আসলাম খান এই ব্রিটিশ অফিসারটাকে খতরনাক অর্থাৎ বিপজ্জনক বলেছে। এখন পর্যন্ত যাদের দর্শন পেয়েছি তাদের কে যে কম খতরনাক, এখনও বুঝতে পারিনি। হাত-বাঁধা অবস্থায় আমার পক্ষে কী-ই বা করা সম্ভব? প্রতিশোধের স্পৃহাটাকে মনের গোপন কোনও কুঠুরিতে পুরে রাখলাম। যদি কোনওদিন সুযোগ পাই
অফিসার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হুংকার ছাড়ল। ইয়াদ রাখ, আমার নাম মাইকেল স্কট। ফির বেয়াদপি করোগে তো–কথাটা শেষ করে বলতে লাগল, ইয়ে সেলুলার জেল। ইহাকা কানুন আলাগা তোর মতো কুত্তা দো-চার টেরোরিস্টকে যখন ইচ্ছা খতম করে দিতে পারি।
লক্ষ করেছি, এখানকার সব ব্রিটিশ অফিসার হিন্দি-উর্দু মেশানো চোস্ত হিন্দুস্থানি বলতে পারে।
মাইকেল স্কট আসলাম খানকে বলল, হারামিকা বাচ্চেকো লে চল—
আমাকে মাঝখানে রেখে আসলাম খানরা অলিন্দ ধরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে চলল। চোখে পড়ল আরও দুজন পুলিশ অফিসার এবং সশস্ত্র পুলিশরা রাজনাথ এবং মুকুন্দকে নিয়ে একই কায়দায়, অর্থাৎ হাতকড়া লাগিয়ে একই দিকে যাচ্ছে।
নিচে তিন নম্বর, চার নম্বর এবং পাঁচ নম্বর ব্লক পার হয়ে ছনম্বর ব্লকের পেছনে নির্জন একটা এলাকায় আমাদের নিয়ে আসা হল। এখানে ডজনখানেক ত্রিভুজের মতো স্ট্যান্ড দাঁড় করানো রয়েছে। সেই আমার প্রথম টিকটিকি দর্শন। প্রতিটি স্ট্যান্ডের দুটো আট ফুটের মতো লম্বা কাঠের পায়া সামনের দিকে রয়েছে। পেছনে একটা পায়। সব মিলিয়ে জিওমেট্রির ত্রিভুজ। সামনের দুটো পায়ায় প্রায় সবটা জুড়ে কাঠের পুরু পাটাতন আটকানো। চোখে পড়ল, ডানপাশে সলিড ইটের দেওয়াল লম্বা কাঠের ব্র্যাকেটে সারি সারি হুক লাগানো। সেই হুকগুলো থেকে চাবুক ঝুলছে। এখানে টেনে আনার মতলবটা এতক্ষণে মোটামুটি টের পাওয়া যাচ্ছে।
যে তিন পুলিশ অফিসার এখানে রয়েছে, মাইকেল স্কট তাদের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র। আরও দুজন পেটি অফিসারকেও দেখা গেল। শরীরের বিশাল কাঠামো আর দাড়ির জঙ্গল দেখে আন্দাজ করা যায় তারা পাঠান।
মাইকেল স্কট কোমরে দুই হাত রেখে গমগমে গলায় হুকুম দিল।–পেটি অফিসার, এ শালে তিন টেরোরিস্টকো হ্যান্ডকাফ খুলো, উর্দি হটাকে নাঙ্গা কর, আউর টিকটিকি পর চড়াও।
চোখের পলকে তিন পেটি অফিসার আমাদের তিনজনের হাতকড়া খুলে, উলঙ্গ করে, টিকটিকির সামনে নিয়ে এল। বুকটা কাঠের পাটাতনে ঠেকিয়ে দুই ফঁক করে দুই পায়াতে মোটা: দড়ি দিয়ে বেঁধে, হাতদুটো পাটাতনের পাশ দিয়ে পেছন দিকে নিয়ে বেঁধে ফেলল। তারপর তিনজনে তিনটে চাবুক এনে আমাদের তিনজনের পেছনে পজিশন নিয়ে দাঁড়াল।
