প্রমিস?
প্রমিস।
আমি কিছু বুঝবার আগেই প্রকাশ্য দিবালোকে এই খোলা সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ আমাকে জড়িয়ে ধরে গোলে এবং ঠোঁটে একসঙ্গে আট দশটা চুমু খেল ডরোথি। তারপর ছেড়ে দিয়ে নাকের ডগায় আলতো টোকা মেরে বলল, মুখটা মুছে নিও, লিপস্টিকের দাগ লেগে গেছে।
ডরোথির হাত থেকে ছাড়া পেয়ে অফিসে যখন পৌঁছুলাম দশটা বেজে গেছে। আমার আগেই লতিকা এসে গিয়েছিল। সে কাচের দেয়ালের ওপারে বসে আছে।
এয়ার কুলারটা চালানোই ছিল; নিজের রিভলভিং চেয়ারে বসতে বসতে লতিকাকে লক্ষ্য করলাম। সে ঠিক হাত-পা গুটিয়ে চুপচাপ বসে নেই; মোটা খাতার ওপর ঝুঁকে কী হিসেব-টিসেব দেখছে। ডাকলাম, অ্যাই লতিকা-লতিকা বলল, প্লিজ দুমিনিট-ঠিক দুমিনিট পরেই মুখ তুলে বলো, বলো–আজ বিজনেসের খবর কী?
এই তো সবে অফিস খুলল; কোনও খবর নেই।
একটু চুপচাপ। লতিকা আবার হিসেবের খাতায় ঝুঁকল। আমি এবার বললাম, কী হল? আবার হিসেব নিয়ে পড়লে যে?
কী করব?
কই জিগ্যেস করলে না তো কাল অফিস ছুটির পর আমি কোথায় গিয়েছিলাম?
জিগ্যেস করে কী করব। জানি তুমি নিজেই বলবে।
আমার ওপর দারুণ বিশ্বাস দেখছি।
খাতাটা বন্ধ করে এবার সোজা আমার দিকে তাকাল লতিকা। বলল, বিশ্বাস করব না বলছ?
বললাম, আমি তো অনেক কিছু লুকিয়ে রাখতে পারি।
লতিকা একটু হাসল। তারপর বলল, কোথায় গিয়েছিলে বলো
কাল হোটেলে গিয়ে শমিতার সঙ্গে দেখা করার পর থেকে তাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত সব বলে গেলাম; একটা কথাও গোপন করলাম না।
সমস্ত শুনে পলকের জন্যে লতিকার মুখে ছায়া পড়ল। পরক্ষণেই হেসে হেসে সে বলল, কাল রাতটা তাহলে বেশ মজাতেই কাটিয়েছ।
বলছ!
লতিকা কী উত্তর দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই পার্সোনাল ডিপার্টমেন্ট থেকে রীতেশ আমার চেম্বারে এল। জিগ্যেস করলাম, কী ব্যাপার?
রীতেশ বলল, দাদা, বাইরের এটা লাইন আছে। এক ভদ্রলোক আমাদের হেল্প চান। কিন্তু তার কিছু কন্ডিসান আছে। কী উত্তর দেব, বুঝতে পারছি না। লাইনটা আপনি ধরবেন?
দাও।
রীতেশ ফিরে গিয়ে আমাকে কানেকসান দিয়ে দিল। ফোনটা কানে লাগিয়ে বললাম, কে বলছেন?
ওধার থেকে ভারী মোটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, আমার নাম মণিমোহন মল্লিক আপনাদের ওপর আমার কিছু ব্যক্তিগত কাজের দায়িত্ব দিতে চাই।
ধন্যবাদ স্যার। বলুন আমাদের কী করতে হবে।
কাজটা গোপনীয়; খুব সাবধানে করতে হবে। আপনাদের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারি কি?
পার্সোনাল ডিপার্টমেন্টে ফোন করে লোকে প্রথমে এই প্রশ্নটাই করে থাকে এবং এক্ষেত্রে আমরা যা-যা বলে থাকি অর্থাৎ গোপনীয়তা রক্ষা করাই আমাদের প্রফেসানের একমাত্র ক্যাপিটাল–ঠিক তাই বললাম।
মণিমোহন মল্লিক বললেন, ভেরি গুড। আমি ঠিক এরকমটাই চাইছিলাম। যাই হোক কাজটার জন্যে আপনার কী রকম রেমুনারেসন নেবেন?
