ফাইন। আর ডেটেকটিভ কনসার্ন?
দুজন এসেছিল। এক হাজার টাকা অ্যাডভান্স পেয়েছি। আর পার্সোনালে তিনজন আড়াই হাজার অ্যাডভান্স দিয়েছে।
ফার্স্ট ক্লাস।
আমাদের কথার মধ্যে এইড-ইলেকসান কর্পোরেশন থেকে সমরেশের ফোন এল। আমাকে তার ঘরে যেতে বলছে।
টেলিফোন নামিয়ে রেখে এইড-ইলেকসান কর্পোরেশনের পিছন দিকের দেয়ালে যে কাঁচ বসানো আছে সেটা দিয়ে দেখলাম একটা লোক সমরেশের মুখোমুখি বসে আছে। খুব সম্ভব তাকে ম্যানেজ করতে পারছে না সমরেশ। লতিকার দিকে ফিরে বললাম, যাই, নতুন ক্লায়েন্টের সঙ্গে কথাবার্তা বলে আসি।
এইড-ইলেকসানের ঘরে এসে দেখলাম, সমরেশের সামনে যে বসে আছে তার বয়স পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্ন, জিরাফের মতো গলা, মাথার মাঝখান দিয়ে সিঁথি, মুখটা বোতলের মতো লম্বা, কপালে গালে বসন্তর দাগ, পরনে ফিনফিনে ধুতি আর সিল্কের পাঞ্জাবি, হীরের বোম, হীরের আংটি, চকচকে পাম্প–
লোকটার সঙ্গে কথাবার্তা বলে জানা গেল তার নাম ভগবতী চরণ পোদ্দার। ইলেকসানে কনটেস্ট করতে চায়। তার বায়োডাটা প্রভৃতি টুকে নিয়ে আড়াই হাজার টাকা অ্যাডভান্স নিলাম।
বিদায় নেবার মুখে ভগবতী পোদ্দার জানাল, তার কনস্টিটিউয়েন্সি হুগলী জেলার এক ইন্ডাস্ট্রিয়াল টাউনে এবং তার সবচাইতে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম হীরাচন্দ আগরওয়াল।
আমার দারুণ মজা লাগল। কালই ময়দার বস্তার মতো বিশাল শরীরের মালিক হীরাচন্দ এসেছিল। আজ এসেছে তারই রাইভ্যাল অস্বাভাবিক লম্বা আর রোগা ভগবতী পোদ্দার।
ভগবতী বলল, ও হীরাচন্দ শালেকে এমন হারান হারাতে হবে যে শালে গিধর একেবারে শুয়ে পড়ে।
বললাম, চিন্তা করবেন না ভগবতীবাবু, শালাকে একেবারে শুইয়েই দেব।
পরে আপনাকে হীরাচন্দের অনেক স্ক্যান্ডাল সাপ্লাই করব। সেগুলোকে কীভাবে কাজ লাগানো যায়, দেখবেন।
নিশ্চয়ই দেখব, স্ক্যান্ডাল খুব কাজে লাগবে। আচ্ছা নমস্কার।
নমস্কার। ভগবতী চলে গেল। আমার পাকস্থলীতে দারুণ একটা হাসি বগবগিয়ে উঠছিল। এতক্ষণে সেটা তোড়ে বেরিয়ে এল। আমার দেখাদেখি সমরেশও হাসছিল। হাসতে হাসতে আমি চেম্বারে ফিরে এলাম।
.
০৬.
