কতক্ষণ গরাদ ধরে দাঁড়িয়েছিলাম, খেয়াল নেই। সেটা খুব সম্ভব শুক্লপক্ষ। মাউন্ট হ্যারিয়েটের পেছন দিক থেকে চাঁদ উঠে এসেছে। অফুরন্ত রুপোলি জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে যতদূর দেখা যায় ছোট বড় নানা দ্বীপ, দ্বীপের গায়ে ঘন অরণ্য আর বঙ্গোপসাগর। দৃশ্যটা আশ্চর্য সুন্দর, স্বপ্নের মতো। তার মধ্যে অনন্ত দুঃস্বপ্নের মতো দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের মাথায় সেলুলার জেল। সেখানে কয়েদিরা ঘুমোয় কিন্তু শতচক্ষু মেলে জেলে থাকে ইংরেজদের পোষা পাহারাদারের হিংস্র বাহিনী।
হঠাৎ দরজার সামনে ছায়ামূর্তির একটা লোক এসে দাঁড়াল। তার পুরো মুখটা দেখা যাচ্ছে না। তবে অলিন্দের সিলিং থেকে। যে তেজি বাল্ব ঝুলছিল তার আলো এসে পড়েছে তার ডান গালের ওপর। গালটা পোড়া ঝামার মতো; মাংস শুকিয়ে, ফুলে, কুঁচকে কুঁচকে রয়েছে। নাক বলতে বিশেষ কিছু নেই। শ্বাস প্রশ্বাসের জন্য শুধু দুটো সুড়ঙ্গ। ওপরের ঠোঁটটা ভেতর দিকে। ঢোকানো; নিচের কালো পুরু ঠোঁটটা বাইরে ঝুলে আছে। তার ফাঁক দিয়ে ভাঙা দাঁত বেরিয়ে রয়েছে।
আমি চমকে উঠেছিলাম। এমন বীভৎস চেহারা আগে কখনও দেখিনি। যেন একটা প্রেত।
লোকটা একটু হেসে, ঘষা ঘষা গলায় হিন্দুস্থানিতে বলল, তুমি আজ নয়া এসেছ, দেখলাম। জাহাজে করে যখন নয়া নয়া কয়েদিকালাপানি আসে তখন এই কয়েদখানায় নয়া নয়া রোশনি জ্বলে ওঠে। তা ভাইয়া, তুমি মেনল্যান্ডে কী করে এসেছকটা খতম? আমি তিন আদমিকে কোতল করে এসেছিলাম।
লোকটাকে বেশ রসিক মনে হল। প্রথমটা চেহারা দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তার কথা শুনতে শুনতে ভয় কেটে গেল। বেশ মজাও পাচ্ছিলাম। বুঝতে পারলাম, কোন অপরাধে আমাকে আন্দামানে চালান করা হয়েছে, সে জানে না। তার কথার উত্তর দিলাম না।
লোকটা ফের শুরু করল, কমসে কম তিন চারঠো কোতল করে না এলে এখানকার পুরনো কয়েদিরা ইজ্জত দেয় না। মালুম হচ্ছে, তুমিও তাই করে এসেছ।
তাকে বললাম, ধরে নাও, আমি পাঁচ-ছটা খুন করে এসেছি।
লোকটা কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে রইল। তারপর জোরে জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে তারিফের সুরে বলল, ওয়াহ, ওয়াহ্, তুমি তো শের হো জনাব! কুর্নিশের ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকিয়ে কপালে হাত ঠেকাল। তোমাকে হাজারো সেলাম। হো ভেইয়া, তুম কোন মুল্লুককা মূর্তি?
বললাম, বাংলা মুল্লুক। কেন?
নোকটা অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে আমার পা থেকে মাথা অব্দি বার কয়েক দেখল। তারপর বলল, বঙ্গালির সিনায় (বুকে).ইতনা তাকত। বহুৎ তাজ্জবকি বাত।
আমি জবাব দিলাম না। হঠাৎ খেয়াল হল, একটা কয়েদি এত রাতে সেলের দরজা খুলে কী করে আমার দরজার সামনে চলে আসতে পারল! যে আর্মড পুলিশটা অলিন্দের এ মাথা থেকে ও মাথায় সমানে চক্কর দিচ্ছে সে তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না! যা ভাবছিলাম, রীতিমতো অবাক হয়ে সেই প্রশ্নগুলো তাকে করলাম। সে ভাঙা ভাঙা দাঁত বের করে হাসল। বলল, আমাকে কুঠরিতে তালাবন্ধ হয়ে থাকতে হয় না। দিনে কী রাতে যখন যেখানে যাই না, কোনও পেহেরাদার আমাকে কিছু বলবে না। কুছ ভি নেহী–
আমি হতভম্বের মতো বলি, তুমি খুন করে কালাপানি এসেছিলে না? কয়েদি তো?
