পুলিশ থেকে টিল্ডাল অব্দি সবাই হুমকির সুরে শাসায়, এ শালে লোগ, চিল্লাও মাৎ। বিলকুল খামোস। আগর চিল্লাওগে তো গলাকা নলিয়া ফাড় দুঙ্গা–
অগত্যা সুবোধ বালকের মতো নিঃশব্দে এগিয়ে গেলাম। কাল আমাদের তিন বিপ্লবীকে অন্য কয়েদিদের ধারেকাছে ঘেঁষতে দেয়নি। দাগি আমের পাশে অন্য আম থাকলে তার গায়ে দাগ ধরতে পারে। বিপ্লবীরা কানে ফুসমন্তর দিয়ে এই কালাপানিতে যাতে দল ভারী করতে না পারে, তাই এই সতর্কতা। কিন্তু আজ কড়াকড়িটা আলগা কেন, আন্দাজ করতে পারলাম না। তাই একটু অবাকই হলাম।
অলিন্দ ধরে এগতে এগতে পাশের রেলিংয়ের ওপর দিয়ে নিচের চত্বরে নজর চলে যাচ্ছিল। সেখানে বিরাট বিরাট ঘড়ি, হাতা, জলের ড্রাম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একদল টিল্ডাল আর পেটি অফিসার। বন্দুকওলা পুলিশে চারদিক ছয়লাপ। চোখে পড়ল উলটোদিকের ব্লক থেকে কয়েদিদের কাতার দিয়ে নামিয়ে আনা হচ্ছে। তাদের হাতেও থালা এবং গেলাস।
আমরা নিচে নেমে আসতেই হুংকার ছাড়তে ছাড়তে পেটি অফিসাররা লাইন করে কয়েদিদের দাঁড় করিয়ে দিল। দুটো লম্বা লাইন। একটা আমাদের ব্লকের কয়েদিদের; অন্যটা সামনের ব্লকের কয়েদিদের।
বৈজু আমাকে ছাড়েনি; গায়ে গায়ে লেগে পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে পারছি খাবার দেবার সময় সে কিছুতেই আমার সঙ্গ ছাড়বে না।
কাল বিকেলে আমাদের তিন বিপ্লবীকে লাইন দিতে হয়নি। দূরে দাঁড় করিয়ে রেখে পুলিশ চাপাটি-সবজি এনে দিয়েছিল। আজ মুড়ি-মিছরি সব একাকার। পুরনো কয়েদিদের ঝাকে। আমরাও ভিড়ে গেলাম।
লাইন ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে গেলে দুই অফিসার দুটো লাইনের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের হাতে দুটো মোটা বাঁধানো খাতা। তারা খাতা খুলে হাঁকতে লাগল, কয়েদি নাম্বার এক-একজন, হাত তুলে জবাব দিল, হাজির– এইভাবে দুই লাইনের সব। কটা কয়েদির নাম হাকার পর খাতা বন্ধ করল। অবশ্য আমাদের তিন বিপ্লবীকেও হাজির বলে সাড়া দিতে হল।
আমার পেছন থেকে বৈজু নিচু গলায় বলল, হর রোজ সুবেহু সাম পুলিশ অফসাররা কয়েদি গিনতি (গুনে) দেখে। শালেদের ভয় কেউ হয়তো ভেগে গেছে। চারদিকে ইতনা ইতনা পেহেরাদার; কী করে ভাগবে বলুন ভাইসাব।
আমি হাসলাম। বৈজু বলল, আমার ভুখের কথাটা মনে আছে। ত? বললাম, আছে, আছে কয়েদি গোনা হয়ে যাবার পর একজন পুলিশ অফিসার চিৎকার করে হুকুম দিল। আভি নাস্তা চালু কর দে।
টিল্ডাল এবং পেটি অফিসাররা তৈরি হয়েই ছিল। তারা প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড হাড়ি থেকে মস্ত লোহার হাতায় কালচে হলুদ রঙের থকথকে তরল জাতীয় পদার্থ তুলে কয়েদিদের থালায়। দিতে লাগল। প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ দুহাত। সেটা কম নয়; থালা প্রায় বোঝাই হয়ে গেল। খাবার নিয়ে প্রতিটি কয়েদি পাশের টিল্ডাল বা পেটি অফিসারের কাছ থেকে জল নিয়ে এক ধারে # দাঁড়িয়ে খেতে শুরু করল। কালকের মতো সেলে নিয়ে গেল না।
