জাফর আলি কী উত্তর দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই একটা করুণ, কাতর, আর্ত চিৎকার সেলুলার জেলের নিস্তব্ধ রাত্রিকে ভেদ করে আকাশের দিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল, বঁচাও– বঁচাও-হো ভগোয়ান রামজি মুঝে বঁচাও-ও-ও বঁচাও–
শিউরে উঠলাম। শব্দটা আমার হৃৎপিণ্ডে যেন আমূল বিধে যেতে লাগল। এমন তীক্ষ্ণ, অস্বাভাবিক আর্তস্বর আগে আর কখনও শুনিনি। কাঁপা কাঁপা গলায় জিগ্যেস করলাম, কে কাঁদছে?
জাফর আলি টিল্ডাল এতটুকু বিচলিত হয়নি। হাত নেড়ে মাছি তাড়ানোর মতো ব্যাপারটা উড়িয়ে দিয়ে নিস্পৃহ সুরে বলল, ও শালে, এক ফাঁসির আসামি। সাত রোজ আগে ওর ফাঁসির হুকুম হয়েছে। কাল সুবেহ আট বাজে ওকে রশির ফান্দা গলায় লাগিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। একটু কী ভেবে ফের বলল, তুমি নয়া এসেছ তো। তাই ঘাবড়ে গেছ। তুমি দশ আদমিকে কোতল করেছ। তোমার এত ডরের কী আছে? সে আরও জানাল, এরকম ফাঁসি ফি মাসে তিন-চারটে করে হয়। এমনভাবে বলল, ফাঁসিটা এই জেলখানায় যেন জলভাতের মতো ব্যাপার।
জিগ্যেস করলাম, কী করেছিল ও? জাফর আলি বলেছিল, শালে কুত্তে, ভারী কসুর কিয়া। লোকটার অপরাধ কী সেটা আর বলল না; আমিও জানতে চাইলাম না।
জাফর আলি বলল, ফাঁসির আগের রাতে সব আসামি এরকম চিল্লায়। কেউ খোদাকে ডাকে, কেউ ভগোয়ানকে। সমঝা? দো-চার মাহিনা এখানে থাকো। সব জানতে পারবে। আমি উত্তর দিলাম না।
কাল সকালে যে লোকটার গলায় ফাঁসির দড়ি পরানো হবে, জাফর আলি টিল্ডাল তাকে নিয়ে আর মাথা ঘামাতে চাইল না। আকছার এখানে এসব ঘটছে। এতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে।
ফাঁসির আসামিটা সমানে চেঁচিয়ে চলেছে। বুকফাটানো প্রবল সেই আর্তনাদ। জাফর আলি সেটা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে বলল, তোমার কাছে পাইসা (পয়সা) আছে? তাকে বললাম, পয়সা কোথায় পাব? না–নেই।
জাফর আলি বিশ্বাস করল না। বলল, বহুৎসে কয়েদি গলার অন্দর থলিয়া বানিয়ে পাইসা রুপাইয়া সোনে চাদি ভি ছিপাকে নিয়ে আসছে। আর তুমি আনননি, এটা আমি মানব?