কাজটা কী, না জেনে কী করে বলি–
তা অবশ্য ঠিক। আপনি এক কাজ করুন, আমার এখানে চলে আসুন। ফোনে তো সব কথা হয় না। সামনা-সামনি বসে কাজের ব্যাপারটা আলোচনা করে নেওয়া যাবে, সেই সঙ্গে রেমুনারেসনটাও।
কিন্তু আমরা তো কোথাও যাই না মিস্টার মল্লিক। ক্লায়েন্টনরা আমাদের অফিসে এসেই তাদের কাজ-টাজ বুঝিয়ে দিয়ে যান।
আমার যেতে কোনও আপত্তি ছিল না। কিন্তু কাল থেকে ব্লাড প্রেসারটা গোলমাল করছে। ডাক্তার কদিনের রেস্ট নিতে বলেছে। প্লিজ চলে আসুন
যাওয়াটা ঠিক হবে কি না, বুঝতে পারছি না। কারণ আমাদের যা প্রফেসান তাতে প্রতি মুহূর্তে ফাঁদে পড়ার ভয়। আমি আবার বললাম, কিন্তু
কিন্তু-টিন্তু নয়, আমি আপনাকে আধ ঘণ্টার মধ্যে এক্সপেক্ট করে রইলাম। আমার ঠিকানা পার্ক অ্যাভেনিউতে-মণিমোহন তাদরে রাস্তার একটা নম্বর বললেন এবং সেইসঙ্গে তাঁর সুইট নম্বরটাও।
হে মহান জনগণ, মহা ঝামেলায় পড়া গেল দেখছি। একটু চুপ করে থেকে বললাম, কোনওভাবেই কি ফোনে আপনার কাজের বিষয়টা বুঝিয়ে দিতে পারেন না?
না। কারণ আপনাকে কিছু মেটিরিয়াল দিতে হবে। সেগুলো হাতে না পেলে কিছুতেই কাজটা শুরু করতে পারবেন না। প্লিজ আর না বলবেন না; আমি ধরেই নিলাম আপনি আসছেন। মণিমোহন লাইনটা কেটে দিলেন।
টেলিফোন নামিয়ে রেখে লতিকার দিকে ফিরতেই দেখি উৎসুকভাবে সে তাকিয়ে আছে। বলল, কী ব্যাপার?
মণিমোহনের কথা বলে জিগ্যেস করলাম, কী করা যায় বলো তো। যাব?
আমি কিছু বুঝতে পারছি না। যা করবার ভেবে-চিন্তে করবে।
খানিকটা সময় দারুণ এক অস্থিরতার মধ্যে কেটে গেল। তারপর কখন যে আমাদের অফিস থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি ধরেছি, আর কখন পার্ক অ্যাভেনিউতে চলে এসেছি, মনে নেই।
মণিমোহনের দেওয়া নম্বরটা খুঁজে বার করতে বেশি সময় লাগল না। এটা একটা নতুন মাল্টি-স্টোরিড অ্যাপার্টমেন্ট হাউস। ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে লিফটে করে টেন্থ ফ্লোরের নির্দিষ্ট স্যুইটের সামনে এসে কলিংবেল টিপলাম। সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে ভেসে এল, দরজা ভেজানো আছে; ঠেললেই খুলে যাবে। চেনা গলা। কিছুক্ষণ আগে টেলিফোনে এই কণ্ঠস্বরটিই আমি শুনেছি। দরজা ঠেলে ভেতের ঢুকতেই সেই মণিমোহনের গলা আবার শোনা গেল, কাইন্ডলি সামনের প্যাসেজটা দিয়ে রাইট টার্ন নিন, তারপর লেট, দেন এগেন রাইট–তারপর যে ঘরটা পাবেন সেখানকার পর্দা সরালেই আমাকে দেখতে পাবেন।
