রাত বারোটায় আমাদের এই এন্টালিতেই একটা গলিতে ঢুকলাম। মনে হল কেউ জেগে নেই। সামনের একটা তেতলা বাড়ির তিনতলার বারান্দায় দেখলাম একটা ওয়াল-ক্লক রয়েছে। ওটা সরাবার জন্যে রেন-ওয়াটার পাইপ বেয়ে যেই উঠতে যাব অমনি একটা ট্যাক্সির হেডলাইট এসে পড়ল আমার ওপর। সঙ্গে সঙ্গে ট্যাক্সিটা থেমে গেল আর দরজা খুলে এক বাবু বেরিয়ে এল। মাল খেয়ে বাবুটি চুর হয়ে আছে। টলতে টলতে আমার কাছে এসে সে বলল, এই ব্যাটা, তুই নির্ঘাত চোর। আমি ভীষণ নার্ভাস হয়ে গেলাম। বুঝলাম কট যখন হয়েই গেছি তখন স্বীকার করাই ভালো। বললাম, স্রেফ পেটের দায়ে এই প্রফেসানটা নিতে হয়েছে স্যার। আর কখনো চুরি করব না। দারুণ টলছিল লোকটা। সেই অবস্থায় আমাকে দেখতে দেখতে বলল, তুই বুঝি এ পাড়ায় আজই প্রথম চুরি করতে এসেছিস? ভয়ে ভয়ে বললাম, হ্যাঁ স্যার। বাবুটি বলল, তাই জানিস না, রাত বারোটায় এ পাড়ায় কোনও চোর ঢোকে না। কারণ এ-সময় আমি মানে নিশিকান্ত সেনগুপ্ত মলে খেয়ে ফিরি। তা তোর নাম কী বল? বললাম, চার্লি। বাবুটি বেশ ফানি। বলল, চার্লি চ্যাপলিন নাকি? বললাম, না চার্লি হেণ্ডারসন। বাবুটি বলল, তার মানে খ্রিশ্চান! তোকে পেয়ে খুব ভালো হল। কদিন ধরেই বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টের ব্যাপারটা বুঝবার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল। বুঝিয়ে দে তো ব্যাপারটা। লাইফে কোনওদিন চার্চে যাইনি, বাইবেল চোখে দেখিনি। আমার গা দিয়ে ঘাম ছুটল। বললাম, আমাকে ছেড়ে দিন স্যার, আর কক্ষনো এখানে আসব না। বাবুটি ঢুলুঢুলু চোখে আমাকে দেখতে দেখতে হঠাৎ ঘাড়ে এক রদ্দা কষিয়ে বলল, যাও শালা, গেট আউট–। আমি এক দৌড়ে গলিটা ক্রস করে ট্রাম রাস্তায় চলে এলাম।
চার্লির কথা শুনতে শুনতে দারুণ মজা লাগছিল। হাসতে হাসতে বললাম, দারুণ এক্সপিরিয়েন্স তো
চার্লি বলল, সবটা আগে শুনে নাও
এখনও বাকি আছে নাকি?
