এ তারবার্তা যখন এসে পৌঁছালো তখন ব্রুনো সপরিবারে চলেছে। সুইজারল্যান্ড ছেড়ে ইটালির দিকে। একটু ঘুরপথে দেশ দেখতে দেখতেই যাচ্ছে। ব্যস্ততা কী? তাকে তো আর বাঘে তাড়া করেনি। অস্ট্রিয়ার ইনস্বার্গের কাছাকাছি এসে ‘ইন’ নদীর অববাহিকা ধরে চলেছে সে ব্রেনার পাস্-এর দিকে, যেখানে এককালে ইউরোপ-কেক কাটার প্ল্যান করতে বসেছিলেন হিটলার আর মুসোলিনি! স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের অভিজ্ঞ গোয়েন্দা স্কার্ডন রওনা হয়ে গেল প্লেনে। ব্রুনো ক্রমাগত দেশ থেকে দেশান্তরে যাচ্ছে। বিদেশে তাকে গ্রেপ্তার করা সহজ নয়। বিদেশে তাকে গ্রেপ্তার করতে হলে সে দেশের অনুমতি চাই। তবে ব্যস্ত হবার কিছু নেই–ব্রুনোর জন্য খাঁচা বানানো হয়েছে লিভারপুলে। পাখি খাঁচায় ফিরে আসবেই। তখনই ঝাঁপ বন্ধ করতে হবে। স্কার্ডন-এর ওপর আদেশ ছিল শুধু নজর রেখ সে যেন সাম্যবাদ-ঘেঁষা কোনো দেশে না যায়। অবশ্য সে সব দেশে যাওয়ার ছাড়পত্রও ছিল না ব্রুনোর পাসপোর্টে।
ব্রুনো সপরিবারে মিলানে এসে পৌঁছলো বারোই আগস্ট। বাবা-মার সঙ্গে দেখা করল। মিলানের দ্রষ্টব্য জিনিসগুলি দেখাল স্ত্রীকে। স্কালা, মিলান-গির্জা, লেঅনার্দোর লাস্ট সাপার। জেমস্ স্কার্ডন এখানেই তার সন্ধান পায়। টুরিস্টের বেশে সে বরাবরই ছিল কাছে কাছে। এরপর ব্রুনো চলে যায় সিসেরোতে। সেখানে বাইশে আগস্ট স্কার্ডন দেখল কী একটা উৎসব হচ্ছে। কী ব্যাপার? শোনা গেল, ব্যাপার এমন কিছু গুরুতর নয়, ব্রুনো পন্টিকার্ভোর সেটা সাঁইত্রিশতম জন্মদিন। তার পর দিন ওরা চলে এল রোমে। ছায়ার মতো অনুসরণ করে চলেছে স্কার্ডন। তবে বারে বারে ভোল পালটাচ্ছে। মিলানে সে ছিল আমেরিকান টুরিস্ট–চোখে চশমা, দাড়ি-গোঁফ কামানো। রোমে সে হচ্ছে ফরাসি চিত্রকর। একমাথা চুল, একমুখ দাড়ি, চোখে গগল্স, হাতে রং-তুলি, ঈজেলের ব্যাগ। ব্রুনো অথবা হেলেনা যেন লক্ষ্য না করে একজন তোক ক্রমাগত তাদের পেছন পেছন। ঘুরছে–মিলান থেকে সিসেরো, সেখান থেকে রোম।
***
উনত্রিশে আগস্ট ব্রুনো সস্ত্রীক রোমের সিটি অফিসে এল একদিন। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারওয়েজ-এর বুকিং কাউন্টারে। সেখানে গিয়ে সে জিজ্ঞাসা করল সুইডেন-এর রাজধানী স্টকমে যাওয়ার ভাড়া কত। ব্রুনো নিশ্চয় খেয়াল করেনি, কিউ-সরীসৃপে ঠিক ওর পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল একজন ফরাসি আর্টিস্ট। চাপ দাড়ি, চোখে গগস, মাথায় বাউলার হ্যাট। বুকিং ক্লার্ক কী জবাব দিল তা। শুনতে পেল না স্কার্ডন। কিন্তু দেখল ব্রুনো তার ওয়ালেট খুলে নোট বার করছে। ঠিক