-কী হতে পারে বল তো?
ফুকস্ প্রশ্নটা এড়িয়ে বলে, ওঁর সঙ্গে আর দেখা হয়নি তোমার?
হয়েছিল। ঘণ্টাখানেক আগে এসে খামকা আমার সঙ্গে ঝগড়া করে গেছেন। বললেন, আমি নাকি ওঁকে চিঠি লিখে ভয় দেখাচ্ছি।
–কী চিঠি?
–কী জানি। কিছুই খুলে বললেন না।
–কী করবে এখন?
–তাই তো পরামর্শ করতে এলাম তোমার সঙ্গে।
–আমার সঙ্গে? আমার পরামর্শ তুমি শুনবে?
–কেন শুনব না?
–আমি যে নাস্তিক। আমি যে বিশ্বাসঘাতক।
-প্লিজ, অমন করে বোলো না। তোমাকে আমি কোনোদিনই বিশ্বাসঘাতক বলিনি।
–কিন্তু আমিও তো বিশ্বঘাতক হয়ে উঠতে পারি?
–না, পার না।
–পারি না? প্রফেসর কার্ল বিশ্বাস করে তার সুন্দরী যুবতী স্ত্রীকে এভাবে ফেলে পালাতে পারেন, তুমি এমন নাইটি পরে এতরাত্রে অসঙ্কোচে ব্যাচিলারের ঘরে আসতে পার, আর আমিই শুধু বর্বর হয়ে উঠতে পারি না?
-না পার না, জুলি। কারণ তুমি জান তাহলে আমি আত্মহত্যা করব। আমি খ্রিস্টান, আমি বিবাহিতা। আমি ব্যভিচারিণী হতে পারি না।
ক্লাউস নিরুদ্ধ আক্রোশে বিছানার ওপর একটা ঘুষি মারে।
রোনাটা হেসে বলে, পুয়োর চাইল্ড।
–থাক। রসিকতা কোরো না।–আবার উঠে যায় কাবারে কাছে। আর একটা বোতল পেড়ে আনে।
রোনাটা বলে, আর খেও না। তোমার পা টলছে।
-তুমি পাষাণ।
–আর তুমি নাস্তিক। কিন্তু নাস্তিকদেরও একটা জিনিস থাকে জুলি–’কোড অফ এথিক্স’।
–কিন্তু আমি তো মানুষ?
–তাই তো সেদিন বলছিলাম-তুমি বিয়ে করো। সংসার করো।
–আর তুমি? তোমার কী হবে?
–আমার আবার কী হবে?
–তুমি এমন দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছ কেন? নিজের চিকিৎসা করাচ্ছ না কেন?
ম্লান হাসল রোনাটা। ফুকস দু-পাত্র তরল পানীয় ঢালল। তারপর বললে, কই, জবাব দিলে না?
–কী জবাব দেবো? এ রোগের চিকিৎসা নেই, আমি জানি।
–কী রোগ?
–এখন আর তো তোমাকে জানানো যাবে না।
–কেন?
–নাস্তিককে তা বলা যায় না।
পানীয়টা কণ্ঠনালীতে ঢেলে দিয়ে আবার এক পাত্র ঢালে। বলে, বলতে তোমাকে হবে না। আমি জানি, কী তোমার রোগ। কী তার চিকিৎসা।
কৌতুক উপচে পড়ল রোনাটার গলায়। বললে, তাই নাকি? শুনি একটু।
–তোমার ‘মা’ হওয়া দরকার। তুমি একজন গাইনোকলজিস্টকে দিয়ে নিজেকে দেখাও।
রোনাটা জবাব দেয় না। এতক্ষণে পানপাত্রটা তুলে নেয় হাতে। এক সিপ মুখে দিয়ে বলে, তার প্রয়োজন নেই। আমার কোনো আঙ্গিক ত্রুটি নেই।
তবে কি প্রফেসর?
এবারও ইতস্তত করে রোনাটা জবাব দিতে। তার হাতটা কাঁপছে। সেই সঙ্গে কাঁপছে তার হাতে তরল পানীয়টা। অনেকটা খেয়ে ফেলে একসঙ্গে। মুখটা মুছে নিয়ে বলে, এসব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা কি তোমার উচিত হচ্ছে?
ফুকস্ খাটের প্রান্তে এগিয়ে আসে। রোনাটার কাঁধে একখানা হাত রাখে। বলে, হচ্ছে রোনাটা। আমার সে অধিকার আছে। তবে কি প্রফেসরই দায়ী?
