আমিও হাসলাম। হাসতে হাসতেই দ্রুত একবার শিরিনকে চোখ মেরে এগিয়ে গেলাম। তারপর পার্কিং জোন থেকে শমিতার গাড়িটা বার করে চৌরঙ্গীতে চলে এলাম। এখন আমিই ড্রাইভ করে নিয়ে যাচ্ছি। আর শমিতা আমার পাশে লক করা দরজায় হেলান দিয়ে পড়ে আছে। তার মাথাটা সামনের দিকে আলগা হয়ে ঝুলছে যেন।
বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে শমিতাদের বাড়ির সামনে এসে হর্ন বাজাতেই নেপালি দারোয়ান গেট খুলে দিল। গাড়িটা ভেতরে নিয়ে গিয়ে বাঁদিকের লন আর ডানদিকের টেনিস কোর্টের মাঝামাঝি নুড়ির রাস্তাটায় পার্ক করলাম।
দারোয়ানটা গেট বন্ধ করে ছুটতে ছুটতে গাড়ির কাছে চলে এল। তাকে চিনতে পারলাম। কেননা কাল যখন মনোবীণা সান্যালের সঙ্গে দেখা করতে এসছিলাম সে-ই গেট খুলে দিয়েছিল। দারোয়ানটা বোধহয় আমাকে চিনতে পারেনি। চাপা মঙ্গোলিয়ান চোখে একপলক আমাকে দেখে নিয়ে সে বলল, আজ ভি এক নয়া আদমি–
আমি উত্তর দেবার আগে দারোয়ানটা আপন মনে বিড় বিড় করে বলে উঠল, হর রোজ রাতমে এক এক নয়া আদমি ছোটা মেমসবকে লেকে আতা।
ছোট মেমসাব নিশ্চয়ই শমিতা। বুঝতে পারছি নেশায় চুরচুর শমিতাকে প্রতি রাত্রে নতুন নতুন লোক এখানে পৌঁছে দিয়ে যায়। যাই হোক, শমিতার মা মনোবীণা সান্যালের কথা আমার মনে পড়ে গেল। এখানে যখন এসেই পড়েছি মনোবীণার সঙ্গে একবার দেখা করা যেতে পারে। ভদ্রমহিলা তাতে বুঝতে পারবেন ওঁর কাজটা সত্যি সত্যি শুরু করে দিয়েছি। দারোয়ানটাকে জিগ্যেস করলাম, বড়া মেমসাব কোঠিমে হ্যায়?
দারোয়ানটা বলল, বড়া মেমসাব, সাব কোই নেহি হ্যায়, পার্টিমে গিয়া
কখন ফিরবেন? হিন্দিতেই জিগ্যেস করলাম।
মালুম নেহি। দারোয়ানটা ডাইনে-বাঁয়ে দুধারের মাথা নাড়ল।
এবার শমিতাকে দেখিয়ে বললাম, তাহলে একে
দারোয়ানটা আমার ইঙ্গিত বুঝতে পারল। সে বুঝিয়ে দিল দুশ্চিন্তার কিছু নেই; রোজ রাতেই শমিতা এই রকম বেহুশ অবস্থায় ফেরে; বাড়িতে বেশির ভাগ দিনই সাহেব বা মেমসাহেব থাকেন না; তাকেই ছোটা মেমহেবকে গাড়ি থেকে নামিয়ে তার ঘরে রেখে আসতে হয়। তবে একা তার পক্ষে এত বড় জোয়ান আওরতকে নামিয়ে তেতলায় টেনে তোলা খুবই কষ্টকর। তাই যারা শমিতাকে নিয়ে আসে সে তাদের সাহায্য চায়। তার আশা নতুন সাব অর্থাৎ আমিও মেহেরবানী করে সহায়তা করব।
বললাম, জরুর–
দুজনে ধরাধরি করে শমিতাকে তার ঘরে শুইয়ে যখন আবার নীচে লনের কাছে চলে এসেছি। সেই সময় গেটের বাইরে হর্নের শব্দ শোনা গেল। দারোয়ানটা দৌড়ে গিয়ে গেট খুলে দিতেই একটা প্রকাণ্ড ঝকঝকে ইমপোর্টেড গাড়ি ভেতরে ঢুকে টেনিস কোর্টের ওধারে পার্ক করল।