ভগবতী চলে যাবার পর তেমন কোনও ঘটনা আর রইল না। ঘণ্টায় একবার করে চা খেতে লাগলাম। সেই সঙ্গে লতিকার সঙ্গে এলোমেলো গল্পও চলছে। এইড-ইলেকসানে আজ যে-রকম অ্যাডভান্স পাওয়া গেছে সেই রকম দিন পনেরো-কুড়ি যদি পাওয়া যায় তাহলেই ওটার গণেশ উল্টে দেওয়া যেতে পারে। তখন ওখানে কী বিজনেস ফাঁদা যাবে তারই নানারকম পরিকল্পনা করতে লাগলাম। কিন্তু কোনওটাই মনে ধরল না। ঠিক করলাম পরে এ সম্বন্ধে ভালো করে ভাবা যাবে।
লতিকার সঙ্গে কথা বলছিলাম ঠিকই কিন্তু আমার কান ছিল টেলিফোনের দিকে। সেই সকালে চার্লি বেরিয়েছে। এখন সাড়ে চারটে বাজতে চলল অথচ তার কোনও পাত্তাই নেই। একটা ফোন করেও সে শমিতার ব্যাপারটা জানাতে পারত। কোনও কারণে তার সঙ্গে দেখা না হলে কিংবা অন্য কোনও ঝামেলা হলে, সেই খবরটা দিতে কী অসুবিধা ছিল? চার্লির ওপর ক্রমশ আমি বিরক্ত হয়ে উঠতে লাগলাম। ঝাড়া সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা সময় আমি তার আশায় বসে আছি। এভাবে কারোকে ঝুলিয়ে রাখার মানে হয়? ওকে না পাঠিয়ে আমি গেলেই বোধহয় ভালো হত।
হে মহান জনগণ, আরো এক ঘণ্টা পর চার্লির আশা যখন পুরোপুরিই ছেড়ে দিয়েছি তখন তার ফোন এল।
বললাম, কী ব্যাপার চার্লি, কখন তোমার ফোন করার কথা ছিল?
ওধার থেকে চার্লির গলায় ভেসে এল, ফোন করার চান্স পেলে তো করব! পাঁচ ঘণ্টা পর এই তো ফাস্ট চান্স পেলাম। ওহ গড, এ তুমি কার পেছনে আমাকে লাগিয়েছ!
কেন, সে কী করেছে?
কী আর, হোল ক্যালকাটা চরকির মতো আমাকে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। অলরেডি সাঁইত্রিশ টাকা ট্যাক্সি ফেয়ার দিয়ে ফেলেছি।
তাই নাকি!
ইয়েস লর্ড। এর মধ্যে লাঞ্চ করারও চান্স পাইনি। এর ফাঁকে রাস্তা থেকে দুটো চারশো গ্রামের পাঁউরুটি কিনে নিয়েছিলাম। তোমার এলিজাবেথ টেলরের পেছন ছুটতে ছুটতে ওনলি সে দুটো খেয়েছি।
আমি শব্দ করে হাসলুম, তাহলে বলো বেশ ভালোই এক্সপিরিয়েন্স হচ্ছে।
তা হচ্ছে–চার্লি বলতে লাগল, আর সেই এক্সপিরিয়েন্সের ঠ্যালায় আমার ফ্লেশ আর বোন লুজ হয়ে যাচ্ছে।
তুমি এখন কোথায়?
আলিপুরের এক পেট্রোল পাম্পে। সেখান থেকে ফোন করতে করতে রাস্তার উল্টোদিকের ক্লাবটার ওপর ওয়াচ রাখছি।
ওয়াচ রাখছ! কেন?
তোমার এলিজাবেথ টেলর ওখানে ঢুকেছেন যে। বলতে বলতেই চার্লি ব্যস্ত হয়ে উঠল, তিনি বেরিয়ে পড়েছেন। এখন লাইন ডিসকানেক্ট করে দিচ্ছি। তুমি অফিসেই থেকো, আমি আবার ফোন করব।
আমি কিছু বলবার আগেই লাইন কেটে গেল। চার্লি মহা ঝামেলায় ফেলে দিল তো; কতক্ষণ এখানে বসে থাকতে হবে কে জানে।
সাড়ে পাঁচটা বাজবার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের তিনটে কনসানেই ছুটি হয়ে গিয়েছিল। সমরেশ, রীতেশ-টীতেশরা চলে গেছে। শুধু লতিকা আর আমিই আছি। লতিকাকে বললাম, আমার বেরুতে দেরি হবে। চার্লিকে একটা কাজে পাঠিয়েছে। ও আমাকে ফোন করে ওয়েট করতে বলল। তুমি বসে থেকে কী করবে; বাড়ি চলে যাও।
লতিকা এক পলক আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর একটা কথাও না বলে চলে গেল।
লতিকা চলে যাবার পর দুঘণ্টায় আরো বার দুই ফোন করল চার্লি। একবার ডায়মণ্ড হারবার রোড থেকে, আরেকবার টালিগঞ্জ থেকে। দুবারই আরো কিছুক্ষণ আমাকে অপেক্ষা করতে বলে লাইন কেটে দিয়েছে। আমার নাকে বঁড়শি আটকানো। না পারছি এখান থেকে বেরুতে, না ভালো লাগছে এখানে বসে থাকতে। দমবন্ধ মানুষের মতো আমি চেম্বারে আটকে আছি।
