কর্নেল প্যাশ এবার তার আক্রমণ-পদ্ধতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হল। সত্য। কথা–ওই চিঠিখানার অস্তিত্ব প্রমাণ করা শক্ত। সেটা স্বীকার করা মানে, প্রমাণ করা লস অ্যালামসে সিকিউরিটিম্যান অপদার্থ ছিল। প্যাশ এবার প্রশ্ন করে, এ কথা কি সত্য যে, আপনি কম্বিনেশান-চাবির সাহায্যে কারচুপি করে লস অ্যালামসের ‘আয়রন-সেফ’ একদিন খুলে ফেলেছিলেন?
ফাইনম্যান বলে, তা কেমন করে সম্ভব? সেখানে তো সর্বক্ষণ প্রহরা থাকত।
–আমি নিশ্চিন্তভাবে খবর পেয়েছি–প্রহরী মিনিট পনেরোর জন্য অনুপস্থিত ছিল, আর তখন আপনি সেফটি খোলেন।
ফাইনম্যান অট্টহাস্য করে ওঠে। বলে, কী বকছেন মশাই পাগলের মতো? আপনি কি এই আষাঢ়ে গল্পও এনকোয়্যারি-কমিশনকে শোনাতে চান নাকি?
–আপনি সোজাসুজি আমার প্রশ্নের জবাব দিন। এ অভিযোগ আপনি অস্বীকার করছেন? ‘হ্যাঁ’ না ‘না’?
ফাইনম্যান গম্ভীর হয়ে বললে, এককথায় ওর জবাব হয় না। আমাকে কতকগুলি প্রতিপ্রশ্ন করতে দিতে হবে–
-বলুন?
–ওই আয়রন-সেফ-এ মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্রের গোপনতম তথ্য রাখা হত–এ কথা সত্য?
-ইয়েস।
–তাই ওই সেফটি বসানোর আগে তার নিরাপত্তা বিষয়ে এফ. বি. আই.-কে দিয়ে পরীক্ষা করানো হয়েছিল–আপনারা লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন সেটা কেউ খুলতে পারবে না।’হ্যাঁ’ না ‘না’?
কর্নেল প্যাশ ইতস্তত করে বলে : ইয়েস।
অথচ এখন আপনি বলছেন, পনেরো মিনিটের মধ্যে একজন ফুস-মন্তরে সেটা খুলে ফেলল। কেমন? তার অনুসিদ্ধান্ত কী? আপনারা অপদার্থ না গল্পটা আষাঢ়ে?
কর্নেল প্যাশ চটে উঠে বললে, জেরা কে করছে? আপনি না আমি?
–আপনার অনুমত্যনুসারে আপাতত আমি।
-না। আমি প্রশ্ন করব, আপনি জবাব দেবেন। বলুন–কোর্টে দাঁড়িয়ে হলপ নিয়ে আপনি এ অভিযোগ অস্বীকার করতে পারেন?
আগে কোর্টে তুলুন মশাই। আদালতের কথা আদালতে হবে। আপাতত এটা আমার ড্রইংরুম।
কর্নেল প্যাশ উঠে দাঁড়ায়। দ্বারের দিকে পা বাড়ায়।
–জাস্ট এ মিনিট কর্নেল-পিছন থেকে ফাইনম্যান ডাকে।
–ইয়েস?
–আপনার সেই মাথামোটা বন্ধু ম্যাককিলভিকে বলবেন–আমার চিঠিখানা পুড়িয়ে ফেলে সে বুদ্ধিমানের মতো কাজ করেনি। একটু তদন্ত করলে সে জানতে পারত চিঠিখানা আমার ব্যক্তিগত টাইপরাইটারে টাইপ করা–
–কোন্ চিঠিখানা?
