আমি রাজনাথকে কী বলতে যাচ্ছিলাম, বলা হল না। তার আগেই কাল রাতের সেই করুণ, কাতর চিৎকার কানে এল। হো ভগোয়ান রামজি, মুঝে বঁচা দে।
চমকে সামনের দিকে তাকালাম। মাথায় ঝাকড়া চুল, মাঝারি হাইট, পরনে জেলের উর্দি, হাতে হ্যান্ডকাফ লাগানো, বয়স তিরিশের মতো একটা লোককে একজন ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার এবং ছজন আর্মড পুলিশ আমাদের ব্লকের তেতলা থেকে নামিয়ে আনছে। এই কয়েদিটাই কাল অনেক রাত পর্যন্ত অবিরল কেঁদে কেঁদে ভোরের দিকে খুব সম্ভব থেমে গিয়েছিল। আবার এখন তার কান্না শুরু হয়েছে।
লক্ষ করলাম অন্য কয়েদিরাও তাকে দেখছে। কিন্তু সম্পূর্ণ নিস্পৃহ। উদাসীন। তারা খেয়েই চলেছে। বৈজুও গোগ্রাসে। খাচ্ছিল। খেতে খেতে বলল, কুছ টেইম (টাইম) বাদ ওর ফাঁসি হবে। সেটা বুঝতেই পেরেছি। জিগ্যেস করলাম, ওর কী নাম? বৈজু বলল, হরগোবিন। বললাম, কেন ওকে ফাঁসি দেওয়া। হবে? কাল জাফর আলি টিল্ডালকে এই প্রশ্নই করেছিলাম। সে জবাবটা এড়িয়ে গেছে। বৈজু বলল, ওকে পুলিশ অফসর পাথর তোড়ার (পাথর ভাঙার) কাজ দিয়েছিল। ও রাজি হয়নি। তখন ওর খানা বন্ধ করে হাতে-পায়ে ডান্ডাবেড়ি লাগিয়ে কুঠুরিতে ঢোকানো হয়েছিল। হরগোবিন দো রোজ ভুখা থেকে বেহোঁশ হয়ে পড়ে। তখন পুলিশ অফিসররা এসে জলটল দিয়ে হোঁশ ফেরায়। বলে আগে পাথর তোড়তে হবে, তবে খানা মিলবে। হরগোবিনের মাথার ঠিক ছিল না। সে হাতের হ্যান্ডকাফ এক পুলিশ অফসরের কানের ওপর শরীরের পুরা তাকত দিয়ে ঘা মারে। সেই চোটে অফিসার বিলকুল খতম। ইতনা বড়া কসুর জেলরসাব মাপ করেনি। হরগোবিনের ফাঁসির হুকুম হয়ে যায়।
আমার খাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মনটা বিষাদে ভরে যায়। জিগ্যেস করলাম, দেশে ওর কে আছে? বৈজু একটা হাত ঘুরিয়ে বলল, কৌন জানে!
হরগোবিনকে পাহারা দিয়ে পুলিশবাহিনী সামনের ব্লকের পাশ দিয়ে ডান দিকে অদৃশ্য হয়ে যায়। হয়তো ওধারে কোথাও ফাঁসিঘর। হরগোবিনকে দেখতে পাচ্ছি না কিন্তু তার চিৎকার সমানে ভেসে আসছে। হো রামজি, মুঝে বঁচা দে। কিন্তু সে হয়তো জানে না বঙ্গোপসাগরের এই কয়েদখানায় রামচন্দজিরও কিছুই করার নেই। এখানে তার প্রবেশ নিষেধ।
একটু পরে হরগোবিনের কান্না থেমে গেল। ফাঁসিতে তার মৃত্যুর খবর হয়তো তার মা বাপ বউ বাচ্চা (যদি কেউ থাকে) কোনও দিনই জানতে পারবে না।
বেলা চড়ছিল। পেটি অফিসার এবং টিন্ডালরা কর্কশ স্বরে হাঁকতে লাগল। যা কুত্তেলোগ। নাস্তা হো চুকা। আভি আপনা আপনা ডিপটিমে (ডিউটিতে) চলা যা
কয়েদিদের কীসের ডিউটি বুঝতে পারলাম না। ইন্ডিয়ার মেনল্যান্ডে থাকার সময় শুনেছি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা নিয়ে যারা এখানে আসে তাদের ওই জেলখানার সেলে বন্দি থেকে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে হয়। কিন্তু এছাড়া এই নির্বাসিতদের যে আর কিছু করার আছে বা থাকতে পারে, আদৌ তেমন ধারণা ছিল না।
