টাকা, ক্যামেরা এবং ফোটো নিয়ে আমি উঠে পড়লাম।
মণিমোহন আরেকবার আমাকে মনে করিয়ে দিলেন, সময়ের কথাটা খেয়াল আছে তো? দুমাসের মধ্যে কিন্তু ফোটোগুলো আমার চাই।
বললাম, আমার মনে আছে। একটা কথা জিগ্যেস করব?
অবশ্যই।
ওইসব ফোটো দিয়ে আপনি কী করবেন?
এর উত্তর আমি দেব না। আশা করি আপনার আর কোনও প্রশ্নই নেই। উইশ ইউ এভরি সাকসেস।
লোকটা আমাকে ভদ্রভাবে চলেই যেতে বলছে। বললাম, ধন্যবাদ।
হে মহান জনগণ, রাস্তায় বেরিয়ে দুরমনস্কর মতো হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে লাগলাম, ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? মনোবীণা সান্যাল তার মেয়ে অর্থাৎ শমিতাকে শোধরাবার দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন আমার হাতে। এদিকে মল্লিক মশাই আমাকে দিয়েই শমিতার নুড পিকচার আর কিছু বেডরুম সিন তোলাতে চান। হে মহান জনগণ, বুঝতে পারছেন আমি একটা সাঙ্ঘাতিক কাঁচাকলে পড়ে গেছি।
.
০৯.
লতিকা উদ্গ্রীব হয়ে বলে ছিল। আমি অফিসে ফিরতেই জিগ্যেস করল, যেখানে গিয়েছিলে কী হল সেখানে?
মণিমোহনের ক্যামেরাটা টেবিলে রেখে বসতে বসতে বললাম, টেরিফিক ঝামেলার ব্যাপার–
মানে?
আগে অ্যাডভান্সের টাকাটা ধরো। তারপর বলছি। পকেট থেকে সেই পাঁচ হাজার টাকা বার করে লতিকাকে দিতে দিতে বললাম, আমাদের পার্সোনাল ডিপার্টমেন্টটা এবার ক্লোজ করে দিতে হবে।
এত তাড়াতাড়ি। ছমাসও তো হয়নি ওটা খোলা হয়েছে। বলতে বলতে ক্যামেরাটার দিকে চোখ পড়ল শমিতার, আরে এটা কোথায় পেলে।
যার কাছে গিয়েছিলাম সে দিয়েছে।
অ্যাডভান্সের টাকা দিয়েছে; তার ওপর ক্যামেরাটাও দিল!
আরো একটা জিনিস দিয়েছে।
কী?
একটা ফোটো-পকেট থেকে শমিতার ফোটোটা বের করে কাচের দেয়ালের সেই গোল ফুটোর ভেতর দিয়ে লতিকার দিকে বাড়িয়ে দিলাম।
ফোটোটা দেখে খানিকক্ষণ আগে আমার মতোই চমকে উঠল লতিকা। তার গলার ভেতর থেকে আধফোঁটা গোঙানির মতো শব্দ বেরিয়ে এল, সেই মেয়েটা না, মানে শমিতা?
মনোবীণা সান্যাল শমিতার যে ফোটোটা দিয়েছিলে সেটা আগেই তাকে দেখিয়েছিলাম। আমি ঘাড় হেলিয়ে দিয়ে বললাম, ইয়েস ম্যাডাম।
লতিকা বলল, তুমি যেখানে যাচ্ছ সেখান থেকেই ওর ফোটো নিয়ে আসছ। ব্যাপারটা কী বলো তো?
এ বোধহয় হোল ওয়ার্ল্ডে ছড়িয়ে আছে। সে যাক গে, যে কাজের জন্যে গিয়েছিলাম এবার সেটা শোনো।
বলো–লতিকা উৎসুক মুখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
মণিমোহন মল্লিক আমাকে কী কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন, বলে গেলাম। শুনে লতিকার চোখের তারা কপালে উঠে গেল। বলল, এ সব তুমি করবে।
একটি সুন্দর যুবতী মেয়ের নুড ছবি তোলা–কাজটা যাই বলো দারুণ এক্সাইটিং। আমার খুব একটা ইচ্ছে নেই। তবে তুমি যদি পারমিসান দাও–মানে অনেক দিন এক ধরনের কাজ করে যাচ্ছি। মনোটনি লাগছে; এটা করলে একটু ডাইভার্সিফিকেশন হত। বলে হাসতে লাগলাম।
অসভ্যতা করবে না। দিস ইজ অফুলি ব্যাড। ওই মণিমোহন লোকটার উদ্দেশ্য কী বলো তো?
