সিকিটি নিয়ে আসলাম খান খুশি হল। চোখ কুঁচকে একটু। হেসে বলল, তোর ভাইসাবের জন্যে ফিকর মাত কর। আভি ডিপটি চালু কর দে।
বুঝতে পারলাম আমার জন্যে পেটি অফিসারকে এই সিকিটি ঘুষ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেন? একটা কারণ, আমার খাবার থেকে তাকে ভাগ দিই। বাকিটা স্পষ্ট ধরা যাচ্ছে না। কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম।
আসলাম খান এবং অন্য পেটি অফিসার আর টিল্ডালরা অলিন্দের নানা দিক থেকে হাঁকতে লাগল, শালে লোগ, ডিপটিমে বৈঠ যা। আট বাজ গিয়া–
আগে লক্ষ করিনি, এবার দেখলাম অলিন্দের যে পাশে রেলিং তার গা ঘেঁষে সারি সারি চৌকো পাথর এক ফুটের মতো লম্বা, এক ফুটের মতো চওড়া এবং নদশ ইঞ্চি পুরু সারি সারি পাতা রয়েছে। বৈজু একটা পাথর টেনে সেটার সামনে থেবড়ে বসে পড়ল। তারপর বস্তার মুখ খুলে উপুড় করে দিতেই অজস্র নারকেল ছোবড়া বেরিয়ে পড়ল। সেগুলোকে একধারে পাকার করে রেখে একেকটা ছোবড়া পাথরের পাটার ওপর। রেখে মুগুর দিয়ে পিটতে শুরু করল। ধুপধাপ আওয়াজ উঠতে লাগল। অন্য কয়েদিদের দেখতে পাচ্ছি না, তবে সারা অলিন্দ জুড়ে একইরকম আওয়াজ হচ্ছে। একটানা, অবিরল।
দেখতে লাগলাম, বৈজু নারকেল ছোবড়া পিটিয়ে ঝুরো থেকে সরু সরু সুতোর মতো আঁশ বা কয়ার বের করে একধারে রাখছে। জিজ্ঞেস করলাম, এই তোমাদের ডিউটি? বৈজু ঘাড় ফিরিয়ে বলল, হ্যাঁ, ভাইসাব! সুবেহসে সাম তক। দো সের সুতো বের করতে হবে। দুপহরকা খানাকে লিয়ে এক ঘণ্টা কাম বন্ধু। দো সের সুতো যদি না দিতে পারি, রাতের খানা মিলবে না; তার ওপর পেটি অফিসারদের ডান্ডা। জিজ্ঞেস করলাম, সব কয়েদিকেই কি ছোবড়া থেকে সুতো বের করতে হয়? বৈজু বলল, নেহি। চত্বরের লম্বা শেডটা দেখিয়ে। বলল, ওটার ভেতর ঘানি আছে। অনেকের ডিপটি পড়ে নারিয়েল (নারকেল) থেকে হাত দিয়ে ঘানি ঘুরিয়ে হর রোজ পন্দ্র (পনেরো) সের তেল বের করতে হয়। এক ছটাক কমতি নেহি। তা হলেই ডান্ডা। জানতে চাইলাম, কয়েদিদের জন্যে এই দুরকমেরই ডিউটি? বৈজু মুগুর চালাতে চালাতে জানালো, চার-পাঁচশো কয়েদিকে রোজ নাস্তা খাওয়ার পর সেলুলার জেলের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা পাথর ভেঙে রাস্তা বানায়। বাড়িঘর তৈরিতে মজুরের কাজ করে; কেউ কেউ ফবিস-এ (ফরেস্ট) গিয়ে কাঠ কাটে। কারও-কারওকে নিয়ে যাওয়া হয় শিপিং ডিপার্টমেন্টের ডক-এর কাজে। সারাদিন কাজের পর তাদের সেলুলার জেলে এনে আবার যার যার কুঠুরিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এই বন্দিশালা, পোর্টব্লেয়ার শহর, সবই আংরেজরা কয়েদিদের দিয়ে বানিয়েছে।
বৈজু বলতে লাগল, ভাইসাব, নয়া এসেছেন। দো-চার রোজ যাক, আপনাকে পুলিশ পেটি অফিসাররা এইসব ডিপটিতে লাগিয়ে দেবে। হাড্ডি-তৌড় (হাড়ভাঙা) মেহনত না করলে কালাপানিতে খানা মেলে না৷ চমকে উঠলাম, রাজবন্দিদের যে সেলুলার জেলে পায়ের ওপর পা তুলে আরামে দিন কাটাতে দেওয়া হয় না, সেটা বোঝার মতো বুদ্ধি আমার ঘটে আছে! কিন্তু নারকেল ছোবড় থেকে কয়ার বের করা, ঘানি টানা, রাস্তা ভাঙা–এই জাতীয় ডিউটিতে আমাদের জুড়ে দেওয়া হবে, কে ভাবতে পেরেছিল!
