ঘানিঘরে এসে অন্য কয়েকজন বিপ্লবীর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তারা হলেন ঢাকার ব্রজ চক্রবর্তী, ময়মনসিংয়ের রাখাল দত্ত, মেদিনীপুরের চিত্তরঞ্জন পাল এবং আরও চার পাঁচজন। এঁরা সবাই আমার আর মুকুন্দর চেয়ে বয়সে বড়। তাদের আমরা দাদা বলতাম। ওঁরা থাকতেন চার আর পাঁচ নম্বর ব্লকে। ব্রজদা ছিলেন খুবই মজাদার মানুষ। হাসিখুশি। প্রথম দিন আলাপ পরিচয়ের পর জিগ্যেস করলেন, আন্দামানের জেলে কতদিন কাঞ্জি নামে উপাদেয় লাপসি ভক্ষণ করছ? অর্থাৎ আমরা এখানে কতকাল আছি সেটাই তার জিজ্ঞাস্য। কেননা পাশাপাশি ব্লকে থাকলেও ঘানিঘরে ঢোকার আগে কারও সঙ্গে কারও দেখা হওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সেলুলার জেলে পা দিয়েই শুনেছিলাম, আরও কয়েকজন কয়েদি এখানে আছেন। খুব সম্ভব খবরটা বৈজুই দিয়েছিল। ব্রজদাকে বললাম, কয়েক মাস খাচ্ছি। আপনারা? ব্রজদা বললেন, তিন বছর। তা এখানে কেমন লাগছে? আমার মুখে একটু হাসি ফুটেছিল। তাতেই উত্তরটা ছিল। ব্রজদা আমাকে চাঙ্গা করার জন্য বললেন, মোটেও মন খারাপ করবে না। ভাববে এটাই স্বর্গ সুখ।
রবিবার আমাদের ঘানি ঘোরাতে হত না। তবে সব কয়েদিকে চত্বরের কল থেকে বালতি বালতি জল টেনে এনে ব্লকের সেল, অলিন্দ ধুয়েমুছে ঝকঝকে তকতকে করে রাখতে হত। কোনও কোনও রবিবার জেলার কি জেল-সুপারিনটেনডেন্ট হঠাৎ হঠাৎ ইন্সপেকশনে আসতেন। সেজন্য এই ব্যবস্থা।
রবিবার বিকেলের দিকটা ছুটি। অন্য দিন ডিউটির সময়টা ঘানিঘরে কাটত, বাকি সময় সেলে। কিন্তু রবিবার বিকেলে কুঠুরিতে বন্দি থাকতে হত না। বিপ্লবীদের যার যার ফ্লোরের অলিন্দে ঘোরাঘুরির পারমিশন ছিল; কিন্তু তার বাইরে যাবার হুকুম ছিল না। তবে সাধারণ কয়েদিদের বেলায় কোনও বাধা নেই। তারা চত্বরে নেমে গিয়ে আড্ডা জমাত।
জেলখানার একঘেয়ে ক্লান্তিকর জীবনে একবার অদ্ভুত দুটো বই হাতে এসেছিল৷ আলির সঙ্গে হনুমানের লড়াই আর সোনাভান বিবির কেচ্ছা। বাজে নিউজপ্রিন্টে ছাপা, এক বিঘত, মাপের চটি বুকলেট। কারা দিয়েছিল, কীভাবে জেলে এসেছিল, মনে নেই। আলির সঙ্গে হনুমানের যুদ্ধ-এ কে শ্রেষ্ঠ তা প্রমাণ করার চেষ্টা ছিল। আমি অবাক হয়ে গেছি।
এক ছুটির বিকেলে আমাদের দোতলার অলিন্দে রেলিংয়ে হাতের ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। পাশে বৈজু। হঠাৎ চোখে পড়ল এক শা-জোয়ান মুসলমান কয়েদি এবং এক হিন্দু কয়েদি কুস্তির তোড়জোড় করছে। দুজনকে ঘিরে অন্য কয়েদিরা গোলাকার সার্কল তৈরি করে বসে আছে। তাদের চোখেমুখে তীব্র উত্তেজনা।
