পিতৃদেবের চিঠিখানি নিয়ে সে গিয়ে দেখা করল হারওয়েলের সর্বময় কর্তা স্যার জনের সঙ্গে। স্যার জন বাস্তববাদী। সোজা কথার মানুষ। বললেন, হারওয়েলের তিন-নম্বরের চাকরির চেয়ে নিঃসন্দেহে কিয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের পদ আকর্ষণীয়। কিন্তু আরও একটা প্রশ্ন আছে। তুমি কি নিজের ন্যাশনালিটি বদলাতে প্রস্তুত? কিয়েল বর্তমানে রাশিয়ান গভর্নমেন্টের এক্তিয়ারে। কম্যুনিজমকে মেনে নিতে পারবে তো?
ভেবে দেখি–বলে ফিরে এসেছিল ক্লাউস।
এরপর দেখা করেছিল প্রফেসর কার্ল-এর সঙ্গে। রোনাটা খুব খুশি হয়েছে এমন ভাব দেখালো। বললে, নিশ্চয়ই নেবে এ চাকরি। প্যাস্টর ফুকসকে এই শেষ সময়ে কে দেখবে, তুমি ছাড়া? তাছাড়া ব-এর কথাটাও ভাবা দরকার। কিয়েলে গিয়ে সংসার পেতে বস। আর একটা কথা। বিয়ে কর এবার। তাহলে বব-এর একটা হিল্লে হয়ে যায়।
–আর আমি যদি বাবাকে লিখি ববকে এখানে পাঠিয়ে দিতে?
–তুমি মানুষ করতে পারবে? একা?
–কেন? তুমি তো আছ? ও তোমার কাছে থাকবে।
–দেবে আমাকে?-উৎসাহ উপচে পড়ে রোনাটার দু-চোখে। তারপরেই হঠাৎ সে কেমন বদলে যায়। বলে, কী স্বার্থপরের মতো কথা বলছি। তা কেন? তুমিই বরং কিয়েলে চলে যাও। সংসারী হও।
–প্রফেসর কার্ল কী পরামর্শ দেন?–ক্লাউস জিজ্ঞাসা করে।
–আমার আদৌ এতে সম্মতি নেই–প্রফেসর কার্ল-এর সাফ জবাব।
–কেন?
–সেটা পরে তোমাকে বলব।
রোনাটা চট করে উঠে দাঁড়ায়। বলে, পরে কেন? এখনই বল; আমি চলে যাচ্ছি।
-না না, তা বলিনি আমি।–প্রফেসর বিব্রত হয়ে ওঠেন।
রোনাটাও হেসে হালকা করে পরিবেশটা। বলে, না, রাগ করে উঠে যাচ্ছি না। কফি করে আনি।
প্রফেসর কার্ল তৎক্ষণাৎ বলেন, ক্লাউস, তুমি ডক্টর কাপিৎজার নাম শুনেছ? ফুঁ হেসে বলে, স্যার দুনিয়ার এমন কোনো নিউক্লিয়ার ফিজিসিস্ট আছে যে, লর্ড রাদারফোর্ডের শ্রেষ্ঠ ছাত্রটির নাম শোনেনি।
–তিনি এখন কোথায় জান?
–ঠিক জানি না। আন্দাজ করতে পারি। মস্কো অথবা লেনিনগ্রাডে–কিয়েলেও হতে পারেন। ডক্টর কাপিৎজা আজকের রাশিয়ার সবচেয়ে বড় নিউক্লিয়ার ফিজিসিস্ট।
তোমার দ্বিতীয় বক্তব্যটা ঠিক, প্রথমটা নয়। ডক্টর কাপিৎজা বর্তমানে আছেন সাইবেরিয়ায়। বন্দীজীবন যাপন করছেন তিনি। তার অপরাধ, স্তালিনের হুকুমে তিনি অ্যাটম-বোমা বানাতে অস্বীকার করেছিলেন। বলেছিলেন এজন্য লর্ড রাদারফোর্ড প্রোটন আবিষ্কার করেননি।
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় ক্লাউস। অস্ফুটে বলে, আমি বিশ্বাস করি না। কী করে জানলেন?
