা তারা ভালোই বের করেছিল।
আরেক রবিবারের কথা মনে পড়ে। মুকুন্দ আর আমি বিকেল বেলায় অলিন্দে ঘুরছিলাম। আন্দামান নিকোবর ম্যানুয়েল অনুযায়ী এখানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে পুরো পঁচিশ বছর কাটাতে হয়। সেই দণ্ডাদেশ দিয়েই আমাদের এখানে পাঠানো হয়েছে। তাই নিয়েই দুজনে কথা বলছিলাম। বৈজু ছুটির দিনের বিকেলটা আমার সঙ্গে কাটায়। আজ সে নেই। নিচের চত্বরে অন্য কয়েদিদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গেছে। ওপরের অলিন্দ থেকে তাকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।
হঠাৎ নিচে হইচই শোনা গেল। কয়েদিদের মধ্যে বেশ চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। মুকুন্দ আর আমি অলিন্দের ধারে-রেলিংয়ের কাছে চলে এলাম। চোখে পড়ল, একটা কয়েদিকে কোমরে শিকল এবং হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে চত্বরের বাঁদিক থেকে ডাইনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তার সামনে মাইকেল স্কট। পেছনে জনা ছয়েক রাইফেলধারী পুলিশ। এদেরই একজন কয়েদিটার কোমরে বাঁধা শেকলের একটা প্রান্ত ধরে আছে।
আন্দামানে আসার পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। এর ভেতর বহু কয়েদিকে চিনে গেছি। তাদের সঙ্গে আলাপসালাপও হয়েছে। কিন্তু এই কয়েদিটাকে আগে আর কখনও দেখিনি। এই ছুটির দিনে কেন, তাকে এভাবে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কী তার অপরাধ, কিছুই বুঝতে পারছি না। অবশ্য এই সৃষ্টিছাড়া জেলখানায় নিয়মকানুনই আলাদা। সামান্য পান থেকে চুন খসলেই ডান্ডাবেড়ি, খানা বন্ধ ইত্যাদি।
আমরা অবাক, তাকিয়ে আছি। ওই কয়েদিটা ইন্ডিয়ার কোন প্রভিন্সের লোক বোঝা যাচ্ছে না। দাড়িটারি দেখে পাঠান এবং শিখদের চেনা যায়। এর গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি থাকলেও সে শিখ বা পাঠান কোনওটাই নয়। বর্মিও না। তাদের মঙ্গোলিয়ান চেহারা। সে যেই হোক, মনটা খারাপ হয়ে গেল। শেকল হাতকড়া পরিয়ে যখন আনা হয়েছে তখন মাইকেল স্কট এর কী হাল করে ছাড়বে ভাবতেই মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল।
অন্য কয়েদি যারা আমাদের অচেনা কয়েদিটাকে দেখে শোরগোল বাঁধিয়ে দিয়েছিল আচমকা তাদের জটলা থেকে বৈজু দৌড়ে আমাদের ব্লকের দিকে আসছে। কোনও চাঞ্চল্যকর খবর থাকলে বৈজু আমাকে জানাবেই জানাবে। তার মুখে সেলুলার জেল সম্বন্ধে অনেক কিছুই জানতে পেরেছি। নিশ্চয়ই সে আমাদের কাছে আসছে। আমরা উগ্রীব হয়ে রইলাম।
একটু পরেই হাফাতে হাফাতে উঠে এল বৈজু। প্রবল উত্তেজনার সুরে বলল, ভাইসাব, লছমন ধরা পড়েছে। আমি বেশ ধন্দে পড়ে গেলাম। ইন্ডিয়ার মেনল্যান্ডে কেউ মারাত্মক ক্রাইম করে ধরা পড়লে এবং কঠোরতম সাজা হলে তবেই তাকে আন্দামানে নির্বাসনে পাঠানো হয়। এখানে আবার ধরা পড়বে কী? ব্যাপারটা বোধগম্য হল না। বৈজুকে জিগ্যেস করতে সে জটটা ছাড়িয়ে দিল। লছমন উত্তর প্রদেশের লোক। ইলাহাবাদের কাছে তার বাড়ি। ছবছর আগে দু দুটো খুন করে যাবজ্জীবন কালাপানির সাজা খাটতে সে আন্দামানে এসেছিল। প্রথমদিকে বেশ শান্তশিষ্ট ছিল সুবোধ বালকের মতো জেলখানার যাবতীয় নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলত। গোড়ায় গোড়ায় তাকে অন্য কয়েদিদের মতো ছোবড়া পিটে তার বের করতে বা ঘানি ঘুরিয়ে নারকেল তেল বের করতে হত। মুখ বুজে সে তাই করে যেত। বছর চারেক পর লছমনকে ফরিস (ফরেস্ট) ডিপার্টমেন্টে ডিপটি (ডিউটি) দেওয়া হয়। সকালে তাকে জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হত। সন্ধের আগে আগে জেলখানায় ফিরিয়ে আনা হত। পরে জঙ্গলেই বনবিভাগের সরকারি কর্মীদের সঙ্গে থাকত। অবশ্য তার মতো আরও কয়েকজন কয়েদিও আগে থেকে সেখানে ছিল। যারা জেলারের আস্থাভাজন, তিনি মনে করেন এরা কোনও গোলমাল পাকাবে না, তাদের জেলের বাইরে নানা ধরনের ডিউটি দিয়ে ব্যারাক বা তাবু খাটিয়ে থাকার ব্যবস্থা করা ইত। আসল ব্যাপারটা হল, বর্মা থেকে নর্থওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স পর্যন্ত বিশাল দেশ থেকে তিন চার মাস পর পর জাহাজ ২ বোঝাই কয়েদিরা আন্দামানে আসত। সেলুলার জেলে এত কয়েদির থাকার মতো কুঠুরি কোথায়? তাদের জন্য তাহলে নতুন নতুন জেলখানা বানাতে হয়। যাই হোক, জঙ্গলে লছমন এবং অনেক কয়েদিকে বিরাট বিরাট গাছ কাটার ডিপটি দেওয়া হয়েছিল। খুব মনোযোগ দিয়ে কাজটা করত সে। মাসছয়েক ঠিকঠাক চলছিল। তারপর আচমকা একদিন সে উধাও হয়ে যায়। জেলার সাহেব লছমনকে ভাগোয়া (পলাতক) কয়েদি হিসেবে ঘোষণা করেন। চারদিকে তোলপাড়। পুরো দক্ষিণ আন্দামানের কোণে কোণে লছমনের খোঁজ চলতে থাকে। কিন্তু সে বিলকুল বেপাত্তা। মাসের পর মাস কাটতে থাকে। সবাই আসা ছেড়ে দিয়েছিল কিন্তু জেলার সাহেব ভীষণ জেদি। একজন কয়েদি তাঁর হেফাজত থেকে পালিয়েছে, এটা একটা বে-ইজ্জতির ব্যাপার। পুলিশের ওপর চাপ বাড়তে লাগল, যেমন করে পার, যেখান থেকে পার লছমনকে ধরে আনো।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।