সেলুলার জেলে আসা ইস্তক এমন বিচিত্র ঘটনা আগে আর চোখে পড়েনি। কী কারণে এই মল্লযুদ্ধ? দেখলাম বৈজু তা জানে। সে মুসলমান এবং হিন্দু দুই প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েদিকে দেখিয়ে বলল, ওর নাম লিয়াকত আর ও হল ধনিরাম। ওদের মধ্যে বাজি দি হয়েছে। কী বাজি, না যে লড়াইয়ে জিতবে তাকে অন্যের ধর্ম নিতে হবে।
এমন উদ্ভট, আজগুবি পণের ব্যাপার আমার চোদ্দো পুরুষে কেউ কোনও দিন শোনেনি। নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস হচ্ছিল না।
ওদিকে লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল। একে অন্যের মাথায় মাথা ঠেকিয়ে প্রবল মুষ্ঠিতে একে অন্যের হাত ধরে, হাঁটুতে শরীরের সবটুকু শক্তি জড়ো করে ঠেলছে। কেউ তিন পা পিছোচ্ছে, কেউ পাঁচ পা। এইভাবে ভিড়ের দিকে চলে যাচ্ছে। তারপর আবার ঠেলাঠেলি করতে করতে সার্কেলের মাঝখানে চলে আসছে। ঘামে দুজনেরই উর্দি ভিজে উঠেছে। কিন্তু কেউ হটতে রাজি নয়। দুজনেরই মরণপণ প্রতিজ্ঞা কোনওভাবেই হারবে না। প্রাণ গেলেও ওই যুদ্ধ জিততেই হবে।
চারপাশের দর্শকরা সমানে উন্মাদের মতো চিৎকার করে দুজনকেই উৎসাহ দিয়ে চলেছে। আমার চোখের পাতা পড়ছিল না। শেষ পর্যন্ত কী হত, জানি না। আচমকা এমন এক লড়াইয়ের খবর পেয়ে চত্বর কাঁপিয়ে দৌড়তে দৌড়তে পুলিশ অফিসার মাইকেল স্কট এসে হাজির। তাঁর পেছন পেছন এক দঙ্গল রাইফেলধারী পুলিশ।
ইংরেজি সিনেমার বুল ফাইটের দৃশ্যে যে ষাঁড়দের দেখা যায় তাদের মতোই অসীম শক্তি লোকটার শরীরে। চিৎকার করে ইংরেজি আর হিন্দিতে কিস্তি দিতে দিতে যারা থেবড়ে বসে লড়াই দেখছিল তাদের ভেদ করে মঞ্চে ঢুকে পড়ল।—হারামি, সন্স অফ বিচ- আওড়াতে আওড়াতে লিয়াকত আর ধনিরামের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুজনেরই চুলের গোছা ধরে ধাক্কা মারতে মারতে দুধারে সরিয়ে দিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে বলতে লাগল, গায়ে খুব তাকত হয়েছে? সেলুলার জেলের স্পেশাল পেনাল কোডে এই ধরনের অপরাধের শাস্তি কী হতে পারে, হয়তো লেখা নেই। তাই বলল, ফির এমন দেখলে ডান্ডাবেড়ি আর সাতরোজ খানা বন্ধু।
সেলুলার জেলে হরেক রকম নিগ্রহের নিখুঁত বন্দোবস্ত আছে। কিন্তু খানা বন্ধ-এর চেয়ে বড় শাস্তি আর নেই। সেটাই আপাতত প্রয়োগ করার ভয় দেখাল মাইকেল স্কট।
অন্য কয়েদি যারা অনন্ত কৌতূহল নিয়ে লড়াই দেখছিল, মাইকেল স্কট এসে পড়ায় যে যেদিকে পারে চোখের পলকে উধাও হয়ে গেল। ধনিরাম আর লিয়াকতও দাঁড়িয়ে থাকল না। একজন পালাল চার নম্বর ব্লকের দিকে। আরেকজন ঘানিঘরের পেছন দিকে। দুজনের ধর্মই রক্ষা হল।
পরের রবিবার দেখতে পেলাম ধনিরাম আর লিয়াকত পাশাপাশি বসে খুব গল্প করছে আর কী এক মজার কথায় একজন আরেক জনের গায়ে হেসে হেসে ঢলে পড়ছে। বিচিত্র এই সেলুলার জেল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।