স্কার্ডন তখন মনে মনে ভাবছে ওর চমকটা কি লক্ষ্য করেছে ব্রুনো? নিশ্চয় নয়। সে তো এক-সেকেন্ডের দশভাগের একভাগ সময় মাত্র চমকে চোখ তুলে তাকিয়েছে ওর ছেলের দিকে। ব্রুনো নিজেও নিশ্চয় চমকে উঠেছিল। সে খেয়াল করবে না। তাছাড়া ব্রুনো স্কার্ডনকে হারওয়েলে কোনোদিন দেখেনি। তার ওপর সে ছদ্মবেশে আছে। সর্বোপরি সে বর্তমানে ফরাসি চিত্রকর, ইটালিয়ান ভাষা জানে না। ফলে ব্রুনো নিশ্চয়ই আতঙ্কিত হবে না।
হেলেনা তার স্বামীকে বললে, এয়ারপোর্ট থেকেই সোজা বাবার ওখানে চলে। যাই না কেন?
ব্রুনো বললে, সেটা ভালো দেখায় না। আমি ওইজন্যে হোটেল কঁতিনেতালে আগে থেকেই ঘর বুক করে রেখেছি। হোটেলে পৌঁছে তোমার বাবাকে ফোন করব।
স্কার্ডন পাকা গোয়েন্দা। কোনো ফাঁদে পা দিতে সে প্রস্তুত নয়। সে তৎক্ষণাৎ সরে যায় ‘ওয়েটিং হল’-এর অপরপ্রান্তে। পাবলিক টেলিফোন বুথে ঢুকে পড়ে। কাঁচের ঘর। ওখান থেকে ব্রুনো পরিবারকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নজর এড়াচ্ছে না। গাইড হাতড়ে বার করে হোটেল কঁতিনেতাল-এর নম্বর। ডায়াল করে সেই নম্বরে। রিসেপশান ধরতেই বললে, একটু দেখে বলুন তো ডক্টর ব্রুনো পন্টিকার্ভোর নামে ঘর বুক করা আছে কিনা।
ওপ্রান্তে সুকণ্ঠী মহিলাটি বললেন, আছে। আপনিই কি ডক্টর পন্টিকার্ভো?
-না না। আমি ওঁর একজন বন্ধু। তার সঙ্গে ওখানে আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। যাই হোক রুম নম্বরটা কত?
–825 এবং 126।
–ধন্যবাদ।
এবার নিশ্চিন্ত হয়ে ও বেরিয়ে আসে পথে। তখনও ব্রুনোর মালপত্র প্লেনের গর্ভ থেকে ওখানে এসে পৌঁছায়নি। একটা ট্যাক্সি নিল স্কার্ডন। বললে, হোটেল কঁতিনেতাল।
ওখানেই উঠল সে। আটতলাতেই ঘর পেল। 811। এটা 826-এর ঠিক উল্টোদিকে এবং রাস্তার দিকে। মালপত্র নিয়ে ঘরে চলে গেল স্কার্ডন। ঘরটা বন্ধ। করে গিয়ে বসল জানলার ধারে। যেখানে বসে হোটেলের প্রবেশপথটা দেখা যায়। সুটকেস থেকে বাইনোকুলারটা বার করল। যতক্ষণ ব্রুনো পরিবার হোটেলে এসে
পৌঁছাচ্ছে ততক্ষণ ও নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। অবশ্য চিন্তা করার কিছু নেই। এখানেই ঘর রিজার্ভ করা আছে তার। ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করে কেমন যেন। সন্দিগ্ধ হয়ে পড়ে স্কার্ডন। ব্যাপার কী? ঘরে তালা মেরে সে নেমে এল রিসেপশানে। কাউন্টারে যে মেয়েটি ছিল তাকে প্রশ্ন করে, ডক্টর ব্রুনো পন্টিকার্ভোর নামে কোনো রিজার্ভেশান আছে?
মেয়েটি একটি রেজিস্টার দেখে বললে, আছে। দুখানা ঘর। নাম্বার 825 এবং 826। আজই তার আসার কথা। এয়ারপোর্ট থেকে তিনি ফোনও করেছেন। এখনই আসছেন বললেন।
–ধন্যবাদ। আচ্ছা কতক্ষণ আগে তিনি ফোন করেছেন বলুন তো?
–ধরুন ঘণ্টাখানেক আগে।
–ডক্টর ব্রুনো কি নিজেই ফোন করেছিলেন? না তার বন্ধু?
