নিজের কথা শেষ করে লতিকা আমার দিকে তাকিয়েছিল। এবার তুমিই বলো–আমার আত্মহত্যার অধিকার আছে কিনা।
বলেছিলাম, তখনও বলেছি, এখনও বলছি-নেই। এখন বাড়ি চলো। অনেক রাত হয়ে গেছে।
না। তুমি চলে যাও।
আমি গেলে আরেকটা সুইসাইডের অ্যাটেম্পট নেবে বুঝি! কিন্তু ও প্রচেষ্টা তোমাকে চালাতে দেব না। শোনো লতিকা, লাইফের একটা সাইড তো দেখলে। এটুকুই কিন্তু শেষ নয়। বেঁচে থাকার অনেক মজা আছে, সেটা দেখবে না?
বেঁচে থাকার যে মজা আছে–সে কথা শুনেছি কিন্তু কখনও দেখিনি।
তুমি আমাকে একটা সুযোগ দাও; সেই মজাটা তোমার হাতে তুলে দেব। যদি না পারি, তোমার যা ইচ্ছে কোরো। চলো এখন, তোমাদের বাড়ি চলো।
একটা ট্যাক্সি ডেকে লতিকাকে তুলে নিয়েছিলাম। পাশাপাশি বসে যেতে যেতে থিয়েটার রোডে আমার অফিসের ঠিকানাটা দিয়ে বলেছিলাম, কাল নিশ্চয়ই আমার অফিসে আসবে।
পরের দিন আমার অফিসে লতিকা আসতেই প্রথমে জিগ্যেস করেছিলাম, তোমার পিতৃদেব, দ্বিতীয় মাতৃদেবী এবং তস্য ছানাপোনাদের খবর কী?
লতিকা বলেছিল, মা অজ্ঞান হয়ে যাবার পর ওরা পালিয়ে গেছে।
ভেরি গুড। ওদের ভাগাবার একটা অস্ত্র হাতে পাওয়া গেল। মাকে বলবে ওরা এলেই যেন অজ্ঞান হয়ে যায়।
লতিকা হেসে ফেলেছিল।
আমি বলেছিলাম, এবার কাজের কথায় আসা যাক। তুমি আমার কনসার্নে জয়েন করো। মাসে আপাতত হাজারটাকা করে পাবে।
সেই থেকে লতিকা আমার বিজনেস পার্টনার। সুখে-দুঃখে এবং মজাসে আমরা দিন কাটিয়ে দিচ্ছি। তবে একটু ঝামেলা দুজনেরই আছে। আমার মা মেন্টাল পেসেন্ট, আর লতিকার বাবা মাঝে মাঝেই এসে মেয়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যায়। লতিকা বাবার ওপর ক্ষেপে যায়, একটা মাতাল জুয়াড়িকে টাকা দিতে চায় না। আমি হেসে হেসে বোঝাই, আরে বাবা, আফটার অল লোকটা তোমার জন্মদাতা পিতা। জন্মটা যখন ওর জন্যেই হয়েছে এখন ওল্ড-এজ পেনসানটা দিয়ে যাও।
লতিকার আরেকটা সমস্যা অবশ্য মিটে গেছে। ওই ক্যান্সারের পেসেন্ট ভাইটা মারা গেছে। এর মধ্যে দুটো বোনের বিয়ে দিয়ে ফেলেছে সে, মাকে আর বাড়ি বাড়ি ঘুরে সেলাইয়ের অর্ডার আনতে দেয় না। মোট কথা, এ লাইফে এই প্রথম একটু সুখ-সচ্ছলতার মুখ দেখতে পেয়েছে সে। এ জন্যে আমার কাছে তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। প্রায়ই বলে, তুমি আমাকে বাঁচিয়েছ। আমি কিছু বলি না, হাসি।
লতিকা আবার বলে, আর যে প্রফেসানে এনে ঢুকিয়েছ তাতে যে কত রকমের মানুষ, কত রকমের মজা!
এবার বলি, তাহলে লাইফের একটু আধটু মজা দেখতে পাচ্ছ!