–আপনি জানেন না। সে জানে। যেখানায় তাকে আমি চারটে জরুরি খবর জানিয়েছিলাম। রাখলে, সেখানাই আমার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় এভিডেন্স হতে পারত। তাকে জিজ্ঞাসা করবেন। সব কথা এবার সে স্বীকার করবে।
***
রবার্ট জে. ওপেনহাইমারও আমাদের কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছেন। আমরা ভুললেও এফ. বি. আই. তাকে ভোলেনি। ইতিমধ্যে গোয়েন্দা হাত বদলেছে। কর্নেল প্যাশ তার নথিপত্র বুঝিয়ে দিয়েছেন তার উত্তরসূরী এডগার হুভারকে। এফ. বি. আই. ওপেনহাইমারের ব্যাপারে সর্বক্ষণের জন্য একটি স্পেশাল গোয়েন্দা লাগালেন। নবনিযুক্ত এই গোয়েন্দাটি ছায়ার মতো অনুসরণ করে চলেছে ওপিকে।
যুদ্ধজয়ের অব্যবহিত পরেই ওপেনহাইমার লস অ্যালামাসের ডিরেকটারের আসন থেকে পদত্যাগ করলেন। অনেকেই বিস্মিত হল এ সিদ্ধান্তে। ওপি সংবাদপত্রের প্রতিনিধিদের বললেন–অতঃপর বৈজ্ঞানিক গবেষণাই তার জীবনের ব্রত। মারণাস্ত্র নয়, অধ্যয়ন ও অধ্যাপনে নিযুক্ত হতে চান তিনি। প্রকৃত বিজ্ঞানভিক্ষুর মতো কথা।
ইতিমধ্যে কিন্তু আমূল পরিবর্তন হয়েছে তার জীবনদর্শনে। খ্যাতির মোহ পেয়ে বসেছে তাঁকে। একের পর একটি সম্মান পেয়ে যাচ্ছেন তিনি। কাগজে কাগজে ফলাও করে বার হচ্ছে তার নাম। প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান যুদ্ধান্তে তাকে সে বছরই দিলেন- ‘মেডেল অফ মেরিট’। ন্যাশনাল বেবি ইনস্টিটুট তাকে সে বছর ‘ফাদার অফ দ্য ইয়ার’ বলে ঘোষণা করল। ‘পপুলার মেকানিস্ট’ নামে একটি পত্রিকা এক বিশেষ সংখ্যায় তাকে খেতাব দিল ‘বিংশশতকের প্রথমার্ধের শ্রেষ্ঠ মনীষী’। আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ, অরবিন্দ, গান্ধীজী, রোমাঁ রোঁলা, ফ্রয়েড, বার্নাড শ-কে পিছনে ফেলে ওপি ‘সবিনয়ে’ গ্রহণ করলেন এ খেতাব। অনেক কাগজেই তাকে উল্লেখ করা হচ্ছে ‘অ্যাটম-বোমার জনক’ হিসাবে। সহস্রাধিক বৈজ্ঞানিকের প্রাপ্য সম্মানটাও নির্বিচারে গ্রহণ করলেন ওপি। তিনি তার প্রাইজ, খেতাব, এবং মানপত্রগুলি রোজই নাড়াচাড়া করেন। সস্ত্রীক ইউরোপ ভ্রমণে গেলেন। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কুড়িয়ে আনলেন ‘অনারারি ডক্টরেট’। সংবাদপত্রে তাঁর নামে যেখানে যা কিছু ছাপা হয় তা সাজিয়ে রাখেন ফাইলে। এ কাজের জন্য শেষ পর্যন্ত একটি সেক্রেটারি পর্যন্ত নিযুক্ত করলেন ওপি।
লোভ থেকে মোহ–তা থেকে অহঙ্কার। আমূল বদলে গেলেন ওপেনহাইমার। দিবারাত্র বক্তৃতা দিয়ে বেড়ানোই হল তার কাজ। আজ এখানে দ্বারোঘাটন, কাল সেখানে সভাপতিত্ব, পরশু ওখানে প্রধান-অতিথি। ক্লাস নেওয়াও হয়ে ওঠে না সবসময়ে। 1943 থেকে 53–এ দশ বছরের মধ্যে তিনি মাত্র পাঁচটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লেখার সময় করে উঠতে পেরেছিলেন এবং বিশেষজ্ঞদের মতে সেগুলিও নেহাৎ মামুলি। অথচ বক্তৃতাপ্রসঙ্গে আইনস্টাইনের মতো লোককেও তিনি কড়া সমালোচনা করতে কসুর করেননি। ওঁর একজন দীর্ঘদিনের বন্ধু এই সময়ে লিখেছেন, “যেদিন ওপি জেনারেল মার্শালকে শুধু ‘জর্জি’ বলে উল্লেখ করল সেদিনই বুঝলাম আমরা ভিন্ন পথের পথিক হয়ে গিয়েছি। মনে হয় আকস্মিক খ্যাতিতে ওর মাথা ঘুরে গিয়েছিল।…সে নিজেকে মনে করত সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের অবতার। যেন দুনিয়াটাকে ঠিক পথে চালিত করার দায়িত্ব শুধু ওর স্কন্ধের ওপর আরোপিত!”
