আরও ঘন্টাখানেক পরে আবার ফোন করল। এবারও নিরুত্তর।
খোঁজখবর নিতে গিয়ে যা জানা গেল তা প্রায় অবিশ্বাস্য। মিসেস রোনাটা কার্ল ভোরবেলা উঠে হোটেল থেকে চেক-আউট করে বেরিয়ে গিয়েছেন। ঠিকানা রেখে যাননি।
একটা দিন অপেক্ষা করল। যদি অন্য কোনো হোটেল থেকে রোনাটা ফোন করে। তারপর হারওয়েলে ফিরে গেল সে দ্বিতীয় দিন।
সেখানে তার জন্য প্রতীক্ষা করছিল সবাই।
অদ্ভুত খবর। দুদিন আগে মিসেস অটো কার্ল ফিরে এসেছিলেন। পাড়ার লোক শুনেছে–স্বামী-স্ত্রীতে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়েছিল রাত্রে। সকালবেলা জানা গেছে। অধ্যাপকজায়া আত্মহত্যা করেছেন। ফুকস্ যখন ফিরে এল তখনও মৃতদেহের সকার হয়নি।
ক্লাউস ফুকস-এর মানসিক অবস্থাটা সহজেই অনুমেয়। রুদ্ধদ্বারকক্ষে একা বসে রইল সে সারাটা দিন। প্রফেসর কার্ল-এর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারল না। কতটা জানেন তিনি? কতটা বলে ফেলেছে রোনাটা? এমনটা যে হবে, তা কে ভেবেছিল? সে বসে বসে সে-রাত্রের কথাটা ভাবেনাঃ। সে ইচ্ছার বিরুদ্ধে রোনাটাকে বাধ্য করেনি। অত বড় জানোয়ার সে নয়। মনে পড়ে যায় অনেক অনেকদিন আগেকার সেই কথা। সেদিনও ওর চুম্বন-উদ্যত আনত মুখটা। ঠেলে দিতে চেয়েছিল প্রথমে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত দৃঢ় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেছিল ওকে। ঠিক সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি কি আবার হয়নি এবার? তাহলে এমন কাণ্ডটা কেন করল রোনাটা? তবে কি হেতুটা ক্লাউস নিজে নয়–প্রফেসর কার্ল? রোনাটা কি বুঝতে পেরেছে, প্রফেসর কার্ল এ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক? দেশের প্রতি, মুক্ত পৃথিবীর প্রতি জঘন্যতম অপরাধ করেছে যে-মানুষটা তার সহধর্মিণী হয়ে বেঁচে থাকতে চায় না রোনাটা।
হঠাৎ ঝনঝন করে বেজে উঠল টেলিফোনটা।
মদের পাত্রটা নামিয়ে রেখে ক্লান্ত ফুকস্ টেলিফোনটা তুলে নেয়। সিকিউরিটি অফিসার জেমস্ আর্নল্ড একবার দেখা করতে চান। অবিলম্বে। ফুকস্ রীতিমতো বিরক্তি প্রকাশ করে বললে, মাপ করবেন, আমি অত্যন্ত ক্লান্ত। আজ আমি কোনো কথা বলতে পারব না।
–আপনিই বরং মাপ করবেন আমাকে। আপনার মানসিক অবস্থাটা বুঝতে পারছি। ডক্টর, কিন্তু আমি নিরুপায়। ব্যাপারটা অত্যন্ত জরুরি। আমি একবার আসছি।
পুলিসের লোক। ’না’ বললে শোনে না। ওরা মানুষের সুখ-দুঃখ-অনুভূতির ধার ধারে না।
একটু পরেই এসে উপস্থিত হল জেমস্ আর্নল্ড। বললে, আমি জানি মিসেস কার্ল ছিলেন আপনার বাল্যবান্ধবী। তার এমন পরিণামে আপনি যে কতটা মর্মাহত তা অনুমান করতে পারি। কিন্তু ইতিমধ্যে এমন কতকগুলি ব্যাপার ঘটেছে যাতে আপনাকে বিরক্ত করতে বাধ্য হচ্ছি।
ফুকস্ পানীয়টুকু গলাধঃকরণ করে বললে, বলুন। আমি প্রস্তুত।
-পারিতে অথবা পথে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে দেখেছেন আপনি?