হুকুম সুচারুরূপে পালন করা হয়েছে কি না নিরীক্ষণ করার। পর মাইকেল স্কট বলল, শালে এই তিন টেরোরিস্ট কাল জেলর সাহেবের কাছে আজাদির কথা বলেছিল। আজাদির টেস্ট কেমন লাগে ওদের সমঝিয়ে দে। পন্দ্র (পনেরো) চাবুক।
কেন আমাদের টিকটিকিতে চড়ানো হয়েছে, এবার তার। কারণটা স্পষ্ট হয়ে গেল। চোখ বুজে পেশিগুলো পাথরের মতো। শক্ত করে রইলাম।
একটু পর খোলা পিঠে চাবুকের ঘা পড়ল। আসলাম আমাকে সজুত করে নিয়েছে। আঘাতটা তেমন জোড়াল মনে হল না। তবু বুঝতে পারলাম চামড়া কেটে গেছে। মুখটা টিকিটিকির ওপর চেপে রয়েছে এমনভাবে যে রাজনাথ আর মুকুন্দকে দেখতে পাচ্ছি না। সাঁই সাঁই আওয়াজে টের পাওয়া যাচ্ছে ওদের পিঠেও চাবুকের পর চাবুক পড়ছে। এর আগে কনফেশন আদায়ের জন্য আলিপুরে, দমদমে বা মেদিনীপুরের জেলে আমাদের ওপর কম নির্যাতন চালানো হয়নি। কিন্তু আমাদের মুখ দিয়ে টু শব্দটি বেরয়নি৷ সেটা যেন ইংরেজের কাছে এক ধরনের পরাজয়।সেলুলার জেলেও মুখ বুজে রইলাম৷
পনেরো ঘা চাবুকের হুকুম ছিল কিন্তু দশ পর্যন্ত গুনতে পেরেছি। তারপর চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে গেল। যখন জ্ঞান ফিরল দেখি একটা বেডে শুয়ে আছি। পাশাপাশি আরও দুটো বেডে রাজনাথ আর মুকুন্দ। তাদের তখনও জ্ঞান ফেরেনি। আমাদের তিনজনেরই বুকে পিঠে মোটা করে ব্যান্ডেজ বাঁধা। পরে জানলাম ব্রিটিশ আমলে জেলখানার ভেতর একটা ছোট হাসপাতাল ছিল। চাবুক মারার পর রক্তাক্ত, বেহুশ হয়ে পড়লে আমাদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়।
দিন-চারেক বাদে আমাকে আবার আমার সেলে ফিরিয়ে আনা হয়। আমার পিঠের ঘা তখন শুকিয়ে এসেছে। ভাগ্যিস বৈজু একটা চৌ-আনি ঘুষ দিয়েছিল আসলাম খানকে, তাই চাবুকটা তেমন জোরে হাঁকায়নি। কিন্তু রাজনাথ আর মুকুন্দ ফিরেছিল দশ-বারো দিন পর। ওদের ঘা শুকোতে আরও অনেকটা সময় লেগেছিল। এই কদিন ওদের তিনবেলার বরাদ্দ খাবার সেলেই দিয়ে যেত পেটি অফিসার, কী টিল্ডালরা।
ঘা পুরোপুরি শুকিয়ে এলে অন্য কয়েদিদের মতো আমাদেরও ডিউটিতে জুড়ে দেওয়া হল। প্রথম দিকে বৈজুদের মতো নারকেল ছোবড়া পিটিয়ে সরু সরু তার বের করার কাজ। দিনে দুসের। সকালে কাঞ্জি খেয়ে ছোবড়ার বস্তা নিয়ে আমরা তিন বিপ্লবী কাঁধে ছোবড়ার বস্তা, হাতে মুগুর নিয়ে যে যার কুঠুরির সামনে বসে গেলাম। অন্য কয়েদিরা তো চারপাশে রয়েইছে।
শক্ত ছোবড়ায় ঘা দিতেই প্রথম দিকে মুগুর ঠিকরে ঠিকরে উঠছে। ছোবড়া যেমনকে তেমন। বিকেল বেলায় দুসের তার কী করে বের করব জানি না। তখন আবার কী ধরনের জুলুম চালানো হবে, কে জানে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।