পারিতে পৌঁছেই কিন্তু অতি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন প্রফেসর কার্ল। দিনপঞ্জিকায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট তার ঠাসা। বেড়ানোর সময় নেই আদৌ। রোনাটা অভিযোগ করলে বলেন, আমি তো আগেই বলেছিলাম–আমি বেড়াতে আসছি না, কাজে আসছি। তা তোমার অসুবিধা কী আছে? ঘোর না যত খুশি। ক্লাউস তো আছে সঙ্গ দিতে।
অগত্যা ক্লাউসকেই ঘুরতে হচ্ছে। লুভর মিউজিয়াম, আর্ক-দ্য-ত্রিয়ম্ফ, ঈফেল-টাওয়ার, নতরদাম গির্জা। ভালোই লাগছিল ফুকসের। দুজনের মধ্যে কোনো চুক্তি হয়নি, কিন্তু সেই প্রসঙ্গটা কেউই আর উত্থাপন করেনি। বন্ধুত্বের সম্পর্কেই আনন্দ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সন্ধ্যায় নৌকাযোগে সেইন-এ বেড়াচ্ছে। রাস্তার ধারে খোলা রেস্তোরাঁয় আহারাদি সেরে হোটেলে ফিরছে রাত করে।
পুরানো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায় ক্লাউস-এর। তার যৌবনের দিনগুলোর কথা। সেই যখন সে ছিল রোনাটার বাবার আশ্রয়ে। তখনও এমনিভাবে ওরা দুজন বেড়াতে যেত। ও ছাড়া আর কারও সঙ্গে ডেটিং’করত না। রোনাটা। তাহলেও মেয়েটা ছিল অত্যন্ত সাবধানী, রক্ষণশীল। বেশি দূর অগ্রসর হতে দেয়নি কখনও তাকে। একসঙ্গে সিনেমা দেখেছে, থিয়েটার দেখেছে, নেচেছে, গল্প করেছে। ব্যস, তারপর অগ্রসর হতে চাইলেই সরে গেছে রোনাটা। অথচ ক্লাউস-এর বেশ মনে আছে, রোনাটা সে-যুগে তাকে ঘিরে ময়ূরের মতো পেখম মেলে নাচত। জীববিজ্ঞানের নিরিখে তুলনাটা হয়তো ঠিক হল না, কিন্তু বাস্তবে ঘটনাটা ওইরকমই হত। সে-আমলে রোনাটার প্রসাধন, সাজসজ্জা, অঙ্গভঙ্গি, বাকচাতুর্য সবকিছুই ছিল ওই তরুণ ছাত্রটির মনোহরণের উদ্দেশ্যে।
একদিনের ঘটনা ওর বিশেষ করে মনে পড়ে। সেই একটি দিনই ও উদ্দাম হয়ে উঠেছিল। তখনও রোনাটার বাবা বেঁচে। সে রাত্রে লন্ডনে বিখ্যাত ওল্ড ভিক’ গ্রুপের রোমিও-জুলিয়েট হচ্ছে। ক্লাউস দুখানা টিকিট কেটে এনেছিল। রোনাটা একমাত্র তার সঙ্গে তখন ‘ডেটিং’ করছে–ওর বাবা জানেন সে কথা। অনুষ্ঠান দেখে যখন ফিরে এল তখন শহরতলীতে নিশুতি রাত। বাড়ির সবাই শুয়ে পড়েছে। দ্বিতল বাড়ি। একতলায় ক্লাউস-এর শোওয়ার ঘর–ভাইবোনদের নিয়ে রোনাটা থাকত দ্বিতলে। সদর দরজার ডুপ্লিকেট চাবি থাকত ওদের কাছে। আহারাদি সেরে এসেছিল ওরা। ওকে শুভরাত্রি জানিয়ে রোনাটা যখন দ্বিতলে উঠে যাচ্ছে তখন হঠাৎ গ্লাভস-সমেত হাতটা চেপে ধরেছিল ফুকস্। রোনাটা প্রথমটা বুঝতে পারেনি। বলেছিল, কী?