আমাদের লাইনের সামনের দিকের কয়েদিরা একের পর এক খাবার এবং জল নিয়ে পাশের দিকে সরে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত আমার পালা এল। অন্যদের মতো আমিও প্রকাণ্ড দুদলা থকথকে জিনিস আর জল হাতে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালাম। এক দৃষ্টে থালার দিকে তাকিয়ে আছি। এমন খাদ্যবস্তু আগে আর কখনও চর্মচক্ষে দেখিনি। তবে সেটা বেশ গরম। অল্প অল্প ধোঁয়া উড়ছিল। দু-চারটে আলু আর কুমড়োর টুকরোও চোখে পড়ছে। শুঁকে দেখলাম গন্ধটা কেমন যেন উৎকট।
একটু পরেই বৈজু উৰ্ধশ্বাসে এসে হাজির। পাছে আমি খেয়ে ফেলি সেজন্য একরকম দৌড়ে এসেছে। খাবারের দিকে আঙুল বাড়িয়ে তাকে জিগ্যেস করলাম, এটাকে কী বলে?বৈজু বলল, কাঞ্জি। আমার নতুন প্রশ্ন। কী দিয়ে এটা তৈরি? বৈজু বুঝিয়ে দিল, বহু পুরনো চালের খুদ, ভাঙা ভাঙা নানা ধরনের ডাল, আলু, কুমড়ো এবং আরও কয়েক রকম সবজি এবং মরিচ একসঙ্গে ফুটিয়ে এই বস্তুটি বানানো হয়। খুদ আর ডাল গুদামে থাকে তো। তার সঙ্গে চুকা টাট্টি অর্থাৎ ইঁদুরের নাদিও যে থাকবে না, হলফ করে তা বলা যায় না। রোজ প্রায় হাজারখানেক কয়েদির জন্য এত কাঞ্জি বানাতে হয়, তাই কে আর ইঁদুরের নাদি বেছে ফেলে দেবে? শুনেই আমার পেটের ভেতরটা পাক দিয়ে উঠল।
বৈজু যেন একশো বছরের খিদে পেটে নিয়ে আমার থালাটার দিকে তাকিয়ে ছিল। বলল, ভাইসাব, আমার হিস্যাটা দিয়ে দিন। শুনে বেশ মজাই লাগল। কাল বিকেলে তার সঙ্গে প্রথম দেখা। কিন্তু এর মধ্যেই আমার খাবারের আধা-আধি ভাগের ওপর তার আইনসংগত অধিকার যেন জন্মে গেছে। ইচ্ছা হচ্ছিল, পুরো কাঞ্জিটাই ওর থালায় ঢেলে দিই। কিন্তু কাল দুপুরে জাহাজে শেষবারের মতো খেয়েছিলাম। তারপর পেটে এক ফোঁটা জলও পড়েনি। খিদেয় নাড়ি চুই চুই করছিল। কিছু তো একটা খেতে হবে। কাঞ্জি ছাড়া এখানে আর কিছু পাওয়ার উপায় নেই। আমার থালা থেকে অর্ধেকেরও বেশি ওর থালায় ঢেলে দিলাম। তারপর খুঁটে খুঁটে একটুআধটু মুখে দিতে লাগলাম। এখন থেকে এই বস্তুটি রোজ সকালে গলাদ্ধকরণ করতে হবে। ভাবতেই পেটের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠতে লাগল।
খানিকটা দূর থেকে রাজনাথের গলা শোনা গেল। কেমন খাচ্ছিস রে শেখর? তাকে পালটা জিগ্যেস করলাম, তুই কেমন খাচ্ছিস? সে বলল, এমন ব্রেকফাস্ট চৌরঙ্গির গ্র্যান্ড হোটেলও তৈরি করতে পারবে না। যে বেঁধেছে, যদি কোনও দিন মুক্তি পাই, মেনল্যান্ডে ফেরার সময় তার পায়ের ধুলো নিয়ে যাব। কিন্তু কলকাতায় আর তার ফেরা হয়নি। কিন্তু সেসর পরের কথা।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।