বন্ধু আগে করেছিলেন। তার মিনিট পনেরো পরে ডক্টর নিজেই ফোন করেন।
স্কার্ডন নিশ্চিন্ত হয়ে নিজের ঘরে ফিরে এল।
কিন্তু একী! আরও ঘণ্টা দুই কেটে গেল। ব্রুনো এলো না। এবার আর। কাউন্টারে গিয়ে খোঁজ নিতে সাহস হল না। বেশি কৌতূহলী হলে চিহ্নিত হয়ে পড়বে। ফোন করল পরপর 825 এবং 826 নং ঘরে। দু জায়গাতেই ফোন বেজে গেল। কেউ ধরল না। অর্থাৎ ওর নজর এড়িয়ে কোনো অসতর্ক মুহূর্তে ব্রুনো পরিবার আসেনি। এতক্ষণে একটু নার্ভাস হয়ে পড়েছে স্কার্ডন। চাকরির রেকর্ডে তার দাগ পড়েনি ইতিপূর্বে। এমন হাতের মুঠো থেকে শিকার ফসকালে সে মুখ দেখাবে কী করে? কিন্তু ওরা যাবে কোথায়? তবে নিশ্চয় মিসেস ব্রুনোর পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত মত বদলেছে ব্রুনো। সোজা চলে গেছে শ্বশুরবাড়ি। এমনও হতে পারে ওর শ্বশুর এয়ারপোর্টে গিয়েছিলেন। দেখা হয়ে গেছে। মেয়ে-জামাইকে পাকড়াও করে নিয়ে গেছেন। এইটেই একমাত্র সমাধান। স্কার্ডন ঘড়ির দিকে তাকায়–রাত এগারোটা। অর্থাৎ ইতিমধ্যে চারঘণ্টা হয়ে গেছে। টেলিফোন ডাইরেক্টারি হাতড়ে বার করল একটা নম্বর। ডায়াল করল। মহিলাকণ্ঠে কেউ বললেন, হ্যালো!
ইটালিয়ান ভাষায় স্কার্ডন বলে, মিস্টার নর্ডব্লম-এর বাড়ি?
–হ্যাঁ। মিসেস নর্ডব্লম বলছি। কাকে চান?
–দেখুন, আপনি আমাকে চিনবেন না। আমি ডক্টর ব্রুনোর একজন বন্ধু। সে আমাকে লিখেছে আজ সে এখানে আসবে–
–আমরাও তো তাই জানি। ব্রুনো একা নয়। তার সপরিবারে আসার কথা। কিন্তু তারা তো এখনও এসে পৌঁছায়নি।
–কিন্ত রোম-সার্ভিস তো ঠিক সময়েই এসেছে। সে তো ঘণ্টাচারেক হল।
তবে বোধহয় কোনো হোটেলে উঠেছে। আপনার নামটা বলুন। ও এলে বলব।
-কিছু মনে করবেন না। তাকে একটা সারপ্রাইজ দিতে চাই। সে এলে দয়া করে ওকে বলবেন না আমি ফোন করেছিলাম।
-ও আচ্ছা, আচ্ছা। তবু আপনার নাম্বারটা বলুন। ও এলে আপনাকে রিং করব।
–আমি একটা পাবলিক বুথ থেকে ফোন করছি। আমি কাল সকালে নিজেই ফোন করব বরং। শুভরাত্রি
কিন্তু রাত্রিটা বোধহয় ‘শুভ’ নয়। ও তৎক্ষণাৎ বের হয়ে পড়ল হোটেল থেকে। ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেল এয়ারপোর্টে। সমস্ত ব্যাপারটাই কেমন যেন ধোঁয়াটে লাগছে। ওখানকার সিকিউরিটি অফিসারকে আত্মপরিচয় দিল। তার সাহায্য চাইল। আন্তর্জাতিক সৌজন্যের খাতিরে সিকিউরিটি অফিসার ওকে সাহায্য করতে রাজি হলেন। রাত সাতটার পর যে সব যাত্রীবাহী প্লেন বিমানবন্দর ত্যাগ করেছে তার তালিকাটি দেখাই হল প্রথম কাজ। বেশি খুঁজতে হল না। দেখা গেল রাত নটার একটা প্লেনে ডক্টর ব্রুনো স্বনামে টিকিট কেটে সপরিবারে হেলসিঙ্কি চলে গেছেন। ফিনল্যান্ড যাবার পাসপোর্ট ছিল তার।
