কী জবাব দেবে বুঝে উঠতে পারে না ক্লাউস। চট করে সে উঠে দাঁড়ায়। হ্যাট-র্যাক থেকে টুপিটা নিয়ে বলল, চলি।
তারপর দরজা কাছ পর্যন্ত এগিয়ে বললে, তুমি আজ উত্তেজিত। না হলে আমিও মন খুলে দু-একটা কথা বলতাম।
শান্ত সমাহিত স্বরে রোনাটা বললে, কেন? আমাকে কি উত্তেজিত মনে হচ্ছে?
–হ্যাঁ। তুমি জোর করে তোমার উত্তেজনা ঢেকে রেখেছ।
-মোটেই নয়। তোমার কিছু বলার থাকলে স্বচ্ছন্দে বলতে পার। আমি প্রস্তুত।
ক্লাউস ফিরে এসে বসে তার চেয়ারে। বলে, সব কথা প্রফেসরকে খুলে বললে কেমন হয়?
–সব কথা মানে?
-তুমি তাকে ডিভোর্স করতে চাও। আমি তোমাকে বিবাহ করতে চাই। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো উঠে দাঁড়ায় রোনাটা। মুখখানা সাদা হয়ে যায় তার। ঠোঁট দুটো নড়ে ওঠে। তারপর সে অসীম বলে আত্মসম্বরণ করে। স্পষ্টভাবে বলে, এ কথা আর কোনোদিন উচ্চারণ কোরো না।
ধীরপদে চলে যাবার জন্যে পা বাড়ায়। ক্লাউস পিছন থেকে বলে, কারণটা বলে যাবে না?
দ্বারের কাছে দাঁড়িয়ে পড়ে রোনাটা। বলে, প্রয়োজন ছিল না। দশ বছর আগে কারণটা তুমিও বলেনি। তবে প্রশ্ন যখন করলে তখন আমি কারণটা জানাব। আমি মনে-প্রাণে রোমান ক্যাথলিক। বিবাহ আমার কাছে ইন্দ্রিয় ব্যভিচারের একটা পাসপোর্ট নয়। তুমি যা ভাবছ তা নয়। প্রফেসরকে আমি ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি–ঠিক যতটা আমার বাবাকে ভালোবাসতাম।
ক্লাউস আরও কিছু কথা বলতে চায়; কিন্তু তাকে থামিয়ে দেয় রোনাটা : আমার মনে হয়, এর পর তোমার এ বাড়িতে না আসাই মঙ্গল।
.
০৪.
হারওয়েলে ব্রুনো পন্টিকার্ভোর চাকরি শেষ পর্যন্ত হল না, প্রফেসর কার্লের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও। তবু একটা ব্যবস্থা হল, প্রফেসর কার্ল-এর সুপারিশেই। লিভারপুল ইনস্টিক্ট ওকে একটা ভালো চাকরির অফার দিল। পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রে নয়, পদার্থবিজ্ঞানীর মামুলি কাজ। তবে মাইনেটা ভালো। ব্রুনো এককথায় রাজি হল। ধন্যবাদ জানালো প্রফেসরকে। তৎক্ষণাৎ সে লিভারপুল কর্তৃপক্ষকে জানালো অনতিবিলম্বেই সে ওই চাকরিতে যোগ দেবে। তবে তার আগে সে একবার ইটালিতে যেতে চায়। মিলানে আছেন তার বৃদ্ধ পিতামাতা। যুদ্ধান্তে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি। ওই সঙ্গে সে একবার সুইডেনেও যেতে চায় সস্ত্রীক। সুইডেন-এর রাজধানী স্টকহম হচ্ছে ব্রুনোর শ্বশুরবাড়ি। সেখানে আছেন ফ্রাই পন্টিকোর্ভোর পিতা মিস্টার নর্ডব্লম এবং তাঁর স্ত্রী। দিন-পনেরোর ব্যাপার। এ ছাড়া সুইজারল্যান্ডের শ্যামনীতে একটি বিজ্ঞান-কংগ্রেস থেকে সে আমন্ত্রণ পেয়েছে। সেখানেও যেতে হবে ফেরার পথে। সব মিলিয়ে প্রায় তিন সপ্তাহ। লিভারপুল কর্তৃপক্ষ রাজি হলেন। চাকরিটা তারা মাসখানেক খালি রাখবেন। ব্রুনো কন্টিনেন্ট যাবার জন্য তৈরি হয়।
আর্নল্ড ইতিপূর্বেহ খবর পেয়েছে, ব্রুনো পন্টিকার্ভো একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো প্রত্যক্ষ অভিযোগ নেই। কোনো প্রমাণ নেই। ব্রুনো ন্যাচারালাইজড ব্রিটিশ প্রজা। ইটালিতে তার বাবা-মা এবং সুইডেনে শ্বশুর-শাশুড়ি আছেন। ইয়োরোপে ভ্রমণের পাসপোের্টও আছে তার, আছে ওইসব দেশের ভিসা। তাকে আটকানোর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তাছাড়া সে তো কিছু পালিয়ে যাচ্ছে না, যাচ্ছে মাত্র এক মাসের জন্য। তার টিকি বাঁধা আছে। লিভারপুলে। হুঁ হুঁ বাবা! চাকরি বলে কথা।
অধ্যাপক কার্ল ব্রুনোর জন্য একটি বিদায় ভোজের আয়োজন করলেন। ব্রুনো আপত্তি করেছিল। বলেছিল, আমি তো মাত্র এক মাসের জন্যে যাচ্ছি প্রফেসর। বিদায় ভোজ কীসের?