-প্লিজ। আমাকে জিজ্ঞাসা কোরোনা, আমি বলতে পারব না।
দু-হাতে মুখ ঢাকে রোনাটা। ফুকস্ দু-হাতে ওর অনাবৃত বাহুমূল শক্ত মুঠিতে ধরে একটা ঝাঁকানি দেয়, বলে–বলতে তোমাকে হবেই রোনাটা। প্রফেসর কি পিতা হবার উপযুক্ত নন?
তবু মুখ থেকে হাত সরায় না রোনাটা। তার সোনালি চুলে ভরা মাথাটায় একটা ঝাঁকি দিয়ে বলে, আমি জানি না। বিশ্বাস করো, আমি জানি না।
-তবে কোনো ডাক্তারের কাছে তাকে নিয়ে যাওনি কেন?
হঠাৎ হাত সরে গেল রোনাটার। অশ্রুআর্দ্র দুটি চোখের দৃষ্টি মেলে ধরে বলে,
–বিশ্বাস করবে জুলি? অ্যালিসের মা এটাকে মেনে নিতে পারেনি। সে…অন্যত্র সান্ত্বনা খুঁজত।
-তার মানে? সব কথা আমাকে বল দেখি?
কিন্তু সব কথা খুলে বলা যায়? ওর কাছেও? হঠাৎ একেবারে ভেঙে পড়ে রোনাটা। উপুড় হয়ে পড়ে ওর বালিসের ওপর। ফুকস্ ওর প্ল্যাটিনাম-বুন্ড চুলের। ওপর ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দেয়। সে স্পর্শে একবার শিউরে উঠে রোনাটা। তার পিঠটা থরথর করে কাঁপতে থাকে। তারপর ওইভাবে মুখ লুকিয়েই বলে, বিবাহের আগেই প্রফেসর আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার সন্তানের মা হতে হবে না আমাকে!
হঠাৎ জোর করে ওকে টেনে তোলে! দু-হাতে ওর বাহুমূল শক্ত করে ধরে মুখোমুখি বসিয়ে দেয়। বলে, প্রতিশ্রুতি! কীসের জন্য প্রতিশ্রুতি! তুমি চেয়েছিলে? কেন?
–তাও কি বলে দিতে হবে তোমাকে?
চোখ দুটো জ্বলে ওঠে মাতালটার। বলে, তুমি কি পাগল? আমার জন্যে!!
হঠাৎ ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলে রোনাটা। থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে ওর ঠোঁট দুটো। অস্ফুটে বলে ফেলে, উড য়ু বিলিভ মি, জুলি, অ্যাট দিস এজ, আফটার এইট ইয়ার্স অব ম্যারেড লাইফ..আই অ্যাম,…ইয়েট, ইয়েট–এ ভার্জিন।
–”ফোর…থ্রি..টু…ওয়ান…নাউ!
“প্ৰকাণ্ড একটা ধোঁয়ার বলয় পাক খেতে খেতে ওপরে উঠে যাচ্ছে। ধোঁয়ার কুণ্ডলীর ওপর আর একটা আগুনের বলয়–তার কিনারাগুলো সিঁদুরে লাল। ওপরে ওপরে, আরও ওপরে উঠে গেল। অনাবিষ্কৃত একটা নগ্নসত্য আবির্ভূত হল ওর চোখের সামনে। পারমাণবিক বন্ধনমুক্ত মহামৃত্যু নেমে এল এবার পৃথিবীর বুকের ওপর।
“তারপর অস্বাভাবিক একটা নিস্তব্ধতা। পুরো দেড় মিনিট কেউ কোনো কথা বলেনি।”
.
০৭.
পরদিন অনেক বেলায় ফুকস-এর যখন ঘুম ভাঙল তখনও ওর মাথাটা ভার। কাল রাত্রের কথা আবছা মনে পড়ছে। কী যেন ঘটেছিল? কে যেন এসেছিল ওর ঘরে? একে একে সব কথা মনে পড়ে যায়। কখন পাশের ঘরে উঠে চলে গিয়েছিল রোনাটা? মনে পড়ছে না। মুখ হাত ধুয়ে নিল প্রথমেই। তারপর জামাকাপড় বদলে ফোন করল পাশের ঘরে। ফোন বেজেই গেলো। ধরল না কেউ। কী ব্যাপার? নিশ্চয় রোনাটা ঘুমাচ্ছে এখনও। তা তো হতেই পারে, ত্রিশ বছরের জীবনে এমন একটা রাত তার অভিজ্ঞতায় এই প্রথম।