নিশ্চয়ই মহৎ কিছু নয়। তাহলে এই কাজটায় তোমার আপত্তি আছে?
হ্যাঁ।
জানতাম। সেই জন্যই পার্সোনাল ডিপার্টমেন্টের গণেশ ওল্টাবার কথাটা আগেই বলেছিলাম। পাঁচ হাজার টাকা অ্যাডভান্স, তার ওপর একটা ক্যামেরা ফাউ। ব্যাপারটা মন্দ হল না, কী বলো?
আমার কথা শেষ হল কি হল না, আচমকা টেলিফোনটা বেজে উঠল। ওটা তুলে নিয়ে কানে লাগাতেই চার্লির গলা ভেসে এল, লর্ড, আমি বলছি
মাঝখানে খানিকটা সময় এমন এক্সাইটমেন্টের মধ্যে কেটেছে যে চার্লির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। যাই হোক জিগ্যেস করলাম, তুমি এখন কোথায়?
সাদার্ন অ্যাভেনিউতে। একটা প্রাইভেট ক্লাবের সামনে ল্যাম্পপোস্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। তোমার সেই তিনি পনেরো মিনিট আগে ক্লাবটার ভেতর ঢুকেছেন। মনে হচ্ছে বেশ কিছুক্ষণ এখানে থাকবেন। চট করে চলে এসো–চার্লি জায়গাটা বলে দিল।
ফোনটা ক্রেডেলে নামিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। নাঃ, শমিতার হাত থেকে বোধহয় মুক্তি নেই। অলৌকিক কোনও শক্তি প্রচণ্ড নিয়তির মতো যেন চারদিক থেকে আমাকে টানতে শুরু করেছে।
লতিকা অবাক হয়ে গেল। বলল, এ কী! উঠলে যে! কোথায় যাচ্ছ?
একটা প্রাইভেট ক্লাবে। শমিতা সেখানে রয়েছে।
শমিতা!
হ্যাঁ-আমি কাচের দেয়ালটার দিকে ঝুঁকে চাপা গলায় বললাম, ভয় নেই; ওইসব ফোটো তুলব না।
তবে যাচ্ছ কেন?
ওর ব্যাপারটা একটু জানতে চাই। মেয়েটা দারুণ ইন্টারেস্টিং। এ রকম ক্যারেক্টার আগে কখনও দেখিনি।
লক্ষ্য করলাম লতিকার মুখের ওপর একটা ছায়া পড়েই মিলিয়ে গেল। একটু চুপ করে থেকে সে বলল, তোমাকে ফোন করে কে শমিতার খবর দিল?
চার্লি—
লতিকা চার্লিকে চেনে। সে জিগ্যেস করল, ওকে বুঝি শমিতার পেছনে লাগিয়ে রেখেছ?
শমিতার সঙ্গে চার্লিকে যে জুড়ে দিয়েছি–এ কথাটা লতিকাকে বলা হয়নি। তার মানে এই নয় যে ওটা গোপন করতে চেয়েছি। লতিকার কাছে ঢাকা-ঢাকির কোনও ব্যাপারই নেই আমার। একটু থতিয়ে গিয়ে বললাম, হ্যাঁ। শমিতাকে স্টাডি করতে হলে অলওয়েজ ওর পিছনে লেগে থাকতে হয়।
আমার সেই সময় কোথায়? তাই চার্লিকে লাগিয়ে দিয়েছি। একটু থেমে আবার বলাম, এ ব্যাপারটা তোমাকে জানানো হয়নি, প্লিজ কিছু মনে কোরো না।
লতিকা হাসল, তোমার কাছে আমি এমনই গ্রেটফুল যে কখনও কোনও কারণেই কিছু মনে করব না।
দেখো ওসব কৃতজ্ঞতার-টুতজ্ঞতার কথা বললে আমি ভীষণ ঘাবড়ে যাই।