-তা কেন? তুমি তো হারওয়েলে আর ফিরছ না। ফিরছ লিভারপুলে।
–তা বটে।
এই বিদায় ভোজে ঘটল পর পর দুটো ঘটনা যাতে চঞ্চল হয়ে উঠল আর্নল্ড। প্রথম ঘটনা ঘটল টেনিস-কোর্টে।
ব্রুনো খুব ভালো টেনিস খেলত। য়ুনিভার্সিটিতে সে বহুবার কাপ-মেডেল পেয়েছে। এমনকি যুদ্ধের সময় কানাডাতে চক-রিভারে যখন অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনে চাকরি করত তখনও ব্যক্তিগত চ্যাম্পিয়নশিপে সে প্রথম হয়েছিল। বিদায় ভোজের সন্ধ্যায় খেলার আয়োজন হল। শেষ গেমটা খেললেন মিসেস সেলিগম্যান আর ব্রুনো। ব্রুনোই জিতল। প্যাভেলিয়নে ফেরার পথে–ব্রুনো হঠাৎ বললে, কে বলতে পারে, আবার হয়তো একদিন আমরা খেলব। সেদিন আপনি জিতবেন।
মিসেস সেলিগম্যান থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন। বলেন, মানে? আমরা তো আবার খেলব নিশ্চয়ই। একমাস পরেই। আপনি এমনভাবে বললেন কথাটা!
উচ্চৈঃস্বরে হেসে ওঠে ব্রুনো। সামলে নিয়ে বলে, এসব কথা একটু রোম্যান্টিক গলায় বললেই শুনতে ভালো লাগে না কি?
ততক্ষণে মিসেস সেলিগম্যানও হেসে ফেলেন।
দ্বিতীয় ঘটনা ঘটল রাত্রে খাবার সময়। সবাই যখন আনন্দ উৎসবে মগ্ন তখন রোনাটার হঠাৎ খেয়াল হল, হেলেনা খানাকামরায় নেই। রোনাটা একটু অবাক হয়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে বারান্দায়। সেখানেও হেলেনা নেই। একটু খোঁজ করতেই দেখা গেল হেলেনা নিজের ঘরে চুপ করে বসে আছে। তার চোখ দুটো ভেজা।
-তুমি এখানে?
মুহূর্তে হেলেনা নিজেকে সামলে নেয়। রুমালে মুখটা মুছে নিয়ে বললে, কিছু নয়, চল ওঘরে যাই।
ঘটনাটা সামান্য। তবুও অদ্ভুত। মিসেস ব্রুনো যাচ্ছে বেড়াতে-ইটালি আর সুইডেনে। তাহলে?
***
পঁচিশে জুলাই ওরা রওনা হয়ে গেল। ডানকার্ক হয়ে প্রথম যাবে সুইজারল্যান্ডে। সেখান থেকে ইটালি। ওরা যেদিন রওনা হয়ে গেল ঠিক তার পরের দিন, ছাব্বিশ তারিখে, আর্নল্ডের কাছে এসে পৌঁছালো একটা কেবলগ্রাম। সুদূর মার্কিন মুলুক থেকে। কোড মেসেজে এফ. বি. আই. স্কটল্যান্ড-ইয়ার্ডকে জানাচ্ছে : অনুমান করার যথেষ্ট কারণ দেখা যাচ্ছে যে, ব্রুনো পন্টিকার্ভোই আসলে ডগলাস। তাকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করুন। প্রমাণাদি পাঠাচ্ছি।