লক্ষ করলাম, অন্য কয়েদিরা লাইন দিয়ে সামনের চত্বরে মাঝখানে যে লম্বা শেডটা রয়েছে একে একে তার ভেতর ঢুকতে লাগল। আর-একটা দলকে নিয়ে এক দঙ্গল আর্মড গার্ড আর কয়েকজন পুলিশ অফিসার জেল গেটের দিকে চলল।
আমরা তিন বিপ্লবী রাজনাথ, মুকুন্দ এবং আমি পরস্পরের কাছ থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমরাও কয়েদি। আমাদের কোনও ডিউটি দিতে হবে কিনা এবং সেই ডিউটিটা কী ধরনের কেউ বলে দেয়নি।
না, আমাদের ডিউটি দিতে হল না। একজন পুলিশ অফিসার আর কয়েকজন পুলিশ, তাদের হাতে রাইফেল—আমাদের পাহারা দিয়ে দিয়ে তিন নম্বর ব্লকে যার যার কুঠুরিতে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে চলে গেল। সৌভাগ্যই বলতে হবে, আমাদের পায়ে এখন আর বেড়ি পরানো হল না। কিন্তু ঘণ্টা দুই তিন পর কী ঘটবে, তখন কি আর জানতাম!
আমার সেল থেকে আমাদের ব্লকের তিনটে ফ্লোরের অন্য কোনও সেলই দেখা যায় না। রাজনাথ আর মুকুন্দ কী করছে, জানি না। আমি জানলার গরাদ ধরে বাইরে তাকিয়ে রইলাম। একদল কয়েদিকে কিছুক্ষণ আগে পুলিশ পাহারায় জেলখানার বিশাল গেটের দিকে যেতে দেখেছিলাম। এবার চোখ পড়ল তারা গেট পেরিয়ে বাইরের রাস্তায় চলে গেছে। একটু পর তারা দূরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
হঠাৎ আবার নিচের চত্বরে হইচই শুরু হল। চমকে সেদিকে তাকালাম। আমাদের ব্লকের ষাট-সত্তরটি কয়েদি ফিরে আসছে। তাদের প্রত্যেকের কাঁধে ঢাউস-ঢাউস ভারী চটের বস্তা; হাতে [ কাঠের বেঁটে বেঁটে মোটা মুগুর। সামনের ব্লকের অনেক কয়েদিও বস্তা এবং মুগুর নিয়ে ওধারে যাচ্ছে। যথারীতি আর্মড গার্ড, টিন্ডাল আর পেটি অফিসাররা তো রয়েইছে।
আমাদের ব্লকের কয়েদিরা কেউ গেল তেতলায়, কেউ দোতলায়, কেউ বা একতলায়। দোতলায় যারা উঠেছে তাদের মধ্যে বৈজুকে দেখতে পেলাম কেন না সে আমার এবং তার সেলের মাঝামাঝি জায়গায় অলিন্দের রেলিং ঘেঁষে তার বস্তা আর মুগুর নামাল। পেটি অফিসার আসলাম খানকে তার পাশে দেখা গেল। আমাকে চোখের ইঙ্গিতে দেখিয়ে চাপা গলায় কিছু বললেন। তার শেষ দুএকটা শব্দ কানে এল। খোদা মাত্ করো, বলে এদিক সেদিক তাকিয়ে বড় করে হাঁ করল। তারপর গলার ভেতর হাত ঢুকিয়ে চোরা গর্ত থেকে একটা চামড়ার থলি বের করে সেটা থেকে। একটা সিকি নিয়ে আসলাম খানের হাতে দিয়ে ফের থলিটা গলায় ঢোকাল। দেখেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। চকিতে মনে পড়ে গেল। কাল রাতে টিল্ডাল জাফর আলি জিজ্ঞেস করেছিল, আমার গলায় পয়সার থলি আছে কি না।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।