আস্তে আস্তে পাতলা অন্ধকার কেটে গিয়ে রোদ দেখা দিল। শুয়ে শুয়েই জানালা দিয়ে নীচের রাস্তায় এখন প্রচুর লোকজন দেখতে পাচ্ছি; অজস্র গাড়ি-টাড়ি চোখে পড়ছে। হঠাৎ আমি ঠিক করে ফেললাম, মনোবীণা সান্যালের মেয়ে শমিতার দায়িত্ব নেব। ডাইনির মতো মন্ত্র পড়ে ওরা যেন আমাকে টানছিল। ব্যাপারটা মনে মনে স্থির করে বিছানা থেকে নামতে গিয়েই চোখে পড়ল মেঝেতে চিটচিটে নোংরা বিছানায় কুকুরে মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে চার্লি। কাল রাত্তিরে আমি ঘুমিয়ে পড়ার পর নারকেল গাছ বেয়ে জানালার শিক সরিয়ে কখন ও ঘরে ঢুকেছে, টের পাইনি।
চার্লির বয়স বাহান্ন-তিপান্ন। লোকটা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান। পোড়া ব্রোঞ্জের মতো গায়ের রঙ। শরীরে মাংসের চাইতে হাড় বেশি। এবড়ো-খেবড়ো লম্বাটে মুখ; চোখ দুটো ইঞ্চিখানেক ভেতরে ঢোকানো; গালে খাপচা খাপচা দাড়ি। তামাটে রঙের পাতলা চুল অযত্নে সব সময় এলোমেলো হয়ে থাকে। পরনে তাল-মারা ঠেটি ট্রাউজার আর চক্কর-বক্কর লাগানো স্পোর্টস গেঞ্জি।
চার্লি আমাদের এই এলাকার নামকরা ছিঁচকে চোর। তবে ওর লোভ কম, হয়তো সাহসও। কোনও জিনিসের দাম পঞ্চাশ টাকার বেশি হলে ও তা ছোঁয় না।
চার্লি জেলখানার পোষা পাখি; ইংরেজিতে যাকে জেল-বার্ড বলে ঠিক তাই। বাহান্ন-তিপন্ন বছরের মধ্যে কম করে ছাব্বিশ-সাতাশ বছর তার জেলেই কেটেছে। আমাদের এই অঞ্চলে ছোটখাটো কিছু চুরি হলে পুলিশ চার্লিকে ধরে হাজতে চালান করে দেয়।
মা বাবা-ভাই-বোন বউ-বাচ্চা, কেউ নেই চার্লির। ওর থাকারও কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই। আমার সঙ্গে দেখা হবার আগে জেলখানার বাইরে যে কটা দিন সে থাকত সে দিন কটা এর-ওর বারান্দায় শুত। ট্রাম রাস্তার ধারে দুটো আস্তাবল আছে। কখনও-সখনও সেখানে গিয়েও পড়ে থাকত।
আমার সঙ্গে চার্লির আলাপ হয়েছিল অদ্ভুত ভাবে। আমাদের এই এলাকার থানায় আগে মাঝে মাঝে আড্ডা দিতে যেতাম। আমার এক বন্ধু সমীর ছিল ওখানে সাব-ইন্সপেক্টার।
সেবার কলকাতায় দারুণ শীত পড়েছে। মাসটা ছিল জানুয়ারি। রাত নটার সময় কফি খেতে খেতে সমীরের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি। হঠাৎ চার্লি এসে হাজির। লম্বা স্যালুট সে সমীরকে বলেছিল, স্যার, বড় বিপদে পড়ে গেছি। প্লিজ সেভ মি। ইংরেজি বাংলা মিলিয়ে কথা বলে সে।
এই থানার সবাই চার্লিকে চেনে। ভুরু কুঁচকে সমীর জিগ্যেস করেছিল, কী ব্যাপার?
