রাত সাড়ে আটটার সময় চার্লির শেষ ফোন এল। সে বলল, আর তোমাকে আটকে রাখছি না লর্ড; চলে এসো।
জিগ্যেস করলাম, কোথায় যাব?
চৌরঙ্গীর একটা বড় হোটেলের নাম করে চার্লি বলল, আমি তার তলায় মেইন এনট্রান্সের কাছে ওয়েট করছি; ওখানে এলেই দেখা হবে।
তিনি কোথায়?
হোটেলের ভিতর।
পনেরো-কুড়ি মিনিটের মধ্যে আমি বিশাল হোটেলটার সামনে চলে এলাম। মেইন এনট্রান্সের কাছে চার্লি অপেক্ষা করছিল। ট্যাক্সি থেকে নামতেই সে দৌড়ে এল।
চার্লির চেহারা দেখে মনে হল সারাদিনে তার ওপর দিয়ে একটা টাইফুন বয়ে গেছে। মুখ আরো ভেঙে গেছে; সারাদিন স্নান হয়নি; চুল উস্কোখুস্কো; চোখ লালচে। নেশা না করেও সে প্রায় উলছিল।
বললাম, সকাল থেকে কী করলে ডিটেলে এবার বলো দেখি।
চার্লি যা বলল, সংক্ষেপে এই রকম। সকালে আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে সে সোজা বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে চলে যায়। রাস্তায় ঝাড়া দেড়টা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর সে দেখতে পায় শমিতা একটা ফিয়েট গাড়ি ড্রাইভ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। তখনই একটা ট্যাক্সি ডেকে তাকে ফলো করতে থাকে। তারপর প্রায় গোটা কলকাতা ঘুরে বাইশটা প্রাইভেট ক্লাব, সতেরোটা অ্যাপার্টমেন্ট হাউসে গেছে শমিতা। কিন্তু কোথাও দশ-পনেরো মিনিটের বেশি থাকেনি। তার ওপর চোখ রেখে অত কম সময়ে ফোন করা সম্ভব হয়নি। তা ছাড়া সব জায়গায় টেলিফোন বুথ বা ফোন করার সুবিধা ছিল না। এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে যখনই সময় পাওয়া গেছে তখনই ফোন করে জানিয়েছে চার্লি। আপাতত শমিতা সামনের এই হোটেলটায় ঢুকেছে। চার্লির ধারণা, এখন বেশ কিছুক্ষণ সে এখানে থাকবে।
চার্লির একটা হাত ধরে বললাম, থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ। আমার জন্যে তোমার খুবই কষ্ট হল।
নাথিং। চার্লি মাথা নাড়ল, তোমার জন্যে আমি সব কিছু করতে পারি।
আমি আরেকবার ধন্যবাদ দিয়ে বললাম, অতটা দরকার নেই।
চার্লি বলল, আমার ডিউটি শেষ। তুমি চার্জ বুঝে নাও লর্ড। আমি যাব।
হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। মেয়েটা এই হোটেলের কোথায় আছে জানো?
না। আমার এই চেহারা আর ড্রেস নিয়ে এত বড় হোটেলে ঢুকতে সাহস হয়নি। আমি যা, মানে চোর বলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের হাতে তুলে দেবে। তুমি লর্ড ভেতরে ঢুকে তোমার জিনিসটি ডিসকভার করে নাও।
চার্লি চলে যাচ্ছিল; তাকে থামিয়ে বললাম, সেই পঞ্চাশ টাকা থেকে কিছু বেঁচেছে?
পকেট থেকে এক খামচা রেজগি বার করে দ্রুত গুণে ফেলল চার্লি। তারপর বলল, সেভেন্টি টু পয়সে ওনলি।
এখন সোজা বাড়ি ফিরবে তো?