এখানে নুড়ির রাস্তায়, টেনিস কোর্টে, সবুজ লনে–মানে চারদিকেই সুদৃশ্য পোস্টের মাথায় মার্কারি ল্যাম্প জ্বলছে। সবকিছুই সূর্যালোকের মতো উজ্জ্বল। আমি দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম। চোখে পড়ল দরজা খুলে মনোবীণা সান্যাল আর অরিন্দম সান্যাল গাড়ি থেকে নামছেন। অর্থাৎ পার্টি থেকে ফিরে এলেন। অরিন্দমের গায়ে নিখুঁত ডিনার স্যুট। তার পাশে মনোবীণাকে একটা রঙিন প্রজাপতির মতো দেখাচ্ছিল। ভদ্রমহিলা আজ দারুণ সেজেছেন।
একটু পরে ওঁরা আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে গেলেন। কেননা আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখানে দিয়েই ওঁদের বাড়ির দিকে যেতে হবে।
অরিন্দম এবং মনোবীণা দুজনকেই বেশ টিপসি দেখাচ্ছে। দুজনেরই চোখ ফোলা ফোলা এবং ঈষৎ আরক্ত। দুজনেই অল্প অল্প টলছিলেন। অর্থাৎ হে মহান জনগণ, এঁরা যুগলে পার্টি থেকে ভালোরকম নেশাটি করে এসেছেন।
দারোয়ান আমাকে চিনতে পারেনি, কিন্তু অরিন্দম পারলেন। নেশা-জড়ানো লাচে চোখে তাকিয়ে থেকে বললেন, সেই ইনটেরিয়র ডেকরেটর না?
নার্ভগুলোকে বেশ স্টেডি রেখেই বললাম, আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার–
এত রাত্রে কী মনে করে? ইনটেরিয়রের কিছু খোঁজখবর নিতে নাকি?
দারোয়ানটা কখন যেন পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। আমি উত্তর দেবার আগেই সে জানিয়ে দিল, এ সাব ছোটা মেমসাবকো লেকে আয়া
ও, আচ্ছা। তাহলে পরোপকারের জন্যে আসা। ভেরি গুড-অরিন্দম সান্যাল আমার মুখের কাছে মুখ এনে জিগ্যেস করলেন, ওয়াজ শি ড্রাংক?
কী উত্তর দিলে ভদ্রলোক খুশি হবেন বুঝতে না পেরে চোখের কোণ দিয়ে দ্রুত মনোবীণার দিকে তাকালাম। মনোবীণা আমার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। চোখাচোখি হতেই তিনি চোখ টিপলেন। অর্থাৎ যা সত্যি তাই যেন বলি। বললামও। অরিন্দম এবার স্ত্রীর দিকে ফিরে ভুরু কুঁচকে বিরক্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, প্রতিদিন তোমার মেয়ে ড্রিংক করে একেকটা লোকের ঘাড়ে চেপে বাড়ি ফিরছে। চারদিকে কীরকম স্ক্যান্ডাল রটছে জানো—
মনোবীণা খুব আস্তে আস্তে বললেন, স্ক্যান্ডালাররাও ও-রকম রটায়ই তবে
আমার মেয়ের স্ক্যান্ডাল নিয়ে তো খুব চেঁচাচ্ছ। তোমার স্ক্যান্ডলে যে ক্যালকাটার বাতাস পয়জন্ড হয়ে গেছে–সে খবরটা রাখো কি?
তোমার স্ক্যান্ডালও কম নেই।
তার জন্যে ইউইউ আর রেসপন্সিল।
স্পট ইট।
আমি চুপ করেই থাকি, কিন্তু তুমি আমাকে ঘাঁটিও না।
একটু থতিয়ে রইলেন অরিন্দম। তারপর গলার স্বর সামান্য নামিয়ে বললেন, প্রত্যেক মাসে তোমার মেয়ের জন্যে পাঁচ-ছহাজার টাকা মদের বিল দিতে হয়। আই ওন্ট পে ইট এনি মোর
