এবার স্তম্ভিত হবার পালা রোনাটার। অনেকক্ষণ নির্নিমেষ নয়নে সে তাকিয়ে থাকে ওর মুখের দিকে। তারপর অদ্ভুত স্বরে বললে, এ সব কী বলছ জুলি! তুমি নাস্তিক?
-হ্যাঁ তাই।
–আজ বিশ বছর মেলামেশার পর তুমি আমাকে একথা বিশ্বাস করতে বলো?
–বলি। এতদিন তোমাকে সাহস করে জানাইনি।
–আজই বা তাহলে জানালে কেন?
-আমার মনে হচ্ছে, তোমার-আমার শেষ বোঝাঁপড়ার দিন এসে গেছে। তোমার-আমার শেষ সিদ্ধান্তের আগে সবকিছু তোমার জেনে নেওয়া দরকার।
–শেষ সিদ্ধান্তটা কীসের?
–প্রফেসর কার্লকে যদি ডিভোর্স করতে বাধ্য হও তারপর…
রোনাটা একখানা হাত বাড়িয়ে দেয়। থামতে বলছে ওকে। ফুকস্ কিন্তু থামে না। বলে, থামবার উপায় নেই রোনাটা। এই হচ্ছে বাস্তব অবস্থা। আমি ও ঘরে চলে যাচ্ছি। যদি মনটা স্থির হয়, বের হবার ইচ্ছে হয়, আমাকে ফোন কোরো বরং…
***
নিজের ঘরে ফিরে এসে কাবার্ড থেকে বের করে হুইস্কির বোতলটা। মনটা আজ অনেক হালকা বোধ হচ্ছে। এতদিনে সে মন খুলে সত্যি কথাটা বলে ফেলেছে। সে নাস্তিক। এটাই ছিল রোনাটার সঙ্গে তার মিলনের পথে অন্যতম প্রধান বাধা। রোনাটা ধর্মভীরু, তার বাপের মতো। ক্লাউস মনে করে ঈশ্বর একটা ভাওতা। কতকগুলো ফন্দিবাজ লোকের একটা ফাঁকিবাজি। সাহস করে এতদিন রোনাটাকে কথাটা বলতে পারেনি। আজ মনের ভার নেমে গেছে। হঠাৎ ওর মাথায় একটা ফন্দি জাগে। প্রফেসর কার্লকে একটু বাজিয়ে দেখতে দোষ কী? ছদ্মবেশি লোকটা আসলে কে, সে কথা তাহলেই সহজে বোঝা যাবে। চট করে টেবিল থেকে একটা সাদা কাগজ তুলে নেয়। বাঁ-হাতে কলমটা ধরে ক্যাপিট্যাল অক্ষরে বড় বড় করে লেখে, “ছদ্মবেশ এবং ছদ্মনাম সত্ত্বেও তোমাকে কিন্তু চিনতে পেরেছি।”
কাগজটা ভাজ করে একটা খামে বন্ধ করে। উপরে লেখে ‘ডক্টর ক্লাউস ফুকস, রুম নং 728’। তারপর ঘরে চাবি দিয়ে নেবে যায় নীচে। রিসেপশান-কাউন্টারে এসে দেখে মেয়েটি চলে গেছে। তার বদলে অন্য একটি ছেলে বসে আছে। তার হাতে খামটা দেয়। যন্ত্রচালিতের মতো ছেলেটি পিছনের নম্বরি খোপে চিঠিখানা রেখে দেয়।
ফুকস্ আবার ফিরে আসে ওর ঘরে। বোতলটা টেনে নেয়। রেডিওটা খোলে। উৎকট জ্যাজ বাজছে কোথাও। বন্ধ করে দেয়। পাত্রটা হাতে উঠে গিয়ে দাঁড়ায় জানলার পাশে। নীচে প্রবহমান পারির সন্ধ্যা। গাড়ির ক্যারাভান আর নিওন আলোর ঝলকানি। বারে, পাবে, স্ট্রিপটিজ নাচের আসরে নিচের তলায় পারি এতক্ষণে জমজমাট। আর ও একা ঘরে বসে মদ্যপান করছে। পাশের ঘরেও নিশ্চয় বসে আছে কাঠ হয়ে অধ্যাপকের শুচিবায়ুগ্রস্ত ধর্মপত্নী-স্বামীর সঙ্গে যার বাইশ বছর বয়সের ফারাক। ‘দুত্তোর’ বলে উঠে পড়ে ক্লাউস। ঢকঢক করে পাত্রের বাকি মদটুকু ঢেলে দেয় গলায়। হাতের উল্টোপিঠে মুখটা মুছে নেয়। তারপর ঘর বন্ধ করে চলে যায় আবার পাশের ঘরে।
