–তবে থাক।
দুজনে কিছুক্ষণ নীরবে পানাহার করতে থাকে। তারপর ফুকস্ বলে, আচ্ছা সত্যি করে বলত রোনাটা–তুমি কী চাও? আমি ইস্ট-জার্মানিতে চাকরি নিয়ে চলে গেলে তুমি খুশি হও, না বকে নিয়ে এসে এখানেই যদি রাখি?
রোনাটা মিষ্টি হাসে। বলে, কী মনে হয়?
–কী জানি, ঠিক বুঝতে পারি না। এক-এক সময় মনে হয় আমি তোমার চোখের আড়ালে চলে গেলেই শান্তি পাবে তুমি।
–নিজের গুরুত্বটা বড় বেশি করে দেখছ না?
–তুমিই তো বললে সেদিন।
-সে তো রাগের মাথায়।
–তবে মনের কথাটা কী?
–এতদিনেও যদি না বুঝে থাক, তবে বুঝে আর কাজ নেই।
-কিন্তু স্পষ্ট করে না বললে কেমন করে আমি সিদ্ধান্ত নেব। ও চাকরি নেব কি না?
ম্লান হাসল রোনাটা। বললে, আমার ইচ্ছার সঙ্গে তোমার সিদ্ধান্ত নেবার কী সম্পর্ক? আমাকে খুশি করতেই কি সারাজীবন ধরে সিদ্ধান্ত নিয়েছ তুমি?
-না, তা নিইনি। তোমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম একদিন…
–সে কথা কিন্তু আমি ‘মিন’ করিনি। ও কথা বরং থাক।
–তবে কী কথা আলোচনা করব? আজকের আবহাওয়া?
–না। অন্য কিছু।
–তবে তোমার কথা বল।
–কী আমার কথা?
–তুমি আবার ‘মা’ হচ্ছ না কেন?
–আবার ‘মা’। মানে?
–অ্যালিসের কোনো ছোটো ভাই অথবা বোন?
ম্লান হাসল রোনাটা। যক্ষ্মারোগীর রক্তশূন্য পাণ্ডুর হাসি। ব্র্যান্ডিটা গলায় ঢেলে দিয়ে বললে, ফর য়োর ইনফরমেশন জুলি, অ্যালিস আমার মেয়ে নয়।
দ্বিতীয় পানপাত্রটা তুলেছিল ক্লাউস। ধীরে ধীরে এবার তার হাতটা নেমে আসে। অবাক হয়ে বলে, মানে? অ্যালিস তোমার মেয়ে নয়?
–না। অ্যালিস প্রফেসর কার্ল-এর প্রথম পক্ষের কন্যা।
ক্লাউস-এর মনে পড়ে গেল অ্যালিসের চেহারা। অ্যালিস ছিল ব্রুনেট– মাথাভরা কালো চুল। অথচ রোনাটা ব্লন্ডি। তাই মেয়ে মায়ের মতো দেখতে হয়নি আদৌ। অস্ফুটে বললে, আশ্চর্য। এত বড় খবরটা এতদিন আমাকে বলনি তো?
-শুধু তাই নয় জুলি। অ্যালিস প্রফেসর অটো কার্লের মেয়েও নয়।
তার মানে?
–অ্যালিসের মাকে তিনি বিবাহ করেন ওই কন্যা সমেত।
হঠাৎ ক্লাউস ওর গ্লাভস-পরা হাতটা চেপে ধরে–যেভাবে একদিন তার হাত চেপে ধরেছিল প্রথম যৌবনে, সিঁড়ির মুখে। বলে, ডাক্তার দেখিয়েছিলে? অসুস্থ কে? তুমি, না প্রফেসর?
–অসুস্থ হতে হবে তার মানে কী?
