আধ ঘণ্টা মুগুর চালাবার পর যে তার বের করতে পারলাম তার ওজন আধপোয়াও হবে না। গল গল করে ঘাম বেরিয়ে জেলের উর্দি ভিজে যাচ্ছে। যন্ত্রণায় হাত যেন কাঁধ থেকে খসে পড়বে। কপালের দুপাশের শিরাগুলো দপ দপ করছে।
এদিকে পেটি অফিসার, টিন্ডাল আর ওয়ার্ডাররা মাঝে মাঝে এসে কয়েদিদের ডিপটি (ডিউটি) তদারক করে যাচ্ছে।
বৈজু আমার কাছাকাছি বসে ছোবড়া পিটছিল। চার বছর সে এই জেলে আছে। ছোবড়া থেকে তার বের করাটা তার কাছে জলভাত। হঠাৎ তার নজর এসে পড়ল আমার দিকে। আমার সমস্যাটা কোথায় হচ্ছে আঁচ করে নিয়ে চাপা গলায় বলল, ফিকর মাত্ কর ভাইসাব। তোমার খানার আধা হিস্যা নিচ্ছি। তোমার দিকটা তো দেখতে হবে। সে হাত বাড়িয়ে আমার পাশে যে ছোবড়া পাকার হয়ে আছে, তা থেকে অনেকগুলো টেনে নিয়ে বলতে লাগল, রোজ তোমার জন্যে এক সের তার বের করে দেব। বাকিটা তুমি করবে।
বৈজু অকৃতজ্ঞ নয়। কিন্তু ভেবে অবাক হচ্ছিলাম, লোকটার গায়ে কী দানবিক শক্তিই না রয়েছে। নিজের দুসের তার বের করার সঙ্গে সঙ্গে আমার জন্য এক সের বের করে দেবে! সেদিন থেকে এটাই চালু হয়ে গেল।
আমার ডিউটি অর্ধেক হালকা হয়ে গেছে। কিন্তু সূর্যাস্তের আগে এক সের তার তো বের করতে হবে। সেটাও আমার বেঁচে থাকাটা বরবাদ করে ছাড়বে। আমি ফের মুগুর চালাতে শুরু করলাম।
হঠাৎ তীক্ষ্ণ, ক্রুদ্ধ চিৎকারে সামনের দিকে তাকাই। অলিন্দের মাঝামাঝি জায়গায় নিজের কুঠরির সামনে ছোবড়ার বস্তা এনে রাজনাথকে বসতে দেখেছিলাম। তারপর নিজের ছোবড়া নিয়ে প্রায় অন্ধকার দেখছিলাম। অন্য কোনও দিকে লক্ষ ছিল না।
আমাদের এই দোতলায় মোট তিনটে পেটি অফিসার। দুজন পাঠান, একজন জাঠ। আসলাম খান, মোবারক খান আর ধর্মা সিং। ধর্মা রাজনাথের সামনে দাঁড়িয়ে সেকেন্ডে মুখ থেকে বারো চোদ্দোটা করে কুৎসিত খিস্তি দিয়ে যাচ্ছে। –শালে কুত্তেকে বচ্চে কালাপানিতে তোকে আরাম করার জন্যে নিয়ে আসা হয়েছে। বল্লা (মুগুর) উঠাকে লে। সামকো দো সের তার না পেলে তোর হাড়ি টিলা করে ছাড়ব।
লক্ষ করলাম, কোলে হাত রেখে নির্বিকার থেবড়ে বসে আছে রাজনাথ। এমনিতে তার মেজাজ খুব চড়া। আত্মসম্মানে এতটুকু ঘা লাগলে সে ফুঁসে ওঠে। কিন্তু এখন সে যেন সারা গায়ে পুরু এঁটে রয়েছে। বাপ-মা চোদ্দোপুরুষ তুলে ধৰ্মা সিং যে গালাগালের স্রোত বইয়ে দিচ্ছে তা যেন শুনতেই পাচ্ছে না। খিস্তিগুলো তার গায়ে লেগে যেন ঠিকরে ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। ধর্মা সিং যতই বলে বল্লা (মুগুর) উঠা– সে মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বলে, না।
অনেকক্ষণ ধস্তাধস্তির পর যখন কাজ হল না, ধর্মা সিং দৌড়ে সিঁড়ির দিকে চলে গেল। কয়েক মিনিট বাদে পুলিশ অফিসার মাইকেল স্কটকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এল। তাকে নিশ্চয়ই রাজনাথের বিরুদ্ধে নালিশ জানানো হয়েছিল। রাগে তার লালচে মুখ আগুনের মতো গন গন করছে। রাজনাথের দিকে আঙুল বাড়িয়ে সে গজরে উঠল, হারামি, ডিউটি দিচ্ছিস না কেন? পিক আপুদা ক্লাব–রাজনাথ আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে।–নেভার? একজন কালাপানি খাটতে আসা কয়েদির এতটা দুঃসাহস হতে পারে, বুঝিবা কল্পনা করতে পারেনি মাইকেল স্কট। তার আগুনের গোলার মতো চোখ দুটো স্থির হয়ে যায়। হিন্দুস্থানিতে জিজ্ঞেস করে, মতলব?