-কী করে জানলাম সেটা বলব না। তবে আমার কথা অভ্রান্ত সত্য বলে মেনে নাও।
ডক্টর কাপিৎজা ছিলেন লর্ড রাদারফোর্ড-এর ডান হাত। কেমব্রিজ বীক্ষণাগারে রাদারফোর্ড-এর তখন তিনজন শিষ্য প্রতিভার স্বাক্ষরে ভাস্বর–কাপিজা, চ্যাডউইক আর অটো কার্ল। সে হিসাবে প্রফেসর কার্ল হচ্ছেন কাপিজার সতীর্থ। এর মধ্যে কাপিজার সম্ভাবনাই ছিল সবচেয়ে বেশি। যদিও বাস্তবে চ্যাডউইকই সবচেয়ে নাম করেছেন–নিউট্রন আবিষ্কার করে নোবেল লরিয়েট হয়েছেন।
কাপিৎজা ছিলেন প্রাণবন্ত, উচ্ছল! রাদারফোর্ড-এর সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র। রাদারফোর্ড ছাত্রকে একটি সুন্দর ল্যাবরেটরি বানিয়ে দিয়েছিলেন। কাপিৎজা সেই ল্যাবরেটারির প্রবেশপথে বসিয়েছিলেন একটি মর্মরমূর্তি–বিখ্যাত ইংরেজ ভাস্কর এরিক গিলকে দিয়ে। একটি কুমিরের মূর্তি! কুমির কেন? সাংবাদিকরা প্রশ্ন করল দ্বারোদ্বাটনের দিন। কাপিৎজা গম্ভীর হয়ে বললেন–’কুমীর কখনও ঘাড় ঘোরাতে পারে না। সে সিধে সামনের দিকে চলে। সেই হচ্ছে আমার বিজ্ঞান-সাধনার প্রতীক।‘
সাংবাদিকরা অবাক হয়। প্রফেসর রাদারফোর্ড তাদের জনান্তিকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন–আমার ছাত্রটির মাথায় দু-চারটে স্ক্রু আলগা।
এবার সাংবাদিকেরা হেসেছিল।
হেসেছিল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও। মুখ লুকিয়ে। তারা জানত, জনান্তিকে কাপিৎজা রাদারফোর্ড-এর নতুন নামকরণ করেছে-’কুমীর-সাহেব। রাদারফোর্ড তা জানতেন না, কিন্তু ল্যাবরেটারির বেয়ারাটা পর্যন্ত জানত এ গুপ্তরহস্য। কাপিজা তাই তার বিজ্ঞানমন্দিরে বসিয়েছে কুমীরের মূর্তি-গুরুদক্ষিণা।
নতুন ল্যাবরেটারির উদ্বোধন হল 1933-এ। ঠিক তার পরেই রাশিয়া থেকে একটি আমন্ত্রণ পেয়ে কাপিৎজা গেল স্বদেশে। মক্সো বিজ্ঞান-অধিবেশনে যোগ দিতে। সেটাই হল ওর সর্বনাশের সূত্রপাত। ফিরে আসতে দেওয়া হলনা কাপিৎজাকে। স্তালিন জানালেন, অতঃপর ওকে রাশিয়াতে থেকেই বিজ্ঞানচর্চা করতে হবে। কাপিজ্জা নিজের জন্মভূমিতে অন্তরীণ হল। গোপনে সে খবর পাঠালো রাদারফোর্ডের কাছে–জানালো, সে কেমব্রিজে ফিরে আসতে চায়। তার নতুন ল্যাবরেটারিতে। লর্ড রাদারফোর্ড মস্কোর কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি লিখলেন। তার ছাত্রকে ফিরে আসতে দেবার অনুমতি দেওয়া হোক। রাশিয়ান সরকার প্রত্যুত্তরে লিখল-ইংল্যান্ডের পক্ষে একথা লেখা খুবই স্বাভাবিক। তারা খুশি হবে কাপিৎজা যদি কেমব্রিজে গবেষণা করেন। অনুরূপভাবে আমরাও খুশি হব, যদি লর্ড রাদারফোর্ড মস্কোতে এসে গবেষণা করেন।
রাদারফোর্ড এরপর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বল্ডউইনের দ্বারস্থ হলেন। লর্ড রাদারফোর্ডের অনুরোধে বল্ডউইন সরকারি পর্যায়ে এ অনুরোধ জানালেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। কাপিৎজার এক আত্মীয়া লন্ডনে সোভিয়েত এম্বাসিতে গিয়ে স্বয়ং অ্যাম্বাসাডারকে নাকি বলেছিলেন, এভাবে ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাপিজাকে আপনারা কিছুতেই আটকে রাখতে পারবেন না। ওর মাথা পাথরের মতো শক্ত। বুঝেছেন?