চার্লি বলেছিল, স্যার, এবার দারুণ শীত পড়েছে–ট্রিমেণ্ডাস কোল্ড। বাইরে পড়ে থাকতে থাকতে হিমে জমে যাচ্ছি। প্লিজ এই উইন্টারটা আমাকে জেলখানায় পুরে রাখুন। নইলে স্রেফ মরে যাব–আই উইল ডাই।
ভাগ
আমি আপনাদের বাঁধা ক্লায়েন্ট। মরে যাব, এটা কি ভালো হবে। আমার কেসটা কনসিডার করুন।
তুই কি চুরি করেছিস যে জেলে পুরব! খারাপ কাজ না করলে জেলে পোরা যায়?
যাই, তাহলে একটা চুরি-ফুরিই করে আসি। চার্লি চলে গিয়েছিল।
আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম; আবার মজাও লাগছিল খুব। এমন ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার আগে আর কখনও দেখিনি।
যাই হোক, কিছুক্ষণ বাদে সমীরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সার্কুলার রোডের কাছাকাছি আসতেই চার্লির সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গিয়েছিল। আমি নিজে ডেকে ওর সঙ্গে আলাপ করেছিলাম। দারুণ মজার লোক চার্লি। ওর জীবন এবং কথা বলার ভঙ্গি আমাকে প্রচণ্ড আকর্ষণ করেছিল। ফলে রাস্তা থেকে ওকে সোজা আমার ডেরায় নিয়ে এসেছিলাম। হে মহান জনগণ, একটা লোক জেলে যেতে পারবে না বলে শীতে কষ্ট পাবে, তা তো আর হতে পারে না। বিশাল ছাদে দু-দুটো ঘর নিয়ে আমি একা থাকি; এখানে আরেকটা লোকের জায়গা সহজেই হয়ে যেতে পারে। চার্লিকে বলেছিলাম, এখন থেকে তুমি আমার এখানেই থাকবে।
চার্লি গভীর কৃতজ্ঞতায় আমার হাত দুটো চেপে ধরে বলেছিল, ইউ আর মাই সেভিয়র; মাই লর্ড। মনে হচ্ছে তোমার জন্যে এই শীতটা টিকে গেলাম।
সেই থেকে চার্লি আমার কাছেই আছে। মাঝে মাঝে অবশ্য হাওয়া বদলাবার জন্যে জেলে চলে যায়। তখন আমি একাই থাকি। ও আমাকে লর্ড বলে ডাকে।…
…কয়েক পলক ঘুমন্ত চার্লির দিকে তাকিয়ে থেকে আমি বাথরুমে চলে গেলাম। আধ ঘণ্টা পর ফিরে এসে দেখি চার্লির ঘুম ভেঙে গেছে। শুধু তাই না, নিজের তেলচিটে বিছানাটা খাটের তলায় চালান করে ঘর-টর সাফ করে ফেলেছে। তারপর চা বানিয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে।
আমাকে দেখেই চার্লি বলে উঠল, গুড মর্নিং লর্ড
আমিও বললাম, গুড মর্নিং
আমার হাতে একটা চায়ের কাপ ধরিয়ে দিয়ে চার্লি বলল, অনেকদিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হল লর্ড।
হে মহান জনগণ, আপনাদের আগেই জানিয়েছি আমরা একই ঘরের বাসিন্দা হলেও দেখা-টেখা আমাদের খুব কমই হয়ে থাকে। কেননা আমি যখন ঘরে থাকি; চার্লি তখন বাইরে। আবার চার্লি যখন ঘরে ঢোকে আমি তখন বাইরে ঘুরে বেড়াই।
হেসে বললাম, হ্যাঁ, তা তোমার হাতের কাজ কী রকম চলছে?
হাতের কাজ বলতে চুরি-চামারি। হতাশ এটা ভঙ্গি করে চার্লি দু-হাত উল্টে দিল। বলল, ভেরি ব্যাড লর্ড।
কেন?
লোকজন খুব কেয়ারফুল হয়ে গেছে। মাল-টাল আর সরানো যাচ্ছে না। ভাবছি হ্যাঁন্ডিক্র্যাফটের কাজটা ছেড়েই দেব। তার ওপর কাল যা একখানা এক্সপিরিয়েন্স হল নাকী বলব!
কী এক্সপিরিয়েন্স? আমার রীতিমতো কৌতূহলই হল।