ফুকস-এর রক্তে তখন তুফান জেগেছে। কোনো কথা বলেনি সে। জোর করে ওকে টেনে নিয়েছিল নিজের বুকে। প্রথমটা বিস্ময়, তারপরেই শিউরে উঠেছিল রোনাটা। দু-হাতে ওকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল–বাধা দিয়েছিল। ফুকস্ সে বাধা মানেনি। জোর করে চেপে ধরেছিল ওর পায়রার মতো নরম বুক নিজের পেশীবহুল কবাট বক্ষে। কী যেন বলতে চেয়েছিল রোনাটা–পারেনি। ফুকসের উন্মুক্ত ওষ্ঠাধরে সে প্রতিবাদের ভাষাটা হারিয়ে গিয়েছিল। অদ্ভুত একটা অনুভূতি। আজও ভোলেনি সে কথা। কখন অজান্তে রোনাটার প্রতিবাদ-উদ্যত বাহুজোড়া ওকে সবলে আলিঙ্গন করে ধরেছিল। সেই ওকে প্রথম চুম্বন করে। এবং সেই শেষ। এর চেয়ে আর একটি পদও তাকে অগ্রসর হতে দেয়নি মেয়েটি।
পরে এ নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। ক্লাউস বলেছিল–ইচ্ছের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই নয়, তাহলে তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলে কেন? রোনাটা দু-হাতে মুখ ঢেকে বলত–প্লিজ, ক্লাউস, ও-প্রসঙ্গ তুললে আমি তোমার সামনে আর আসব না। আশ্চর্য লাজুক মেয়েটা। না, লাজুক নয়–রক্ষণশীল। ও কিন্তু মধ্যযুগের মেয়ে নয়, চার্চের ‘নান’ নয়, কলেজে-পড়া আধুনিকা। তার সহপাঠিনীরা ‘ডেটিং’ করতে গিয়ে সপ্তপদীর কয় পা অগ্রসর হত, সে কথা নিশ্চয় জানা ছিল তার। কিন্তু ধর্মের এক ভূত চেপে বসেছিল রোনাটার ঘাড়ে। কুমারী মেয়ের কৌমার্য সম্বন্ধে সে ছিল অস্বাভাবিক রকমের সচেতন–আর সে কৌমার্য ওর ঠোঁটে, বুকে, সর্বাঙ্গে। আশ্চর্য মেয়ে!
তবু তার একটা অর্থ হয়। প্রাকবিবাহযুগে কুমারী মেয়ের সহজাত সংস্কার। কিন্তু এর অর্থ কী? আজ কেন সেই পরিণতবয়স্কা মেয়েটি হঠাৎ বলে বসল : বিবাহের সংজ্ঞা ইন্দ্রিয়জ ব্যভিচারের একটা পাসপোর্ট নয়?
***
প্রফেসর কার্ল গোটা-তিনেক ক্যামেরা এনেছেন–কিন্তু ফটো তোলার মত সময় অথবা মেজাজ নেই তার। অগত্যা রোনাটা আর ক্লাউস আনাড়ি হাতে তার সদ্ব্যবহার করে। এখানে-ওখানে ফটো তুলে বেড়ায়। সেদিন ওরা গেল শহরের বাইরে ভার্সাইপ্রাসাদ দেখতে। লুই পরিবারে বিলাস-ব্যসনের স্মৃতি-বিজড়িত ভার্সাই প্রাসাদ। অনেক ফটো নিল। তারপর প্রাসাদের পিছন দিকের সুন্দর বাগানটিতে গিয়ে বসল ওরা। টুরিস্ট অনেক এসেছে, বাগানটাও অতি প্রকাণ্ড। দূরতম প্রান্তে একটা কারনেশান-বেড এর ধারে ওরা যেখানে গিয়ে খাবারের বাস্কেট খুলল, সেখানটা প্রায় নির্জন। ফুকস্ তার ফ্লাস্ক বার করে দু-পাত্র ব্র্যান্ডি ঢালল। রোনাটা বললে, আজ আমরা এই যে বাগানটায় নির্জনে বসে লাঞ্চ খাচ্ছি, এখানেই একদিন হয়েছিল ‘টেনিস কোর্ট বিদ্রোহ’ তা জান?
–টেনিস-কোর্ট বিদ্রোহটা কী?
-তুমি কি নিউক্লিয়ার ফিজিক্স ছাড়া আর কিছু পড়নি? ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস?
-না। অত সময় আমার নেই।
–তবে ও প্রসঙ্গ থাক। গোটা ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস শোনাবার মতো মেজাজ আমার নেই।
