আমি গামলার ওপর সে দিনের প্রথম প্রাকৃত কর্মটি সেরে নিয়ে সেটার মুখ ঢাকা দিলাম। তার খানিকটা দূরে খাবারের থালা। আরেকটু দূরে বিছানায় যেন স্বর্গালোকে চলে এসেছি। ভাবতেই মজাও লাগল, বেশ হাসিও পেল।
আমি দরজার কাছে চলে এলাম। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে ওটাই আমার একমাত্র যোগসূত্র। গরাদের ফাঁক দিয়ে দূরে তাকিয়ে থাকি। অন্ধকার আরও অনেকটা ফিকে হয়েছে। কিন্তু কাল রাতে কখন কুয়াশা পড়তে শুরু করেছিল খেয়াল করিনি। কুয়াশার ঘন স্তর চাদরের মতো মাউন্ট হারিয়েট, সমুদ্র, জঙ্গল, আশপাশের ছোট ছোট দ্বীপগুলোকে মুড়ে রেখেছে। কোনও কিছুই স্পষ্ট নয়।
হঠাৎ অলিন্দের দূর প্রান্ত থেকে কর্কশ শব্দ ভেসে এল। ওই সালে লোগ, ওঠ ওঠ। সুবেহ হো গিয়া আওয়াজটা ক্রমশ আমাদের এ প্রান্তের কুঠুরিগুলোর দিকে এগিয়ে আসছে। শুধু আমাদের দোতলাতেই নয়, একতলা, তেতলা এবং সামনের ব্লকেও একই রকম কর্কশ শব্দ। ব্যাপারটা এতক্ষণে বোধগম্য হল। ঘুমন্ত কয়েদিদের এইভাবে জাগানো হচ্ছে।
যে জাগাচ্ছিল তার গলাটা চেনা চেনা। কালই শুনেছি। যা ভেবেছিলাম তাই। সেই পেটি অফিসার, আসলাম খান। পাশের কুঠুরির বৈজুকে জাগিয়ে আমার কুঠুরির সামনে চলে এল। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হয়তো একটু খুশিই হল! তার প্রকাণ্ড মুখের ঘন দাড়িগোঁফের জঙ্গল ভেদ করে কোদালের মতো কয়েকটা দাঁত বেরিয়ে পড়ল। বোধহয় সেটা হাসিই। আমাকে ঘুম ভাঙাবার আগেই জেগে উঠতে দেখে সে মনে হয়। খুশিই হয়েছে। সে বলল, শালে, টিরোরিস তেরে নিদ টুট গিয়া? শাশ!
আমি জবাব দিলাম না। আসলাম খানের মতো আরও কত পেটি অফিসার, টিল্ডাল আর টিন্ডালদের মুখে এই মধুর শালে সম্ভাষণটুকু যে শুনতে হয়েছে তার ঠিক ঠিকানা নেই। কিন্তু মুশকিলটা হচ্ছে আমার নিজের একটা বোনও নেই। পৃথিবীতে কজনের আর এতগুলো ভগ্নীপতি পাওয়ার সৌভাগ্য হয়?
সে যাই হোক, আসলাম খান এবার জিগ্যেস করল, কিয়া রে, টাট্টি (পায়খানা) হো গিয়া? মুহ ধো লিয়া?