আমি হাঁ হয়ে গিয়েছিলাম। গলার ভেতর কোন কৌশলে গোপন থলি বানানো যায় এবং তার ভেতর সোনাদানা টাকা পয়সা ঢুকিয়ে আনা যায় আন্দামানে না এলে জানতে পারতাম না। বললাম, মানা, না-মানা তোমার ইচ্ছা। সাফ বলে দিচ্ছি, আমার গলার ভেতর থলেও নেই, টাকা-পয়সাও নেই।
জাফর আলি টিল্ডালের বিস্ময়ের সীমা-পরিসীমা ছিল না। সে বলল, দশঠো কোতল করতে পেরেছ, আর গলায় একটা থলিয়া বানাতে পারোনি! ছো? প্রবল ঘৃণায় অলিন্দে থুতু ফেলে বলতে লাগল, পিনিক নেই, চরস নেই, পাইসা নেই। তোমার কাছে বেকার এসে টেইম (টাইম) বরবাদ করে গেলাম। বলে আর দাঁড়াল না; বাঁদিকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
জাফর আলি চলে যাবার পরও আমি গরাদ ধরে দাঁড়িয়েই আছি। ঘুম আসছিল না। সেই কয়েদিটা খুব কাছাকাছি কোনও একটা সেলে রয়েছে। তার কান্নার আওয়াজ শুনে তাই মনে হয়। তখন কত রাত কে জানে। যদি মধ্যরাতই হয়, আর কয়েক ঘণ্টা পর তাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হবে। মৃত্যু পায়ে পায়ে যত এগিয়ে আসছে ততই তার আর্তনাদ আরও আরও তীব্র হয়ে উঠছে। হো ভগোয়ান রামজি, মুঝে বঁচা দে।
সেলুলার জেলে সেই মুহূর্তে আমি ছাড়া আর বুঝিবা কেউ জেগে নেই। প্রায় হাজারটা সেলের সব কয়েদি ঘুমিয়ে পড়েছে। জাফর আলির মতো তারাও এরকম কত ফাঁসির আসামির বুক কাঁপানো কত আর্তনাদ শুনেছে। এতে তাদের কিছু আসে যায় না। নিশ্চিন্ত, বিঘহীন তাদের রাতের ঘুম। অতন্দ্র শুধু ওয়াচ টাওয়ারের পাহারাদার আর রাইফেলধারী সেন্ট্রিরা।
রামজির কাছে জীবনদানের প্রার্থনা করতে করতে কয়েদিটার গলা চিরে চিরে যাচ্ছে। ভগোয়ান রামজির কানে সেই আর্জি পোঁছচ্ছে কি না, কে বলবে। তার কান্নাটা ঘুমন্ত সেলুলার জেল জুড়ে একটা গা ছমছম-করা ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে। চলেছে।
আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না। পা ভেঙে আসছিল। চার দিনের সমুদ্রযাত্রা, সাইক্লোন, তারপর সেলুলার জেলে পৌঁছে সমস্ত দিনের ধকল–শরীর আর কতক্ষণ সইতে পারবে! আমি দরজার কাছ থেকে কুঠুরির ভেতর দিকে চলে গেলাম। একপাশে খাবারের থালাটা চাপা দেওয়া রয়েছে। আরেক পাশে পায়খানা পেচ্ছাপের জন্য বড় গামলার মতো পাত্র। বিকেলে যে চাপাটি দেওয়া হয়েছিল তা ঠান্ডা হয়ে এতক্ষণে শুকনো চামড়া হয়ে গেছে। তা চিবতে গেলে দাঁতের গোড়া আলগা হয়ে যাবে। তাছাড়া খাওয়ার ইচ্ছাটা আগেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। চাপাটি ঢাকা দেওয়াই রইল। আমি এক গেলাস। জল খেয়ে কম্বল পেতে কুঠুরির মাঝখানে শুয়ে পড়লাম। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম।
আমরা যারা সশস্ত্র বিপ্লবে বিশ্বাসী তাদের ঘুম খুব ঠুনকো। কেননা পুলিশ যে কোনও সময় তাদের আস্তানায় হানা দিতে পারে। তাই সামান্য আওয়াজেই জেগে যেতাম। পুলিশ না এলে ঠিক আছে। এলে তক্ষুনি পালাতে হবে।
যত রাতেই ঘুমোই না কেন, ভোর হতে না হতেই উঠে পড়তাম। সেলুলার জেলেও তার ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। পরদিন, তখনও ভালো করে সকাল হয়নি, বাইরে আবছা আবছা তরল অন্ধকার। প্রথমটা বুঝতে পারছিলাম না, কোথায় আছি। পরক্ষণে সেই ফাঁসির আসামির আর্ত চিৎকার ভেসে এল। খুব সম্ভব সমস্ত রাত সে একটানা কেঁদে গেছে। কেঁদে কেঁদে গলার স্বর এখন আরও বিকৃত, আরও ভাঙা ভাঙা। অলিন্দে পাহারাদারের বুটের আওয়াজ চলছেই। এবার ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি সেলুলার জেলে রয়েছি।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।