এই সময় হেলেনা তার স্বামীর জামার হাতটা ধরে টানল। কী যেন বলল, জনান্তিকে। ব্রুনো লাইন ছেড়ে একটু দূরে সরে গেল। স্বামী-স্ত্রীতে কী জাতীয় জনান্তিক আলাপচারিতা হল তাও শুনতে পেল না স্কার্ডন। কিউ-সরীসৃপে স্কৰ্ডনের পিছনে যে ছিল সে তাকে একটা কুনুইয়ের গোঁত্তা মেরে বললে, ততক্ষণ আপনি টিকিটটা কেটে ফেলুন না মশাই? ওঁদের দাম্পত্যসম্ভাষণ শেষ হতে হতে কাউন্টার বন্ধ হয়ে যাবে।
স্কার্ডন আর কোনমুখে বলে–তা কি পারি স্যার? উনি যখন যেখানে যাবেন তখন সেখানেই যে যাব আমি। সে বরং ভাব দেখায় যেন ভদ্রলোকের কথা আদৌ বুঝতে পারছে না। তা তো হতেই পারে–সে ফরাসি আর্টিস্ট, ইটালিয়ান ভাষা সে জানে না। পেছনের লোকটি তখন ওকে গোঁত্তা মেরে সরিয়ে দেয়। ভাষা না বুঝলেও গোঁত্তা সবাই বোঝে। স্কার্ডন সরে আসে। ভদ্রলোক তখন তার টিকিট কাটে। ইতিমধ্যে কথাবার্তা সেরে ব্রুনো ফিরে এল কাউন্টারে। বললো, চারখানা স্টকহমের টিকিট দিন। টুরিস্ট ক্লাস। আমার, স্ত্রীর আর বাচ্চাদের। আমারটা হবে রিটার্ন টিকিট।
হিসাব করে কাউন্টারের লোকটা বললে, সবশুদ্ধ ছয়শ দুই ডলার।
ব্রুনো তার ব্যাগ খুলে সাতখানা কড়কড়ে একশ ডলারের নোট বার করে। লোকটা বললে, দু ডলার খুচরো দিন।
ওয়ালেট হাতড়ে ব্রুনো বললে, দুঃখিত। খুচরো নেই।
কথাবার্তা আদ্যন্ত হচ্ছিল ইটালিয়ান ভাষায়। ফরাসি চিত্রকরটির বোঝার কথা নয়। কিন্তু সে মনে মনে হাসল। দুটি ব্যাপারে খুশি হয়েছে সে। প্রথমত, ব্রুনো নিজের টিকিট রিটার্ন কাটল। দ্বিতীয়ত, বেশ বোঝা যাচ্ছে সে কোনো সূত্র থেকে ডলার পাচ্ছে। অঢেল টাকার মালিক-আমেরিকান টুরিস্ট ছাড়া সচরাচর এমন একশ ডলারের করকরে নোট কেউ বার করে না। ভাঙানি আটানব্বই ডলার নিয়ে ব্রুনো চলে যেতেই স্কার্ডন এগিয়ে এল কাউন্টারে। টিকিট কাটল। স্টকহমের। একই দিনের। একই প্লেনের।
পয়লা সেপ্টেম্বর এস. এ. এস. প্লেনে মিউনিক-কোপেনহেগেন হয়ে সপরিবারে ব্রুনো এসে পৌঁছালো স্টকহমে। প্লেন থেকে নেমে এয়ার-টার্মিনালে এল ওরা। ছায়েবানুগত যথারীতি ফরাসি চিত্রকর ভদ্রলোকও। মালপত্রগুলি তখনও এসে পৌঁছায়নি। ব্রুনো ট্যাগ হাতে মালের জন্য প্রতীক্ষা করছে। স্কার্ডন ওর হাত থেকে হাত- তিনেক দূরে একটা বুকস্টলে দাঁড়িয়ে অন্যদিকে ফিরে সিগারেট খাচ্ছে আর ফরাসি ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছে। হঠাৎ একটা কথায় চমকে উঠল স্কার্ডন। ব্রুনোর বড় ছেলে ইটালিয়ান ভাষায় প্রশ্ন করল, মাম্মি! এটাই কি রাশিয়া!
ব্রুনো হঠাৎ ধমক দিয়ে উঠল, বকবক কর না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাক।