লোকটা বলল, জরুর।
তা হলে? আমি জিগ্যেস করলাম।
লোকটা বলল, কয়েদি হলেও আমি টিল্ডাল। জেলরসাব আমাকে মেহেরবানি করে টিল্ডাল বানিয়ে দিয়েছেন।
সেদিন বুঝতে পারিনি, পরে জেনেছিলাম কয়েদিদের ভেতর থেকে কয়েকজনকে বেছে নিয়ে সেলুলার জেলের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন পেটি অফিসার, টিল্ডাল এমনি সব পজিশনে বসিয়ে দেয়। তারা সরকারের বিশ্বস্ত বাহিনী। এরা মোটামুটি স্বাধীন; তবে সেলুলার জেলের চৌহদ্দির বাইরে এদের পা বাড়াবার হুকুম নেই। এদের কাজ হল অন্য বেয়াড়া, ঠ্যাটা, বেপরোয়া কয়েদিদের শায়েস্তা রাখা। পদমর্যাদায় টিল্ডালরা পেটি অফিসারদের চেয়ে একস্তর নিচে। লোকটার কথাবার্তা, হাবভাব দেখে বোঝা যাচ্ছিল সে মুসলমান৷ জিগ্যেস করলাম টিন্ডাল তো বুঝলাম। তোমার নিশ্চয়ই একটা নামও আছে। সেটা কী?
লোকটা বলল, জাফর আলি৷ খাস ইলাহাবাদি। মতিলাল নেহরু, জবারলাল নেহরুকা মহল যিস টেনমে (টাউনে) হায় উঁহাকা রহনেবালা থা। লেকিন অব সেলুলার জেল আপনা মকান। পুরা জিন্দেগি কে লিয়ে
আমি কিছু বললাম না। এই নিঝুম রাতে সেন্ট্রিদের বুটের আওয়াজ ছাড়া যেখানে আর কোনও শব্দ নেই, আচমকা মাটি কুঁড়ে জাফর আলি নামে টিল্ডালটি উঠে এসেছে সেটা নেহাত আলাপ জমাবার জন্যে নয়; বৈজুর মতো তারও নিশ্চয়ই কোনও গুঢ় উদ্দেশ্য রয়েছে। অপেক্ষা করতে লাগলাম।
লোকটা ঝপ করে গলা নামিয়ে ষড়যন্ত্রকারীর মতো ফিস ফিস করল, জনাব, বঙ্গলকা শের, আপকো পাস চরস হ্যায়?
চরস যে মারাত্মক কড়া নেশার জিনিস, সেটা জানতাম! বিপ্লবীদের গীতা স্পর্শ করে সে সময় প্রতিজ্ঞা করতে হত, নেশাভাং করবে না, নারীর কাছ থেকে দূরে থাকবে। জিতেন্দ্রিয় না হলে বিপ্লবী হওয়া যেত না। তেমন এক দেশব্রতীর কাছে কিনা টিল্ডাল জাফর আলি চরসের খোঁজ করছে! আমি রুক্ষ গলায় বলেছিলাম, নেই।
জাফর আলি একটু যেন হতাশ হয়ে বলল, পিনিক হ্যায়?
জিনিসটা কী, আগে কখনও শুনিনি। বললাম, পিনিক কাকে বলে? জাফর আলি বুঝিয়ে দিল, গাঁজার সঙ্গে আরও তীব্র ধরনের কী সব মিশিয়ে সেটা তৈরি করতে হয়। সেলুলার জেলে প্রথম দিন পা দিয়েই আমার জ্ঞানের ঝুলিটি ভরে উঠতে লাগল। এতকাল চরিত্রগঠন, গীতাপাঠ এবং দেশের স্বাধীনতা ছাড়া অন্যকোনও দিকে লক্ষ ছিল না। এখানে এসে একদিনেই কত কিছুই। না জানতে পারলাম।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।