ওপি নিজেকে যাই ভাবুক না কেন গোয়েন্দা হুভার তাকে বিশ্বাসঘাতক ছাড়া আর কিছু ভাবত না। নিউ ইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবুনের বিশেষ সংবাদদাতা লিখেছেন, 1953 সালের নভেম্বর-তক ওপেনহাইমার-সংক্রান্ত নথিপত্র এত জমেছিল যে, ফাইলগুলি একের পর এক সাজানো হলে তা সাড়ে চার ফুট উঁচু হয়ে যেত। অর্থাৎ মানুষটার বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রায় মানুষ-প্রমাণ! হুভার ওই মাসেই সেই। পর্বতাকৃতি নথিপত্র ঘেঁটে একটা সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট তৈরি করল। ম্যানহাটান প্রকল্পের বিভিন্ন নথিপত্র থেকে ওপি যেমন সঙ্গোপনে একটি মাত্র বোমা তৈরি করতে বসেছিলেন, ঠিক সেই ভঙ্গিতেই হুভার তৈরি করল আর একটি পরমাণু বোমা। ওপেনহাইমার তার বিন্দুবিসর্গও জানেন না। যুদ্ধকালে হিরোশিমার জিয়ানো কইমাছগুলোও বোধকরি এত নিশ্চিন্ত ছিল না। ইন্ডিয়ানাপোলিস জাহাজে যেমন অতি সঙ্গোপনে পাচার করা হয়েছিল প্রথম বোমাটা–ঠিক তেমনি করেই হুভার তার রিপোর্টখানা সন্তর্পণে পাঠিয়ে দিলেন সর্বোচ্চ দপ্তরে; এমনকি একটি কপি খাস আইসেনহাওয়ারের কাছে। না জেনারেল আইসেনহাওয়ার নয়, প্রেসিডেন্ট আইক-এর দপ্তরে। এতদিনে ট্রুম্যানের চেয়ারে এসে বসেছেন আইক।
তাতে কাজ হল।
রিপোর্টে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সাজিয়েছেন হুভার। যুক্তিনির্ভর তথ্য :
প্রথমত, ওপেনহাইমার দীর্ঘদিন ধরে কম্যুনিস্টদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের অনেক রুদ্ধদ্বার কক্ষের মিটিং-এ উপস্থিত ছিলেন। অনেক কম্যুনিস্ট ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল তাঁর। ওপির স্ত্রী, ভাই ও ভ্রাতৃবধূ কম্যুনিস্ট। ওপেনহাইমার ছদ্মনামে ওদের মুখপত্রে প্রবন্ধ লিখেছেন, পার্টি ফান্ডে চাঁদা দিয়েছেন। তার অকাট্য প্রমাণ আছে।
দ্বিতীয়ত, 1943-এর সেই বারোই জুন ওপি যে মেয়েটির সঙ্গে রাত কাটান সেই মিস ট্যাটলক একজন নামকরা কম্যুনিস্ট এজেন্ট। ওই সাক্ষাৎকারের পর মেয়েটি আত্মহত্যা করে। কারণটা অজ্ঞাত।
তৃতীয়ত, ওপেনহাইমার সজ্ঞানে মিথ্যাভাষণ করেছেন-হাকন শেভেলিয়ার আদৌ গুপ্তচরবৃত্তি নেননি। দীর্ঘদিন ওই শেভেলিয়ারের পেছনে এফ. বি. আই. গুপ্তচর নিযুক্ত করে নিঃসন্দেহে বুঝেছে তিনি জীবনে কখনও রাশিয়ান গুপ্তচরদের সংস্পর্শে আসেননি। ওপেনহাইমার তার মিথ্যাভাষণে একজন নিরীহ পণ্ডিতের সর্বনাশ করেছেন।
প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার সচরাচর এসব ব্যাপারে নাক গলাতেন না। অধীনস্থ কর্মচারীদের যথাকৰ্তব্য করতে দিতেন। এক্ষেত্রে কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটল। তিনি তৎক্ষণাৎ কয়েকজন অতি উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীকে হোয়াইট হাউসে ডেকে পাঠালেন। সংক্ষিপ্ত অধিবেশন। মিলিটারিম্যান আইসেনহাওয়ার তার কোনো কর্মচারিকে ‘দিস রিকোয়ার্স এ্যাকশান’ বলেছিলেন কিনা জানি না–কিন্তু ব্যবস্থা হল অবিলম্বে।