একসময় কথাবার্তা থামিয়ে নিজের কাজে আরও ব্যস্ত হয়ে পড়ে বৈজু। সন্ধের আগে তাকে নারকেল ছোবড়া থেকে দুসের সরু তার বের করতে হবে। তার কি খোশ গল্প করার মতো সময় আছে?
আমার কোনও ডিউটি নেই; অন্তত আজকের দিনটার মতো। সময় আর কাটতে চায় না। সলিটারি সেলে বন্ধ দরজার গরাদ। ধরে দূরের সমুদ্র, আকাশ মাউন্ট হারিয়েটের চুড়ো, সামনের ব্লকের সারি সারি কুঠুরি,–এসব একঘেয়ে, ক্লান্তিকর দৃশ্য আর। কতক্ষণ দেখা যায়! আমার চোখে ব্যথা হচ্ছিল। মাথা টিপ টিপ করছে।
একবার ভাবলাম শুয়ে পড়ি। মেঝেতে তো অনন্ত শয্যা পাতাই রয়েছে। কিন্তু শোওয়া আর হল না। হঠাৎ অলিন্দ জুড়ে মুগুর পেটানোর অবিরাম ভোঁতা আওয়াজ ছাপিয়ে কয়েক জোড়া বুটের ভারী, কর্কশ শব্দ কানে এল। আমি চকিত হয়ে উঠলাম। একটু পরেই পেটি অফিসার আসলাম খান, একজন ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার আর কয়েকটি বন্দুকধারী গার্ড আমার সেলের সামনে এসে দাঁড়াল।
আসলাম খান নিঃশব্দে সেলের দরজা খুলে আমার হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে বাইরে বের করে আনল।
পুলিশ অফিসারটির সাড়ে ছফিটের মতো হাইট, বিশাল। মাংসল শরীর। প্রকাণ্ড মাথা, চোখের তারা নীল। মুখ দেখেই টের পাওয়া যায় লোকটা ভয়ানক নিষ্ঠুর। পোর্টব্লেয়ারে নামার পর যে কজন পুলিশ অফিসার দেখেছি তাদের সবার চেহারা প্রায় একই রকম৷ হিংস্র, নির্মম, নৃশংস। খুব সম্ভব বেছে বেছে এই ধরনের অফিসারকে আন্দামানে পাঠানো হয়েছে।
আমার সামনে যে পুলিশ অফিসারটি দাঁড়িয়ে আছে সে পেটি অফিসার আসলাম খানকে বলল, ইস বাস্টার্ডকো হাতমে হ্যান্ডকাফ লাগাও এর আগেও অন্য এক অফিসার এইভাবে নোংরা গালাগাল দিয়েছিল। অসহ্য ক্রোধে শরীরের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠল। কপালের দুপাশে রগগুলো সমানে দপ দপ করছে। টের পাচ্ছি, চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে। দাঁতে দাঁত চেপে অফিসারের দিকে তাকালাম। ইচ্ছা হল, লোকটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ি। অফিসার আমার মনোভাবটা হয়তো টের পেয়েছে। তার মুখ থেকে তেড়ে আরও কিছু বাছা বাছা কুৎসিত খিস্তি বেরিয়ে এল। হিতাহিত জ্ঞানশূন্যের মতো কিছু একটা করতে যাচ্ছিলাম, আসলাম খান আমাকে হাতকড়া পরাতে পরাতে খুব নিচু গলায় শুভাকাঙ্ক্ষীর মতো হুঁশিয়ারি করে। দিল। টিরোরিস (টেরোরিস্ট) শির গরম কোর না। এ বহোৎ খতারনাক অফসর। জানমে মার ডালেগা। বৈজু যে আমার জন্য তাকে একটি সিকি দিয়েছে সেই কারণে হয়তো এই সতর্কবাণী।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।