সর্বনাশ! পরবর্তী প্লেনে স্কার্ডন চলে গেল হেলসিঙ্কি। বৃথাই। সেখানে সংবাদ পাওয়া গেল, পূর্ববর্তী প্লেনে ডক্টর ব্রুনো সপরিবারে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি তারপর কোথায় গেলেন কেউ জানে না।
অনেক পরে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড অনুমান করেছে–হয় এখান থেকে রাশিয়ান এম্বাসির সহযোগিতায় ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্টে ব্রুনো ছদ্মবেশে রাশিয়ায় চলে যান। অথবা মোটরে করে তাদের সঙ্গে সীমান্ত পার হয়ে যান। মোট কথা, ব্রুনোর খবর আর পাওয়া যায়নি।
অ্যালান নান মে ধরা পড়ল। আর ব্রুনো পন্টিকার্ভো–এ কাহিনির দু-নম্বর গুপ্তচর ডাস-হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
সাত বছর পরে প্রাভদায় প্রাকশিত একটি প্রবন্ধে ব্রুনোর অন্তর্ধান-রহস্যে শেষ যবনিকাপাত ঘটল। জানা গেল, ব্রুনো বহাল তবিয়তে মস্কোতে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাকার্যে নিযুক্ত আছেন। হেলেনার সঙ্গে তার বাপ-মায়ের আর কোনোদিন সাক্ষাৎ হয়নি।
নিঃসন্দেহে ব্রুনো বুঝতে পেরেছিল তাকে সন্দেহ করছে এফ. বি. আই. এবং স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড। লিভারপুলে চাকরি নেওয়া, শ্যামনীতে কনফারেন্সে যাবার প্রতিশ্রুতি, রোমে রিটার্ন-টিকিট কাটা, স্টকহমের হোটেলে দুখানি ঘর ভাড়া করা সবই তার দীর্ঘমেয়াদি পলায়নপ্রকল্পের প্রস্তুতি। নিঃসন্দেহে সে মিলানের আমেরিকান টুরিস্ট এবং রোমের ফরাসি আর্টিস্টটিকে চিহ্নিত করেছিল। আর সেই জন্যেই সে স্টকহম এয়ারপোর্টে স্ত্রীকে উচ্চকণ্ঠে জানিয়েছিল তার হোটেলের নাম। স্কটল্যান্ড-ইয়ার্ডের পাকা গোয়েন্দার নাকে ঝামা ঘষে দিয়ে যেভাবে সে পালালো সেটা গোয়েন্দা গল্পেই সম্ভব–যদিও এটা আদ্যন্ত বাস্তব ইতিহাস।
ব্রুনো বোধকরি আর একটা প্রমাণ রেখে গেল ফাইনম্যানের সেই ঋষিবাক্যটির :E = mc^2 অপরাধ-বিজ্ঞানী কোনোদিনই বুঝবে না; কিন্তু ধূর্ততার প্রতিযোগিতায় নিউক্লিয়ার ফিজিসিস্টের কাছে পাকা-গোয়েন্দাও-ফুস।
‘অ্যালেক’ শেষ হয়েছে, ‘ডগলাস’ শেষ হল–এবার বাকি রইল পালের গোদা : ডেক্সটার। তার কথাই বলি :
৭. কেন ৫-৮
০৫.
ফাইনম্যানকে কিন্তু ধরাছোঁয়ার মধ্যে পাওয়া গেল না। ম্যাককিলভি দীর্ঘদিন লেগে ছিল তার পিছনে, ছায়ার মতো। কোনো নূতন সূত্র আবিষ্কার করতে পারেনি। অবশেষে কর্নেল প্যাশ নিজেই একদিন এসে হাজির হল প্রফেসর ফাইনম্যানের ডেরায়। সমাদর করে ফাইনম্যান তাকে বসালোলা নিজের বৈঠকখানায়। আবহাওয়া থেকে শুরু করে সিনেমা, বেল সব কিছু আলোচনা করল খোশমেজাজে, কফি খাওয়ালো। শেষমেশ লস অ্যালামসের প্রসঙ্গ তুলতে বাধ্য হল প্যাশ। ফাইনম্যান তৎক্ষণাৎ বললে, আপনার আইডেন্টিটি কার্ডটা দেখাবেন দয়া করে?