শুধু কৃতজ্ঞতাই না, কিছুদিন ধরে আমার নার্ভে কিছু কিছু গোলমেলে ব্যাপার ধরা পড়েছে। অফিসে কাচের দেয়ালের এধারে বসে থাকতে থাকতে আচমকা হয়তো চোখে পড়ে যায়, গভীর দৃষ্টিতে লতিকা আমাকে লক্ষ্য করছে। কখনও-সখনও আমরা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল কিংবা ময়দানের সবুজ ঘাসে গিয়ে বসি। তখন লতিকা আমার একটা হাত নিয়ে খেলা করতে থাকে। দুম করে কোনও কোনও দিন সে আমার এন্টালির বাড়িতে চলে আসে; কোমর বেঁধে রান্না করে ঘর গুছিয়ে দেয়; তারপর চলে যায়। একেকদিন গাঢ় গলায় সে বলে, আমার আর ভালো লাগে না।
আমি জিগ্যেস করি, কেন?
জানি না।
ব্যাপারটা বোধহয় সংক্রামক। আর আমিও একটা মানুষ। মানুষের সব প্রপার্টি যখন আমার আছে তখন লতিকা কাছে এলে, শুদ্ধ ভাষায় কী যেন বলে-হৃদয়ের শব্দ, হ্যাঁ তাই আমি শুনতে পাই। সে-ও কি আমার হৃদয়ের শব্দ শোনে? বুকের ভেতরকার এই শব্দটা তো ব্যান্ড পার্টির আওয়াজ নয়। কাজেই জোর করে কিছু বলতে পারি না। তবে আমার মনে হয় ও একদিন কিছু বলে ফেলবে। কিংবা গ্ল্যান্ডগুলো ভয়ানক দুর্বল হয়ে পড়লে আমিও দুম করে কিছু বলে ফেলতে পারি। দেখা যাক, কে আগে বরফ গলায়? মোটামুটি এই লতিকার সঙ্গে আমার সম্পর্ক।
.
হে মহান জনগণ, এখন অনেক রাত। কোথাও কোনও শব্দ নেই। কলকাতায় স্নায়ু একেবারেই ঝিমিয়ে পড়েছে।
এতক্ষণ নিজের লাইফ হিস্ট্রি, লতিকার লাইফ হিস্ট্রি, প্রফেসান–সব আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। কিন্তু এখন সমস্ত সরিয়ে সেই মহিলাটি, যার নাম মনোবীণা সান্যাল, তাঁর মেয়ে শমিতা, তার স্বামী এবং শমিতার কানাড়াবাসী বাবা–এরা আবার পুরনো রেকর্ড নতুন করে বাজার মতো স্নায়ুর ভেতর ফিরে আসতে লাগল। এদের কথা ভাবতে ভাবতে ক্রমশ আমার চোখ জুড়ে আসতে লাগল।
.
০৪.
ঘুম ভাঙতে প্রথমেই যাঁদের কথা মনে পড়ল তাঁরা হলেন মনোবাণী সান্যাল, তার স্বামী অরবিন্দ সান্যাল, তার মেয়ে শমিতা এবং শমিতার কানাডায় থাকা বাবা। কাল রত্তিরে এদের কথা ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
এখনও ভালো করে সকাল হয়নি। জানালার বাইরে আবছা আবছা অন্ধকার ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তবে মাঝে মধ্যে দু-একটা ট্রাম কি হরিণঘাটার দুধের গাড়ি কিংবা খবর কাগজের ভ্যান চলার শব্দ আসছিল।
ওই সব শব্দ-টব্দ আমার কানে ঢুকছিল না। জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম ঠিকই, কিন্তু ঝাপসা অন্ধকার, ভোরের আকাশ কিংবা অন্য দৃশ্যাবলী, কিছুই যেন দেখতে পাচ্ছিলাম না। মনোবীণা সান্যালদের চিন্তাটা আমাকে পেয়ে বসেছে।
অথচ মহিলার কাছ থেকে দুহাজার টাকা অ্যাডভান্স নিয়েছি। অ্যাডভান্স নেওয়া হয়ে গেলেই আমার কাজ শেষ। তখন পিছন দিকে ফিরেও তাকাই না। কিন্তু ওই মহিলা–মনোবীণা সান্যাল ফিক্সেসানের মতো আমার মাথার ভেতর আটকে গেছে।