রোনাটা তার হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। বলে, পাগলামি কোরো না। এখানে আরও লোক আছে।
ক্লাউস তার হাতটা ছেড়ে দেয়। রোনাটা ঘড়ি দেখে বলে–সময় হয়ে গেছে। চল, ওঠা যাক। বাসটা ছেড়ে দেবে না হলে।
ওরা টুরিস্ট বাসে গিয়েছিল ভার্সাই। প্রফেসর কার্ল ওর গাড়িটা ব্যবহার করছেন।
***
পরের দিন ক্লাউস একাই বেরিয়েছিল তার গাড়িটা নিয়ে। শহরতলির এক বিশেষ অঞ্চলে। হিটলারের অত্যাচারে দেশত্যাগ করার আগে সে কিছুদিন পারিতে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছিল। ওকে যারা আশ্রয় দিয়েছিল তাদের কিছু তত্ত্ব-তালাশ নেবার উদ্দেশ্যে। দেখা পেল না কারও। যুদ্ধের ডামাডোলে ও-অঞ্চলের বাসিন্দারা তো ছাড়, গোটা ভূগোলটাই পালটে গেছে। সব অচেনা মানুষ। হোটেলে ফিরে এসে রিপেসশান কাউন্টারে নিজের ঘরের চাবিটা নিতে যাবে হঠাৎ নিজের নামটা শুনে চমকে উঠল। ওর সামনেই কাউন্টারের দিকে মুখ করে, এবং ওর দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়েছিলেন একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক। কাউন্টারের রিসেপশনিস্ট মেয়েটিকে তিনি বললেন, দেখুন তো ডক্টর ক্লাউস ফুকস-এর নামে কোনো চিঠি আছে? রুম নম্বর 728?
মেয়েটি কাউন্টারের পিছনে পায়রার খোপের মতো একটা বাক্স থেকে বার করে আনল একটা মোটা খাম। তখনই হস্তান্তরিত করল না কিন্তু। বলল, আপনার। চাবিটা প্লিজ?
–ও সার্টেনলি! বৃদ্ধ তাঁর পকেট থেকে হোটেলের চাবিটা বার করে টেবিলে রাখলেন।
মেয়েটি বললে, মাপ করবেন, এটা 729 নম্বর।
বৃদ্ধ যেন চমকে ওঠেন। তারপর হো-হো করে হেঠে ওঠেন। বলেন, আমারই ভুল। প্রফেসর কার্ল-এর ঘরের চাবিটা ভুল করে নিয়ে নিয়ে এসেছি। ওই 728 আর 729 আমি একসঙ্গে বুক করেছি।
মেয়েটি জবাব দেয় না। একটা রেজিস্টার খুলে কী যেন দেখে। তারপর সে নিশ্চিন্ত হয়ে হাসে। ফরাসি ভাষায় বলে, আপনারা, মানে ইংরেজ অধ্যাপকরা, সবাই একরকম। যান, আপনার বন্ধুর চাবিটা তাকে ফেরত দিয়ে আসুন।
বৃদ্ধ অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে খাম আর চাবিটা তুলে নিয়ে সরে পড়লেন। ক্লাউস এতক্ষণে চিনতে পারল তাঁকে। নিঃসন্দেহে তিনি প্রফেসর অটো কার্ল-যদি না তার যমজভাই হন। তফাত শুধু এই প্রফেসর কার্ল এর দাড়ি-গোঁফ পরিষ্কার করে চাছা, এই বৃদ্ধের দিব্যি কঁচাপাকা ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি।
বৃদ্ধের অলক্ষ্যে সে তাকে অনুসরণ করে সদর দরজা পর্যন্ত এল। বৃদ্ধ হন্তদন্ত হয়ে বার হয়ে গেলেন। হোটেলের পোর্টিকোর তলাতেই অপেক্ষা করছিল একটা কালো রঙের মার্সেডিজ। তার ড্রাইভার দরজা খুলে দিল। মুহূর্তমধ্যে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
ঘটনাটা নিরতিশয় অদ্ভুত। কে ওই বৃদ্ধ? কেন তিনি ক্লাউস ফুকস্-এর নামে মিথ্যা পরিচয় দিলেন মেয়েটির কাছে? গাড়িটাই বা কার? অন্যমনস্কের মতো সে ফিরে এল কাউন্টারে। মেয়েটিকে বললে, নাম্বার 728 প্লিজ?
যান্ত্রিক অভ্যাসে হুক থেকে নামিয়ে মেয়েটি বাড়িয়ে ধরে চাবিটা।
-দেখুন তো 729 নম্বর চাবিটা এখানে আছে কিনা?
হঠাৎ কী মনে পড়ে যায় মেয়েটির। বলে, ও হো! আপনাদের চাবি দুটো উল্টোপাল্টা হয়ে গিয়েছে। আপনার বন্ধু আপনার চাবিটা নিয়ে চলে গেলেন। এইমাত্র…
