রুক্ষ কর্কশ গলায় অস্বাভাবিক জোর দিয়ে মনোবীণা বললেন, ইউ মাস্ট পে। তোমার সঙ্গে সেই রকম কন্ডিসানই আছে।
আরক্ত চোখে স্ত্রীকে একবারে দেখে নিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে বাড়ির ভেতর চলে গেলেন অরিন্দম।
হে মহান জনগণ, ততক্ষণে আমি বুঝে ফেলেছি মনোবীণা আর অরিন্দমের সম্পর্কটা দারুণ খারাপ। দুজনের মাঝখানে ঘৃণা-টুণা ছাড়া আর কোনও বস্তু নেই। বিবাহিত নারী-পুরুষ সম্বন্ধে আমার বলার কোনও রাইট নেই; এ বিষয়ে আমি খুবই আনাড়ি এবং অনভিজ্ঞ। তবু এটা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন ঘৃণা অবিশ্বাস ইত্যাদির ওপর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
মনোবীণা সান্যাল বললেন, ডোরাকে কোথায় পেলেন?
আমার মনে পড়ল শমিতার ডাকনাম ডোরা। লক্ষ্য করলাম মনোবীণার কণ্ঠস্বরে একটু আগের সেই উত্তেজনা বা রুক্ষতা নেই। বেশ স্বাভাবিক ভাবেই তিনি আমার সঙ্গে কথা বলছেন। যাই হোক শমিতাকে কোথায় পেয়েছি জানালাম।
মনোবীণা জিগ্যেস করলেন, কী রকম মনে হচ্ছে?
বললাম, আজই তো শুরু করলাম। তবে আমি আশাবাদী।
ধন্যবাদ। মনোবীণা আর দাঁড়ালেন না; আস্তে আস্তে হেঁটে বাড়ির ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
এ বাড়ির তিনটি মানুষ–স্বামী, স্ত্রী এবং মেয়ে–তিনজনেই মধ্যরাতে মদ্যপান করে ফেরে। এদের ফ্যামিলি প্যাটার্নটা কেমন? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড ভাবতে চেষ্টা করলাম। তারপর গেটের বাইরে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে চলে গেলাম।
এখন আমার ঘড়িতে রাত দেড়টা। হঠাৎ খেয়াল হল চার পেগ হুইস্কি ছাড়া কিছুই পাকস্থলীতে পড়েনি। এত রাতে দোকান-পাট, হোটেল-রেস্তোরাঁ সব বন্ধ হয়ে গেছে। ওদিকে চার্লিকে রান্না-বান্না করতে বারণ করে দিয়েছি। তার মানে আজকের রাতটা উপোষ দিয়েই কাটাতে হবে। হে মহান জনগণ, এ জন্যে আমার দুঃখ নেই। আপাতত সবচাইতে যা বেশি দরকার তা হল একটা ট্যাক্সি। ওটা না পেলে, এত রাত্রে যখন বাস-ট্রাম-মিনিবাস সবই বন্ধ হয়ে গেছে তখন খালি পেটে এন্টালি পর্যন্ত হেঁটে যেতে হবে।
মিনিট তিন-চারেক হাঁটবার পর একটা ট্যাক্সি পেয়েও গেলাম।
.
এন্টালিতে আমার তেতলার সেই ছাদে পৌঁছে দেখলাম চার্লি ঘুমোয়নি। বিছানায় বসে বিড়ি ফুকছে। আমি ঢুকতেই বলল, ডিউটি শেষ হল?
বললাম, আজকের মতো।
খাওয়া হয়েছে?
না। খাবার চান্স পাইনি। বলেই তোয়ালে-ফোয়ালে নিয়ে বাথরুমে চলে গেলাম। দশ বারো মিনিট বাদে ফিরে এসে দেখি আমার বিছানার একধারে ছোট টেবলের ওপর প্লেটে করে রুটি আর মাংস সাজানো রয়েছে। এ নিশ্চয়ই চার্লির কাজ। অবাক এবং খুশি হয়ে বললাম, এ সব পেলে কোথায়? রাঁধার কথা তো ছিল না।
চার্লি বলল, তোমার জন্যে কিনে এনে রেখেছি লর্ড। জানতাম যে পাল্লায় পড়েছ আজ আর খাওয়া-টাওয়া জুটবে না।
থ্যাঙ্ক ইউ চার্লি, থ্যাঙ্ক ইউ–আমি রুটি-মাংসের প্লেটটার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম।
.