কর্নেল প্যাশ তৈরি হয়েই গিয়েছিল। তৎক্ষণাৎ তার সনক্তিকরণ কাগজপত্র দেখালো অধ্যাপককে–সে সিকিউরিটির লোক, লস অ্যালামস সম্বন্ধে আলোচনা করার অধিকার তার আছে এটা প্রমাণ করল। বললে, এবার আপনাকে আমি কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে চাই; কিছু মনে করবেন না–
করলেই বা ঠেকাচ্ছে কে? স্বচ্ছন্দে প্রশ্ন করে যান।
–পিটার নামে আপনার কোনো পুত্রসন্তান ছিল, বা আছে?
আজ্ঞে না। আমার আদৌ কোনো পুত্রসন্তান হয়নি। ছিল না, বা নেই।
–মিসেস ওবমোতা নামে একটি গভর্সেকে আপনার পুত্রের জন্য কখনও নিয়োগ করেছিলেন একগাল হাসল ফাইনম্যান। বললে, আপনার প্রশ্নটাই অবৈধ। হয়ে পড়ছে নাকি, অফিসার? আমার পুত্রই নেই, তার জন্য গভর্নের্স?
-আই মিন, ওই নামে কাউকে আপনি চেনেন?
–না, চিনি না।
–অথচ লস অ্যালামসে থাকতে একটি চিঠিতে আপনি পিটার এবং মিসেস ওবমোতার উল্লেখ করেছিলেন?
-না।
–না? আমার কিন্তু একজন সাক্ষী আছে।
আনন্দের কথা। সাক্ষীকে কাঠগড়ায় যখন তুলবেন তখন তাকে আমি ক্রস্-এগজামিন করব। জিজ্ঞাসা করব পিটার বানান কী? ওই বানানে সে আমার লেখা কোনো চিঠিতে
–একজ্যাক্টলি। ওই বানানে লেখেননি। উল্টো করে লিখেছিলেন–
-কর্নেল! আপনি গোয়েন্দা আমি বিজ্ঞানী–কিন্তু আমরা আলোচনা করছি ইংরেজি ভাষা নিয়ে। কোনো ভাষাবিদকে ডাকলে হয় না? আর-ই-টি-ই-পি বানানে পিটার উচ্চারণ শাস্ত্রসম্মত কিনা
এবারও বাধা দিয়ে প্যাশ বলে, দেখুন প্রফেসর, আপনি ক্রমাগত ব্যাপারটাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন। এটা আদৌ কোনো রসিকতার কথা নয়। আপনি কি নিজেই আমাদের সিকিউরিটি অফিসারকে বলেননি অক্ষরগুলো উল্টোপাল্টা করে লিখেছেন?
-বলেছিলাম। না হলে সে আমার চিঠি পাস্ করছিল না।
–অথচ অক্ষরগুলো মোটেই উল্টোপাল্টা করে সাজানো নয়, স্রেফ উল্টো করে সাজানো–কেমন?
-তাই নাকি?
–এবং পিটার একজন রাশিয়ান এজেন্ট।
–বলেন কী!
–অথচ আপনি ম্যাককিলভিকে বলেছিলেন, পিটার আপনার ছেলের নাম, মিসেস ওবমোতা আপনার গভর্নেসের নাম?
-বলেছিলাম।
–কেন?
–ওই তো বললাম-না হলে সে আমার চিঠি পাস্ করত না।
–তাহলে আসলে আপনি আপনার স্ত্রীকে কী কথা জানিয়ে ছিলেন? ফাইনম্যান সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলে, লুক হিয়ার অফিসার, আমার স্ত্রীকে আমি চিঠিতে কী লিখেছি তা জানাতে আমি বাধ্য নই। আমি বলব না।
–আমার কাছে অস্বীকার করতে পারেন। কিন্তু কোনো এনকোয়ারি কমিশনের কাছে—
ফাইনম্যান হেসে বলে, আপনি ভুল করছেন অফিসার। ওভাবে হবে না। এনকোয়্যারি কমিশন পর্যন্ত যেতেই পারবেন না আপনারা। ওই চিঠিখানির অস্তিত্বই প্রমাণ করতে পারবেন না। তাছাড়া আমার অ্যাডভোকেট আপনাদের তো ছেড়ে কথা বলবে না। আমি তো অমন চিঠির কথা মনেই করতে পারব না। আপনাদেরই বরং জবাবদিহি করতে হবে, কেন অমন চিঠি আপনারা পাস’ করলেন–আদৌ যদি চিঠির অস্তিত্বটা মেনে নেওয়া হয়।
