হে মহান জনগণ, গোটা ব্যাপারটাই কেমন যেন রহস্যময়–টেরিফিক রকমের মিস্টিরিয়াস।
যাই হোক লেফট-রাইট করতে করতে এগুতে লাগলাম। যেতে যেতে দুধারে মোট তিনখানা ঘর পড়ল। একটা ঘর দেখে মন হল ফোটো ডেভলপ করার ডার্ক রুম। বাকি দুটোতে খোলা দরজা দিয়ে উঁচু অনেকগুলো স্টিলের ব্ল্যাক দেখতে পেলাম। র্যাকগুলোতে অগণিত ফাইল সাজানো রয়েছে। শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট ঘরখানার কাছে এসে পর্দা সরাতেই ঘরের মাঝখানের উঁচু টেবলটায় ক্রস করা দুটো পা চোখে পড়ল। আর সেই পায়ের ফাঁক দিয়ে টেবলটার পিছনে ইজিচেয়ারে মধ্যবয়সি একটি লোককে আধশোয়া অবস্থায় দেখতে পেলাম। নিশ্চয়ই ইনি মণিমোহন মল্লিক।
মণিমোহন আমাকে দেখতে পেয়েছিলেন। আস্তে আস্তে পা দুটো নামিয়ে সোজা হয়ে বসে বললেন, পার্সোনাল অফিস থেকে আসছেন নিশ্চয়ই?
আজ্ঞে হ্যাঁ–আমি ঘাড় কাত করলাম।
আপনার জন্যেই অপেক্ষা করছি। আমিই মণিমোহন, বসুন–
মণিমোহনের ইজিচেয়ারটার ডানপাশেই সোফা-টোফা সাজানো রয়েছে। আমি একটা সোফায় বসে দ্রুত এক পলক তাঁর পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিলাম। চুয়ান্ন-পঞ্চান্নর মতো বয়স। গোল মুখে শক্ত চোয়াল, থ্যাবড়া থুতনি, মোটা নাক। রোমশ ভুরুর তলায় মাঝারি চোখ। সাধারণ বাঙালিদের মতো হাইট, ব্যাকব্রাশ করা চুল। তবে শরীরে যথেষ্ট অনাবশ্যক মেদ রয়েছে। এটা প্রচুর মদ্যপানজনিত।
মণিমোহনের দিকে তাকালে প্রথমেই যা চোখে পড়ে তা হল তার মুখের অস্বাভাবিক লাল রঙ। মনে হয় শরীরের সব রক্ত সেখানে উঠে এসেছে। হয়তো সত্যিই তিনি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন।
ইজিচেয়ারটা আমার দিকে ঘুরিয়ে নিলেন মণিমোহন। তারপর বললেন, আপনাকে কষ্ট দিলাম। কিছু মনে করবেন না।
না না, মনে করব কেন? আমি হাসলাম।
আপনাকে দশ মিনিটের বেশি আটকাব না। কাজের কথা শুরু করা যাক–হে মহান জনগণ, কাজ যা করব তা তো আমি জানিই, তবু অ্যাডভান্সের টাকাটা বাগাতে হলে কিছু ভড়ং-টংও তো করতে হয়; নইলে পার্টিকে ফাসাব কী করে? মুখের ভাবখানা দারুণ সিরিয়াস করে তাকিয়ে রইলাম।
মণিমোহন মল্লিক বলতে লাগলেন, কাজটা হল একটি মেয়েকে সর্বক্ষণ আপনাকে ফলো করতে হবে। আর
তার কথার মাঝখানেই বলে উঠলাম, মেয়েটা কে?