হ্যাঁ আমি ঘাড় কাত করলাম।
আসলাম খানের ঠোঁট দুটো আরও খানিকটা ফাঁক হয়ে আরও কয়েকটা দাঁত বেরিয়ে পড়ল। সে বলল, বহুৎ আচ্ছা টিরোরিস। থোড়ে টিইম (টাইম) বাদ সাফাইবালারা এসে টাট্টির বর্তন নিয়ে যাবে। সাত বাজে আমি এসে তোমাকে নিচে নিয়ে যাব। তখন সবেহকা নাস্তা মিলেগা। তৈয়ার থেকো। সে আর দাঁড়াল না।
আধঘণ্টার মতো কেটে গেল। তারপর একজন আর্মড পুলিশ একটা সাফাইওয়ালা অর্থাৎ সুইপারকে সঙ্গে নিয়ে এল। তার। হাতে চাবির গোছা। তালা খুলে পুলিশটি ছোট্ট সেলটা তীক্ষ্ণ চোখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল। আমার মতো একজন টেরোরিস্ট এক রাত্রির মধ্যে পায়ে বেড়ি-লাগানো অবস্থায় মহান ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কোনও ষড়যন্ত্র করেছি কিনা এবং তার কোনও চিহ্ন কোথাও পাওয়া যায় কিনা সেটা দেখাই তার উদ্দেশ্য। সাফাইওয়ালা ময়লার গামলা মাথায় তুলে নিয়েছিল। তাকে নিয়ে নিঃশব্দে পুলিশটি বাইরে গিয়ে ফের তালা লাগিয়ে চলে গেল।
আমি দাঁড়িয়েই রইলাম। দেখতে দেখতে সূর্য উঠে গেল। কুয়াশার বেড়াজাল ছিঁড়ে ছিঁড়ে সোনালি রোদ ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এদিকে পুরো সেলুলার জেগে উঠেছে। চারদিকে তুমুল ব্যস্ততা এবং হইচই। হঠাৎ খেয়াল করলাম, ফাঁসির আসামির চিৎকার থেমে গেছে। তবে কি তার শেষ ভরসা ভগোয়ান রামজির কাছে প্রার্থনা করেও ব্যর্থ হওয়ায় হতাশায় সে চুপ করে গেছে। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল।
আসলাম খান একজন সশস্ত্র পুলিশকে সঙ্গে করে আবার দর্শন দিল। তালা খুলে বলল, থালি লেকে চল টিরোরিস জনাব। নাস্তা তৈয়ার। পায়ের বেড়ি খুলে আমাকে বাইরের টানা অলিন্দে নিয়ে আসা হল। আরও কয়েকজন টিল্ডাল আর পেটি অফিসার আর পুলিশ অন্য সেলগুলো খুলে কয়েদিদের বের করে ফেলেছে। সবার হাতেই খাবারের থালি আর জলের গেলাস।
পাশের কুঠুরির বৈজু আমার কাছে এগিয়ে এল। আমার থালিটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জিগ্যেস করে, কিয়া ভাইসাব, কাল রাত্তিরে আপনি খানা খাননি? আপনার থালিয়ায় চাপাটি পড়ে আছে? তাকে বললাম, না, কাল খিদে ছিল না। বৈজু বলল, আপনার থালিয়ায় চাপাটি দেখলে আজ আর নাস্তা দেবে না। ও দুটো আমি নিচ্ছি। আমি কিছু বলার আগেই চকিতে ছোঁ মেরে আমার কালকের বাসি চাপাটি দুটো দিয়ে সবজি মুড়ে নিয়ে গরাদের ফাঁক দিয়ে নিজের কুঠুরিতে ছুঁড়ে দিল। হেসে ডগমগ হয়ে বলল, আপনাকে বলেছিলাম, আমার ভুখটা বহুৎ বেশি। চাপাটি দুটো আমার সেলে থাক। পরে খাওয়া যাবে। আমি একটু হাসলাম শুধু। কিছু বললাম না।
এরপর পুলিশ, টিল্ডাল আর পেটি অফিসাররা শোভাযাত্রা করে কয়েদিদের সিঁড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া হল। বৈজু আমার গায়ে জোঁকের মতো সেঁটে আছে। চলতে চলতে খাটো গলায় বলল, এখন নিচে নামিয়ে নিয়ে আমাদের নাস্তা দেওয়া হবে।
ভাইসাব,আপনার ভাগ থেকে আমাকে থোড়া কুছ দেবেন। এবারও জবাব না দিয়ে হাসলাম।
আমি আর বৈজু ছিলাম মিছিলের পেছনে। লেজের দিকে। হঠাৎ সামনের দিক থেকে রাজনাথ আর মুকুন্দ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে জিগ্যেস করল, পায়ে বেড়ি লাগিয়ে কালাপানির রাতটা প্রথম কেমন লাগল? আমিও গলার স্বর উঁচুতে তুলে বললাম, তোফা। তোদের কেমন কেটেছে? রাজনাথরা বলল, স্বর্গসুখ কাকে বলে এখানে না এলে জানতে পারতাম না।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।