সিওর, অফুলি টায়ার্ড, এখন গিয়ে শুয়ে পড়তে পারলে বাঁচি।
চার্লিকে পাঁচটা টাকা দিয়ে বললাম, যাবার আগে কোনও হোটেলে-টোটেলে খেয়ে নিও। আর আমার জন্যে কিছু রাঁধতে হবে না।
ছোঁ মেরে আমার হাত থেকে পাঁচ টাকার নোটটা তুলে নিয়ে চুক করে একটু চুমু খেল চার্লি, বলল, থ্যাঙ্ক ইউ লর্ড, থ্যাঙ্ক ইউ। লাইফে কখনও পাঁচ টাকার ডিনার খাইনি। কিন্তু
কী?
এত দামি ডিনার খাব। সেটা জম কতে মেডিসিন লাগবে না?
চার্লির মেডিসিন মানে কালী মার্কা বাংলা মদ। হাসতে হাসতে আরো পাঁচটা টাকা তার হাতে দিয়ে বললাম, আচ্ছা, আমি যাচ্ছি।
চার্লি বলল হা যাও। হোল ডে আমি ডিউটি দিয়েছি; এবার হোল নাইট তুমি ডিউটি লাগাও।
চার্লি চলে গেল। আমি লম্বা লম্বা পা ফেলে হোটেলটায় ঢুকে পড়লাম।
.
০৭.
এই হোটেলে আগেও অনেকবার এসেছি এখানকার সব কিছুই আমার চেনা। তবু মেইন এনট্রান্স থেকে কার্পেট মোড়া লম্বা প্যাসেজের ওপর দিয়ে চিন্তা-গ্রস্তের মতো হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, এই চোদ্দতলা এয়ার কন্ডিশন্ড হোটেলের চারশো সুইট, দশ-বারোটা বার, ক্যাজিনো, সাত-আটটা রেস্তোরাঁ, কফি শপ, সুইমিং পুল, ডিনার ক্লাব, বিউটি পার্লার ইত্যাদি ইত্যাদি মিলিয়ে যে বিশাল ব্যাপার–তার মধ্যে শমিতাকে কোথায় খুঁজব? তা ছাড়া শমিতাকে আগে কখনও দেখিনি; ফোটো দেখে তাকে সনাক্ত করতে হবে।
চওড়া প্যাসেজের দুধারে নানা রকম কিউরিও শপ, শাড়ির দোকান, ইন্ডিয়ান হ্যাঁন্ডিক্র্যাফট আর জুয়েলারির দোকান, অসংখ্য শো-উইন্ডোতে বিভিন্ন এয়ার লাইন্সের বিজ্ঞাপন। আমার দুপাশ দিয়ে বিচিত্র বিচিত্র সাজ-পোশাক পরা পুরুষ এবং মহিলারা ফ্যাসন প্যারেডের মতো ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছে। এদের বেশির ভাগই বিদেশি ট্যুরিস্ট।
আমি দুধারের দোকান-টোকান দেখছিলাম না। তবে চারপাশের মহিলাদের মুখ লক্ষ্য করছিলাম আর মাঝে মাঝে পকেট থেকে শমিতার ফোটোটা বার করে দেখে নিচ্ছিলাম। ভিড়ের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় রিসেপসান কাউন্টারের কাছে চলে এসেছিলাম। হঠাৎ একটি মেয়ের গলা কানে এল, আমার নাম ধরেই ডাকছে।
ঘাড় ফেরাতেই রিশেপসান কাউন্টারে শিরিনকে দেখতে পেলাম। শিরিন—পুরো নাম শিরিন মার্চেন্ট, বয়স সাতাশ-আটাশ, ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিক্স ৩৬-২৫-৩৬ (এটা আমার অনুমান), জাতে পারসি, নিশ্বাস বন্ধ করে দেবার মতো সুন্দরী–এই হোটেলের সে একজন রিসেপসনিস্ট। অনেকবার আসার ফলে ওর সঙ্গে আলাপ হয়ে গেছে।
পায়ে পায়ে শিরিনের কাছে চলে এলাম। হঠাৎ মনে হল, এই মেয়েটা শমিতার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করতে পারে।
শিরিন বলল, গুড ইভনিং মিস্টার সরকার। বলে দারুণ মিষ্টি করে হাসল।