০৮.
সকালে উঠে আগের দিনের মতোই চার্লিকে পঞ্চাশটা টাকা দিয়ে শমিতার ওপর নজর রাখবার জন্যে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে পাঠিয়ে দিলাম এবং তার গতিবিধি লক্ষ্য করে দশটার পর অফিসে ফোন করতে বললাম।
চার্লি চলে গেলে খবরের কাগজের হেডলাইনগুলো দ্রুত একবার দেখে শেভ-টেভ করে নিলাম। হে মহান জনগণ, গোটা খবর কাগজটা আমার পড়তে ইচ্ছা করে না; আসলে অত ধৈর্যই নেই। মোটামুটি দু-চারটে নিউজ যা আমার প্রফেসানে কাজে লাগতে পারে জানতে পারলেই আমি খুশি। যাই হোক তারপর স্নান-টান সেরে চাবির রিং ঘোরাতে ঘোরাতে নীচে নামতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়ল তেতলার ল্যান্ডিং-এর কাছে ডরোথি দাঁড়িয়ে আছে। তক্ষুনি আমি ঘুরে দাঁড়লাম; ওর পাল্লায় পড়লে আর দেখতে হবে না; এই দিনের বেলাতেই এমন সব কাণ্ড করে বসবে যাতে আমার একটা বড় রকমের হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু কপালটা খারাপ; ডরোথি আমাকে ঠিক দেখে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে সে চেঁচিয়ে উঠল, হেয় রাজীব। তারপরেই একসঙ্গে দু-তিনটে করে সিঁড়ি টপকে টপকে আমার কাছে চলে এল। অগত্যা আমাকে দাঁড়াতেই হল। মনে মনে ভাবলাম আজ আমার বারোটা বাজল।
ডরোথি একটা দারুণ ভলাপচুয়াস সেক্সি মেয়ে। সে বলল, এ কী, আমাকে দেখে তুমি পালাচ্ছ যে!
থতমত খেয়ে বললাম, না না, পালাব কেন?
পালাচ্ছ আর বলছ পালাব কেন?
বিশ্বাস করো, তোমাকে আমি দেখতে পাইনি।
ডরোথি বলল, ঠিক আছে, বিশ্বাস করলাম। একটু থেমে বলল, অনেকদিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হল। যখনই ছাদে যাই দেখি তোমার ঘরের তালা বন্ধ। খুব বিজি নাকি?
এক্সট্রিমলি–আমি তৎক্ষণাৎ ঘাড় কাত করলাম।
গুড লাক। তোমাকে পেয়ে ভালোই হল। অফিস থেকে আজ ক্যাজুয়াল লিভ নিয়েছি। হোল ডে তোমাকে আর ছাড়ছি না ডার্লিং
আমার গলা শুকিয়ে আসছিল। বললাম, ডরোথি, আমার একটা খুব জরুরি কাজ আছে। সেটা করতেই হবে।
ডরোথি আমার কাঁধে একটা হাত তুলে দিল। টের পাচ্ছি তার বুকের তীক্ষ্ণ ছুঁচলো অংশটা ছুরির ফলার মতো আমার হৃৎপিণ্ডে ঢুকে যাচ্ছে।
ঘাড় বাঁকিয়ে চোখের তারা নাচাতে নাচাতে সে বলল, কোনও কথাই শুনছি না। তোমাকে নিয়ে আজ হোল ডে প্রোগ্রাম করব।
ডরোথির হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্যে বললাম, এক কাজ করো; প্লিজ এখন আমাকে ছেড়ে দাও। সাড়ে তিনটের সময় চৌরঙ্গীর ইন্ডিয়ান কাফেতে ফার্স্ট কেবিনটার ওয়েট কোরো; ওখানে তোমার সঙ্গে মিট করব।
