রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত নাকি জবাবে হেসে বলেছিলেন, ফর য়োর ইনফরমেশন ম্যাডাম, জোসেফ স্তালিনের মাথাটাও জেলির মতো নয়।
রাদারফোর্ডকে লেখা কাপিজার শেষ চিঠিটায় (1933) ছিল একটা বিজ্ঞানোত্তর দার্শনিক তত্ত্ব : After all, we are only small particles of floating matter in a stream which we call Fate. All that we can manage is to deflect our tracks slightly and keep afloat–the stream governs us.
[যত যাই বলুন, আমরা প্রবহমান খরস্রোতে ভাসমান তৃণখণ্ড বইতো নই? ওই স্রোতটারই অপর নাম নিয়তি। বড় জোর খড়কুটোর মতো একটু এপাশ-ওপাশ সরে-নড়ে বেড়াতে পারি, কোনোক্রমে ভেসে থাকতে পারি–আমাদের গতি নিয়ন্ত্রিত হবে ওই স্রোতেরই নির্দেশে।]
এরপর রাদারফোর্ড যা করে বসলেন তা তার মতো আত্মভোলা বৈজ্ঞানিকের পক্ষেই শুধু সম্ভব। তিনি কাপিৎজার জন্য তৈরি সদ্যসমাপ্ত ল্যাবরেটারির সব যন্ত্রপাতি খুলে ফেললেন। বড় বড় ক্রেটে সমস্ত যন্ত্রপাতি ভরে পাঠিয়ে দিলেন মস্কোতে। রাশিয়ান সরকারকে লিখলেন–কাপিৎজার সঙ্গে কেমব্রিজ ল্যাবরেটারির অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক। এটা রাজনীতির কথা নয়, বিজ্ঞানের হিসাব! ও আপনারা বুঝবেন না। তাই কাপিজা যখন কেমব্রিজে আসতে পারল না, তখন কেমব্রিজই তার কাছে যাক।
এমনকি তিনি জাহাজে করে পাঠিয়ে দিলেন সেই পাথরের কুম্ভীর মূর্তিটাকেও।
মস্কোর সোনার খাঁচায় ময়না ‘রাধাকৃষ্ণ’ পড়েছিল কিনা পশ্চিম দুনিয়া সেকথা জানতে পারেনি।
এরপর লৌহ যবনিকার এপারে বহির্বিশ্বে কাপিৎজার কণ্ঠস্বর মাত্র একবার শোনা গিয়েছিল। 1946-এ। বিকিনি অ্যাটলে যখন আমেরিকা থার্মোনিউক্লিয়ার বোমার বিস্ফোরণ ঘটালো তখন কাপিৎজার একটা বাণী কেমন করে জানি লৌহ যবনিকা ভেদ করে এপারে আসে। কাপিৎজা বলেছিলেন :
“To speak about atomic energy in terms of atomic bomb is comparable with speaking about electricity in terms of electric chair.”