কলকাতা শহরে কয়েক লক্ষ মেয়ে আছে। নাম বললেই কি চিনতে পারবেন? কথাটা ঠিকই বলেছেন মণিমোহন। সুতরাং আমাকে চুপ করে থাকতে হল। মণিমোহন আবার বললেন, আপনাকে সব ডাটা দিয়ে দেব। তার আগে আপনার কাছে কী কাজ চাই শুনে নিন।
ঠিক আছে। বলুন
মেয়েটা একটা দুর্দান্ত ড্রাঙ্কার্ড। এ ব্যাপারে পুরুষদের সে কান কেটে দিতে পারে। হোটেলে, ক্লাবে সব জায়গায় সে ঘুরে বেড়ায়। মাতাল অবস্থায় ওর জামা কাপড়ের ঠিক থাকে না; এর কিছু নুড ছবি আমাকে তুলে দিতে হবে। এছাড়া অনেকে তার এই মাতলামির সুযোগ নেয়; বাড়িতে পৌঁছে দেবার নাম করে নিজের বেডরুমে নিয়ে আসে। এই বেডরুমের কিছু হট ছবিও আমার দরকার।
আমি আপনাদের এই রাজীব সরকার মনুষ্য জাতির যাবতীয় দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে থাকি। নানা টাইপের লোক অদ্ভুত অদ্ভুত অনুরোধ নিয়ে আমাদের পার্সোনাল ডিপার্টমেন্টে আসে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ন্যুড ছবি কিংবা বেডরুমের রগরগে ঝাঝালো দৃশ্যের শট নেবার দায়িত্ব কেউ আমাকে দেয়নি। আমি ঘামতে লাগলাম। টের পাচ্ছি আমার জামা, গেঞ্জি এবং কোমরের ট্রাউজারটা ভিজে সপসপে হয়ে যাচ্ছে।
মণিমোহন মল্লিকের গলা আবার শোনা গেল, এর জন্যে আপনাকে পনেরো হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। এবং পাঁচ হাজার অ্যাডভান্স। এ সম্বন্ধে আপনার কিছু বলবার আছে?
হঠাৎ আমি আমার নিজের মধ্যে ফিরে এলাম। আরে এত ঘামছি কেন? এত নার্ভাসই বা কেন হচ্ছি? আমার কাজ তো অ্যাডভান্স নেওয়া পর্যন্ত। মন থেকে নার্ভাসনেসটাকে ঝেড়ে ফেলে বললাম, না না, ঠিক আছে।
জানতাম, টাকার এই ফিগারটা আপনার অপছন্দ হবে না। সে যাক, আপনার ক্যামেরা আছে?
না।
আমি আপনাকে ক্যামেরা দেব। আর একটা কথা–এই ফোটোগুলো দুমাসের মধ্যে চাই।
ফোটো যখন তুলবই না; দুমাসই বা কী, আর দুঘন্টাই বা কী। আমার কাছে সব সমান। বললাম, তাই পাবেন।
মণিমোহন বললেন, এবার তাহলে কাজটা সারা যাক। যে মেয়েটির ফোটো আপনাকে তুলতে হবে তার সঙ্গে কিন্তু আলাপ করিয়ে দিতে পারব না।
তাকে চিনব কী কবে?
তার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
উঁচু টেবলটার ড্রয়ার খুলে একটা ফোটো বার করে টেবলের ওপর রাখলেন মণিমোহন। সেটার দিকে চোখ পড়তেই ফোর ফর্টি ভোল্টের ইলেকট্রিসিটি আমার নার্ভের ভেতর দিয়ে বয়ে গেল। ফোটোটা শমিতার।
মণিমোহনের গলা আবার শোনা গেল, এরা থাকে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে। তবে একে ধরবার জন্যে সেখানে যাবার দরকার নেই। কলকাতার পশ হোটেল আর বড় বড় ক্লাবগুলোতেই ঘুরলেই এর দেখা পাওয়া যাবে। আপনি একটু বসুন, আমি আসছি।
মণিমোহন মল্লিক উঠে ভেতরের অন্য একটা ঘরে চলে গেলেন। এক মিনিটের মধ্যেই হাতে একটা ক্যামেরা ঝুলিয়ে আবার ফিরে এলেন। ক্যামেরাটা টেবিলের ওপর রেখে সেই ইজিচেয়ারটায় বসতে বসতে বললেন, তাহলে আজ থেকেই কাজটা শুরু করে দিন। ক্যামেরা আর ফোটোটা নিয়ে যান। ও হ্যাঁ, অ্যাডভান্সের টাকাটাই তো দেওয়া হয়নি। সামনের বড় টেবলটার ড্রয়ার খুলে একগাদা একশো টাকার নোট বার করে গুণে গুণে পঞ্চাশটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন, এই যে