রাজনাথ বলল, আমি ছোবড়া পিটব না। আমরা অর্ডিনারি কয়েদি নই; পলিটিক্যাল প্রিজনার।
দাঁতে দাঁত চেপে মাইকেল স্কট বলল, একবার টিকটিকিতে আবার চড়ার ইচ্ছা আছে?
রাজনাথ বলল, একবার কেন, আমরা আন-আর্মড প্রিজনার, দশবার চড়াতে পার, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিতে পার, কিন্তু নারকেল ছোবড়া থেকে তার বের করাতে পারবে না।
আমিও বলতে যাচ্ছিলাম, আমরা অর্ডিনারি কয়েদি নই, পেট্রিয়ট– কিন্তু বৈজু ত্রস্তভাবে হাত বাড়িয়ে আমার মুখ চেপে ধরল, কিছুতেই বলতে দিল না। আমার ওপর তার বোধহয় বেশ মায়া পড়ে গিয়েছিল। আমি যদি রাজনাথের মতো রুখে দাঁড়াই, মাইকেল স্কটের রোষ এসে পড়বে আমার ওপরেও। সেটা বৈজু চায় না।
ওদিকে রাজনাথের স্পর্ধায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে মাইকেল স্কট। সে অলিন্দের মেঝেতে প্রচণ্ড শব্দে বুট ঠুকতে ঠুকতে হুমকির পর হুমকি দিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু রাজনাথকে টলানো গেল না। এমন একজন ঠেটা বেয়াদব কয়েদিকে নিয়ে কী করবে, সে বুঝে উঠতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত পেটি অফিসার ধর্মা সিংকে বলল, এ শালেকো কুঠুরিতে ঘুসিয়ে তালা লাগাও। আজ ইসকো দুপহরকা খানা বন্ধ–
রাজনাথকে সেলে পুরে ফেলা হল। বুঝতে পারালাম, সেলুলার জেলে বেয়াড়া কয়েদিদের চিট করার জন্যে যতরকম মোক্ষম মুষ্টিযোগ আছে তার মধ্যে একটা হল খানা বন্ধ, অর্থাৎ খেতে না দিয়ে উপোস করিয়ে রাখা।
কিন্তু রাজনাথ অন্য ধাতুতে তৈরি। সেদিন দুপুরে কেন, রাতেও তাকে খাবার দেওয়া হল না। শুধু সেদিনই নয়, পর পর তিন দিন। তাতেও তাকে শায়েস্তা করা সম্ভব হল না। কিছুতেই সে ছোবড়া পিটিয়ে তার বের করবে না। অগত্যা তাকে পোর্ট ব্লেয়ারের কাছে ছোট ভাইপার আইল্যান্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানেও জেলখানা, ফাঁসিঘর আছে। অনেক পরে জেনেছিলাম, রাজনাথ ওখানে সলিটারি সেলে থেকে থেকে পাগল হয়ে যায়।
যাই হোক, দুতিন মাস ছোবড়া পেটানোর পর মুকুন্দ আর আমাকে চত্বরের একধারে যে ঘানিঘরের শেড রয়েছে, সেখানে ডিউটি দেওয়া হয়। হাতে ঘানি ঘুরিয়ে রোজ পনেরো সের তেল বের করতে হবে। দিনের শেষে সেই তেল মেপে নেবে মাইকেল স্কট। বৈজু খাবাবের বখরার জন্য আমার সঙ্গ ছাড়ছিল না। পেটি অফিসার আসলাম খানকে নগদ আট আনা ঘুষ দিয়ে ছোবড়া পেটানোর ডিউটি ছেড়ে ঘানি টানার ডিউটি নিয়েছিল। স্বীকার না করলে বেইমানি হবে, তাই বলছি, আমার অর্ধেক তেল সে-ই ঘানি টেনে বের করে দিত।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।