ওপেনহাইমার তখন প্রিন্সটাউনে। আসন্ন বড়দিনের উৎসবে ব্যস্ত। হঠাৎ একটা জরুরি টেলিগ্রাম এল ওয়াশিংটন থেকে–অ্যাটমিক-এনার্জি কমিশনের চেয়ারম্যান তাকে অবিলম্বে দেখা করতে বলেছেন। একুশে ডিসেম্বর সব কাজ ফেলে ওপি ছুটে এলেন ওয়াশিংটনে। দেখা করলেন চেয়ারম্যানের সঙ্গে। তখনই তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হল চার্জশিট। দীর্ঘ অভিযোগের তালিকা। বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে তিনি অভিযুক্ত।
বজ্রাহত হয়ে গেলেন ‘বিংশশতাব্দীর প্রথমার্ধের শ্রেষ্ঠ প্রতিভা।
যোজনবিস্তৃত সর্ষে ফুলের ক্ষেত নয়; তিনি দেখলেন–’প্রকাণ্ড একটা ধোঁয়ার বলয় পাক খেতে খেতে ওপরে উঠে যাচ্ছে–একটা আগুনের বলয়, তার কিনারাগুলো সিদুরে লাল…অনাবিষ্কৃত একটা নগ্নসত্য উদঘাটিত হল চোখের সামনে…ঘনিয়ে এল মহামৃত্যু।
অস্বাভাবিক একটা নীরবতা। পুরো দেড় মিনিট ওপেনহাইমার কথা বলেননি।
শুরু হল ওপেহাইমারের ঐতিহাসিক বিচার। বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে।
সেটা কিন্তু 1954-র এপ্রিল মাসে। বস্তুত বিশ্বাসঘাতক ‘ডেক্সটার’ ধরা পড়ার চার বছর পরে। আমাদের মূল কাহিনির এক্তিয়ারের বাইরে।
আজ্ঞে না। ওপেনহাইমার ‘ডেক্সটার’ নন।
.
০৬.
ক্লাউস ফুকস্ আর সস্ত্রীক প্রফেসর কার্ল গ্রীশ্মাবকাশ কাটাতে এলেন পারিতে।
হঠাৎই এ সিদ্ধান্ত। প্রস্তাবটা প্রথমে তুলেছিলেন প্রফেসর কার্ল অন্যভাবে। কী একটা প্রয়োজনে তাকে দিন তিন-চারের জন্য পারিতে যেতে হবে। কারণটা কী তা উনি খুলে বলেননি। তখন রোনাটা হঠাৎ বলে বসে, তাহলে আমরাও কেন যাই না সঙ্গে? ক্লাউস-এর নতুন গাড়িটার একটা পরখ হয়ে যাবে। কী বল ক্লাউস?
ক্লাউস তার পুরনো গাড়িটা বেচে সম্প্রতি একটা ভালো সিডানবডি গাড়ি কিনেছে। সেটা নিয়ে পারি ভ্রমণে যেতে তার আদৌ আপত্তি নেই, আগ্রহ আছে। সেসব কথা নয়, ও ভাবছিল হঠাৎ রোনাটার এ মত পরিবর্তনের কারণটা কী? ইতিপূর্বে সে তো একদিন অন্তিম ফতোয়া জারী করে বসে আছে ক্লাউস তাদের বাড়িতে একেবারে না এলেই ভালো হয়।
মোটকথা ব্যবস্থা হল। সব কিছু আয়োজন করলেন প্রফেসর কার্ল। পারিতে হোটেলের ঘর বুক করলেন তিনিই। তারপর একদিন ওঁরা রওনা হয়ে পড়লেন। গাড়ি নিয়ে। লন্ডন থেকে পারি।
ওঁরা এসে উঠলেন পিগেল অঞ্চলে হোটেল ইন্টারন্যাশনালে। প্রকাণ্ড হোটেল। ব্যবস্থাপনা ভালো। প্রফেসর আগেভাগেই দু-খানি ঘর ‘বুক’ করেছেন। সাততলায়। রুম নম্বর 728 এবং 729। দুটোই দ্বৈতশয্যার। ক্লাউস-এর পক্ষে এতবড় কামরার প্রয়োজন ছিল না কিন্তু পাশাপাশি থাকা যাবে এই মনে করে প্রফেসর ওই ব্যবস্থা করেছিলেন। 729-এ উঠলেন সস্ত্রীক কার্ল এবং 728-এ একা ফুকস।