কিন্তু দ্বারের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল। ঘরের ভেতর বচসা হচ্ছে। দাম্পত্যকলহ নিশ্চয়, অর্থাৎ অধ্যাপক-মশাই ফিরে এসেছেন এতক্ষণে। কী। কথা হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না–কিন্তু দুজনেই উত্তেজিত। পায়ে পায়ে আবার ফিরে আসে নিজের ঘরে।
আবার হুইস্কির বোতলটা টেনে নেয়।
***
ঘণ্টাতিনেক কেটে গেছে তারপর। বোতলটা কখন জানি শেষ হয়ে গেছে। তখনও ওর তৃষ্ণা মেটেনি। হুইস্কিতে এ তৃষ্ণা মিটবে না বোধহয়। নৈশাহার হয়নি। ফলি বার্জার-এ নৈশাহারের জন্য টেবিল বুক করা ছিল। যায়নি। এখন কিন্তু খেতে যাবার মতো শারীরিক অবস্থাও আর নেই। রীতিমতো পা টলছে। জামা কাপড় ছেড়ে নৈশসজ্জা পরে নেয়। তারপর নীল বাতিটা জ্বেলে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে। ঘুম আসে না কিছুতেই।
অনেক পরে মনে হল কে যেন দ্বারে সন্তর্পণে টোকা দিচ্ছে। ফুকস্ বিরক্ত বোধ করে। দ্বারের বাইরে সে বোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছে ‘বিরক্ত করবেন না’–তবু কে এল জ্বালাতে? টলতে টলতে এসে দরজা খুলে দিয়েই চমকে ওঠে একেবারে।
করিডোরে স্তিমিত আলোয় দাঁড়িয়ে আছে বোনাটা।
সন্ধ্যার সেই সাজসজ্জা নেই তার অঙ্গে। পরেছে একটা নাইটি। অদ্ভুত বিচিত্র বর্ণের সেই ঢিলে-ঢালা পোশাকটা। ধূসর রঙের সঙ্গে এসে মিশেছে কিছুটা সিঁদুরে লাল, কিছুটা বা হলুদ, কমলা অথবা নীল। এমন বর্ণসম্ভার সে কোথায় যেন দেখেছে! রামধনু রঙে? প্রজাপতির পাখায়? সূর্যাস্তের বর্ণসম্ভারে? ঠিক মনে পড়ছে না। হুইস্কির একটা তরল পর্দা ওর স্মৃতিপথে যবনিকার সৃষ্টি করেছে!
-তুমি!
নিঃশব্দে রোনাটা ঢুকে পড়ে ওর ঘরে। দরজাটা ঠেলে দেয়। ইয়েল-লক। তৎক্ষণাৎ তালাবন্ধ হয়ে গেল নিশ্চয়। ঘরটা ছিল আলো-আঁধারী। নীলাভ আলোর একটা মোহময় আবরণে ঢাকা। রোনাটা হাত বাড়িয়ে টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে দেয়। হঠাৎ আলোর বন্যায় চোখ ধাঁধিয়ে গেল ক্লাউস-এর। ওর মনে হল রোনাটা নাইটির নীচে অধোবাস পরেনি। ওর অন্তরের যুগ্মকামনা উত্তুঙ্গ হয়ে উঠেছে। রোনাটা কিন্তু তার বেশবাস বিষয়ে সচেতন নয়। এসে বসল সে চেয়ারটা টেনে নিয়ে। একখানা কাগজ বাড়িয়ে ধরে বললে, পড়ে দেখ।
-কী ওখানা?-কাগজটা হাত বাড়িয়ে নেয়।
–একটু আগে হোটেলের একজন বয় দিয়ে গেল।
প্রফেসর অটো কার্ল-এর সংক্ষিপ্ত পত্র। স্ত্রীকে লেখা। সম্বোধনবিহীন। লিখেছেন, বিশেষ জরুরি প্রয়োজনে তিনি কর্মস্থলে ফিরে যাচ্ছেন। রোনাটা যেন ক্লাউসের সঙ্গে পরে সুবিধামতো ফিরে আসে। ব্যস। আর কিছু নয়।