অম্লানবদনে ফুকস্ বললে, না, তেমন কিছু তো আমার নজরে পড়েনি।
মিসেস কার্ল কেন আত্মহত্যা করলেন কিছু অনুমান করতে পারেন?
–না।
-ফর য়োর ইনফরমেশন ডক্টর, ঘটনার পূর্বদিন রাত্রে কলহের সময় ওঁরা বার বার যে শব্দটা উচ্চারণ করেছিলেন, রুদ্ধদ্বার কক্ষের বাইরে তা মনে হয়েছে-ট্রেইটার, বিশ্বাসঘাতক।
ফুকস্ নির্লিপ্তের মতো বললে, দাম্পত্য-কলহে ও শব্দটা এমন কিছু অপ্রত্যাশিত নয়। যে কোনো পক্ষ যখন মনে করে অপরপক্ষ তার প্রেমের মর্যাদা দিচ্ছে না তখন ওই শব্দটা ব্যবহার করে।
আর্নল্ড ঘরোয়া হতে চায়। হেসে বলে, আপনি ব্যাচিলার হয়েও তো অনেক খবর রাখেন।
ফুকস্ কিন্তু হাসে না। নীরবে আর এক পাত্র মদ ঢালতে থাকে।
-কিন্তু ব্যাপারটার ওখানেই শেষ হয়নি ক্লাউস ফুকস। পরদিন ওঁদের মেডসার্ভেন্ট ডরোথি যখন প্রশ্ন করে গৃহকর্ত্রী এমনভাবে আত্মহত্যা করলেন কেন, তখন অসতর্ক মুহূর্তে প্রফেসর বলেছিলেন-রোনাটা বিশ্বাসঘাতকের সঙ্গে ঘর করতে চায় না বলে।
ফুকস্ চমকে ওঠে। বলে, বলেন কী। তারপর? প্রফেসর এ কথার কী জবাবদিহি করছেন?
করছেন না। তিনি কোনো জবানবন্দি দেননি এবং দেবেন না বলেছেন।
–আই সি।
আর্নল্ড এতক্ষণে বোতল থেকে নিজের পাত্রে মদ ঢালে। আরও ঘনিয়ে বসতে চায় সে। প্রশ্ন করে, আপনি অমনভাবে চমকে উঠলেন কেন ডক্টর?
–চমকে উঠলাম? কই না তো? চমকে উঠব কেন?
–আমার মনে হল যেন আপনি বলতে চাইছেন মিসেস কার্ল শুধু দাম্পত্য জীবনের বিশ্বাসঘাতকতার প্রসঙ্গে কথা বলেননি।
ফুকস্ জবাব দেয় না। সে আরও সতর্ক হয়ে ওঠে।
–আর একটা কথা। পারির হোটেলে কি আপনি এমন একজন বৃদ্ধকে দেখেছিলেন, যাঁকে দেখতে অবিকল প্রফেসর কার্লের মতো, অথচ তার ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি আছে?
অম্লানবদনে ফুকস বললে, কই না তো।
–রোনাটা মারা যাবার পর প্রফেসরের সঙ্গে আপনার কথা হয়েছে?
হয়েছে। মামুলি সান্ত্বনার কথা ছাড়া আর কিছুই আলোচনা হয়নি।
হঠাৎ কেন উনি পারি থেকে হারওয়েলে ফিরে এলেন তা জানাননি?
-না। প্রশ্নটা করবার অবকাশ পাইনি। উনি আর একটু মানসিক স্থৈর্য ফিরে পেলে জিজ্ঞাসা করব।
করবেন। তিনি কী বলেন জানাবেন আমাকে।
–জানাব।
***
ওকে প্রশ্ন করতে হয়নি। প্রফেসর নিজেই বলেছিলেন। রোনাটাকে সমাধিস্থ করার পরে একদিন প্রফেসর কার্ল এসে দেখা করলেন ফুকসের সঙ্গে। বললেন, তুমিই এবার হারওয়েলে নাম্বার ওয়ান হলে। স্যার জন কক্ৰক্ট অবসর নিচ্ছেন শুনেছ নিশ্চয়, আর আমিও পদত্যাগ করছি।