ইয়েস লর্ড। বলে চার্লি আবার শুরু করল, গলি থেকে বেরিয়ে এলেও ব্লাডি ঘড়িটা আমার মাথায় আটকে ছিল। এদিক ওদিক ঘুরে রাত দুটোয় আবার ওখানে গেলাম। রেন-ওয়াটার পাইপে উঠতে গিয়ে এবার সান অফ এ বিচ একটা প্রাইভেট কারের হেডলাইট এসে পড়ল আমার ওপর। গাড়ি থামিয়ে ঢ্যাঙা ল্যাস্কি চেহারার আরেক মাতাল নেমে এল। আমার ঘাড়ে আস্তে টোকা মেরে বলল, তোর সাহস তো কম না! রাত দুটোয় আমি এই ভূতনাথ চাকলাদার নেশা করে ফিরি, আর তুই কিনা এ সময় চুরি করতে ঢুকেছিস! নাম বল-ভয়ে ভয়ে নামটা বললাম। চাকলাদার সাহেব জিগ্যেস করল, তুই ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল? ইয়েস স্যার, আমার জন্ম-কর্ম সব এখানে। চাকলাদার বলল, ভেরি গুড! এবার ন্যাশনাল অ্যানথেম মানে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতটা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মুখস্থ বলে যা তো দেখি। আরেকবার আমার ঘাম ছুটল। দু-চারটে লাইন বলবার পর সব গোলমাল হয়ে গেল। চাকলাদার সাহেব ভয়ানক রেগে গেলেন, শালা, ভারতীয় নাগরিক হয়ে তুমি জাতীয় সঙ্গীত পুরো বলতে পারছ না! অ্যাবাউট টার্ন-ভয়ে ভয়ে আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। চাকলাদার সাহেব তখন তার লম্বা পা দিয়ে আমার পাছায় টেনে একটি কিক হাঁকালেন। আমি উড়ে গলির মুখে সে পড়লাম।
শুনে হাসতে হাসতে আমার দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। বললাম, চার্লি, আমি মরে যাব। আই শ্যাল ডাই সিম্পলি। |||||
||||| চার্লি বলল, শেষটুকু শুনে নাও। তারপর মরো। চাকলাদারের লাথি খেয়ে তো পালিয়ে এলাম। কিন্তু ঘড়িটাকে কিছুতেই মাথার ভেতর থেকে আউট করে দিতে পারছিলাম না। সাড়ে চারটের সময় গুটি গুটি আবার গলিতে ঢুকলাম। রেন-ওয়াটার পাইপ বেয়ে থার্ড টাইম উঠতে যাব, ঠুং টুং করে রিশার শব্দ কানে এল। কিছু বুঝবার আগেই রিকশা থেকে কে যেন আমার ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ল। দেখলাম ছাই-টাই মাখা এক ইয়োগী (যোগী) চোখ দুটো তার টেরিফিক রেড। আমার গলাটা চেপে ধরে সে বলল, পাপী, জানিস না, আমি ভীমভৈরব অবধূত এ সময় শ্মশান থেকে মহাদেবের প্রসাদ চড়িয়ে ফিরি! বললাম, সাধু মহারাজ, আমি আর কখনও এখানে আসব না। ইয়োগী বলল, না, আসবি না। এসে সুবিধে হবে না। এ পাড়ায় রাত বারোটায় মাল খেয়ে নিশিকান্ত ফেরে, ভূতনাথ ফেরে রাত দুটোয়, আর আমি ফিরি সাড়ে চারটেয়। সারা রাতে ফঁকটা কোথায় যে চুরি করতে ঢুকবি! বলেই রিকশা থেকে একটা ত্রিশূল নামিয়ে তার বাঁটটা দিয়ে কোমরে মারলে এক খোঁচা, আমি ছিটকে আবার গলির বাইরে এসে পড়লাম। বলে একটু থামল চার্লি। পরক্ষণে আবার শুরু করল, তুমিই বলো লর্ড, এরপর আর এই প্রফেসান কি চালানো যায়? ভাবছি এটা ছেড়ে দিয়ে অন্য কিছু করব। উইল ডু সামথিং এ
পাদ্রি বাবা হয়ে যাবে নাকি?
চার্লি আবার কী বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই আচমকা মনোবীণা সান্যাল আর শমিতার মুখ আবার আমার মনে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে মাথায় একটা প্ল্যান এসে গেল। চার্লিকে সেই প্ল্যানটায় লাগিয়ে দেওয়া যায়। বললাম, তোমাকে একটা কাজ দিতে পারি চার্লি। করবে?
চার্লি বলল, জেন্টলম্যানের কাজ দিলে কিন্তু পারব না লর্ড।
আমাকে কি জেন্টলম্যান মনে হয় যে তোমাকে ভদ্রলোকের কাজ দেব!
তা হলে কী করতে হবে বলে ফেললো।
আমি আমার সেই ব্রিফকেসটা এনে তার থেকে শমিতার ফোটো বার করে বললাম, এটা দেখো