[পারমাণবিক শক্তির প্রয়োগ হিসাবে যাঁরা পারমাণবিক-বোমার কথাই শুধু চিন্তা করতে পারেন, তারা বোধকরি বিদ্যুৎ-শক্তির প্রয়োগ-হিসাবে শুধু ইলেকট্রিক চেয়ারের কথাই ভাবেন।]
***
অনেক পরে জানা গেছে কাপিৎজা সোভিয়েত সরকারের নির্দেশে বেশ কিছুদিন তার বিজ্ঞানমন্দিরে কাজ করেন। সরকারের সঙ্গে তাঁর প্রথম বিরোধ বাধল যখন নির্দেশ এল এবার পরমাণু-বোমা বানাতে হবে। বিরোধ ঘনীভূত হল; কারণ কাপিৎজা অস্বীকৃত হলেন। তার চাকরি যায়। ওই বিজ্ঞানমন্দিরে প্রবেশের অধিকার খোয়ালেন কাপিৎজা। এরপর গৃহবন্দীর জীবন। তবু স্তালিনের প্রস্তাবে স্বীকৃত হলেন না তিনি। তাঁর সাফ জবাব–এজন্য তার গুরু রাদারফোর্ড অথবা গুরুভাই চ্যাডউইক পরমাণুর হৃদয় বিদীর্ণ করেননি। বলেছিলেন, ওই উদ্দেশ্যে পরমাণুর হৃদয় বিদীর্ণ করার আগে আমি নিজের হৃৎপিণ্ডটা বিদীর্ণ করব।
স্তালিনের আদেশে কাপিৎজাকে নির্বাসনে পাঠানো হল। টেস্টটিউব, ব্যুরেট আর সাইক্লোট্রোন নিয়ে যাঁর জীবন কেটেছে এবার তার হাতে তুলে দেওয়া হল গাইতা আর হাতুড়ি। সশ্রম কারাদণ্ড। সাইবেরিয়ায়।
কাপিৎজার সমাধি কোথায় কেউ জানে না।
..দীর্ঘ কাহিনি শেষ করে প্রফেসর কার্ল বলেন, আই হেট দিজ কম্যুনিস্ট। আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ তুমি কিয়েল-এ চলে যেও না। তার চেয়ে অনেক-অনেক ভালো হারওয়েলের এই তিন নম্বর চাকরি। এখানে আমরা মানুষের কল্যাণের জন্য প্রাণপাত করছি। স্যার জন তো এ বছরেই অবসর নিচ্ছেন। আমি আর কদিন? হয়তো তিন-চার বছরের ভিতরেই তুমি এখানকার কর্ণধার হয়ে বসবে। তা ছাড়া
বাধা দিয়ে ক্লাউস বলে, প্রফেসর, আপনি কাপিৎজার সম্বন্ধে এত খবর পেলেন কোথায়?
প্রফেসর কার্ল একটু বিব্রত হয়ে বলেন, সে যেখান থেকেই পাই।
তবু বলুন না?
–না। বলায় বাধা আছে। তবে যা বলছি তা নিছক সত্য।
–আপনি শুনেছেন একপক্ষের কথা। সোভিয়েত-বিরোধীদের প্রচার।
–না না। আই হ্যাভ হার্ড ইট ফ্রম দ্য হর্সেস মাউথ। খাঁটি লোকের মুখ থেকে।
–কিন্তু কে সেই খাঁটি লোক?
–বলছি তো–তা বলা চলে না তোমাকে।–প্রায় ধমকের সুরে বলেন উনি।
ক্লাউস চুপ করে যায়। প্রফেসরও একটু বিব্রত হয়ে পড়েন। একেবারে অন্য সুরে বলেন, তার চেয়ে তুমি তোমার বোনপো বব-কে নিয়ে এস। সে আমাদের পরিবারেই থাকবে। রোনাটার একটা অবলম্বন হবে। আর তাছাড়া…
আবার চুপ করে যান। ইতস্তত করেন। শেষ পর্যন্ত মনের দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বলেন, তুমি চলে গেলে ও একেবারে মুষড়ে পড়বে। ও তোমাকে খুব ভালোবাসে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই কফির ট্রে হাতে নিয়ে এ ঘরে আসছিল রোনাটা। কথাটা কানে গেল তার। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। আর এ ঘরে এল না। পর্দা সরিয়ে একটু পরে রোনাটার মেড-সার্ভেন্ট ডরোথি কফির ট্রে নিয়ে প্রবেশ করল। সেদিন আর রোনাটা ওদের সামনে আদৌ এসে দাঁড়াতে পারেনি।
কিন্তু দিনতিনেক পরে সে এসে দাঁড়ালো ফুকস-এর মুখোমুখি। জনান্তিকে। বলল, প্লিজ ক্লাউস, তুমি ওই চাকরি নিয়ে কিয়েল চলে যাও।
ক্লাউস অবাক হয়। বলে, কেন বলতো? তোমার গরজ কী?
রোনাটার কণ্ঠস্বর একটুও কাঁপল না। সে স্পষ্ট গলায় পরিষ্কার ভাষায় বললে, তুমি বুঝতে পার না? আমি আর সহ্য করতে পারছি না। তোমার দূরে চলে যাওয়াই মঙ্গল। তোমাকে আমি ভুলতে চাই। তোমাকে…তোমাকে আর সহ্য করতে পারছি না আমি।
