-বেশ। জিজ্ঞাসিত না হওয়া পর্যন্ত আমি এ-কথা তাকে জানাব না।
–ধন্যবাদ।
এতদিনে একটা সমস্যার সমাধান হল ক্লাউস ফুকস-এর : কেন ওর মনে হত একজোড়া অদৃশ্য চোখ ওদের দিবারাত্র পাহারা দিয়ে চলেছে। অদৃশ্য চোখের শিকারী সে নয়, রোনাটা নয়–প্রফেসর অটো কার্ল!
***
পরদিন প্রফেসর কার্ল-এর বাসায় গিয়ে আলাপ হল আর একটি পরিবারের সঙ্গে। ডক্টর ব্রুনো পন্টিকার্ভো। প্রফেসর কার্ল-এর বন্ধু-বন্ধু ঠিক নয়, বয়সে অনেক ছোটো। ক্লাউস-এর চেয়েও দু বছরের ছোটো। সে সপরিবারে এসে উঠেছে প্রফেসর কার্ল-এর বাসায় অতিথি হয়ে। নামকরা নিউক্লিয়ার ফিজিসিস্ট। প্রফেসর কার্ল অত্যন্ত স্নেহ করেন তাকে। হারওয়েলে তার যাতে একটি চাকরি হয় তার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। ক্লাউস থাকে ব্যাচিলার্স ডর্মিটারিতে, কিন্তু প্রফেসর কার্ল পাঁচ-কামরার বাংলো পেয়েছেন। সংসারে তো কুল্লে দুটি প্রাণী–স্বামী-স্ত্রী। তাই বাকি দুখানা ঘর ছেড়ে দিয়েছেন ব্রুনো পরিবারকে।
ব্রুনো ইটালিয়ান। জন্ম পিসায়। বৃহৎ পরিবারের সন্তান। সাত-আটটি ভাইবোন। তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সারা পৃথিবীতে। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। প্রিয়পাত্র ছিল এনরিকো ফের্মির। তার অধীনে গবেষণা করেছে রোমে থাকতে। সেখান থেকেই ডক্টরেট করে। পরে চলে আসে পারিতে। সেখানে জোলিও কুরির গবেষণাগারে রিসার্চ করে। এখানেই সে বিবাহ করে–হেলেনকে। তার কুমারী জীবনের নাম হেলেন মেরিয়ান। সুইডেনে বাড়ি। স্টকহমে ছিল তার বাপ-মা। ওদের তিনটি সন্তান–জিল, টিটো আর অ্যান্টোনিও। অ্যান্টোনিও সবার ছোটো। বছরদেড়েকের ফুটফুটে বাচ্চা। তিনটি বাচ্চাকে পেয়ে রোনাটার বঞ্চিত মাতৃত্ব যেন এতদিনে একটা অবলম্বন খুঁজে পেয়েছে। হেলেনকে সে সব দায়-দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছে। তিন বাচ্চা নিয়ে মেতে আছে রোনাটা।
ডিনারের আসর জমিয়ে রাখল ব্রুনো একাই। নানান গল্পে, চুটকি রসিকতায়। রোনাটা বাচ্চাদের নিয়ে মেতে আছে, ক্লাউস-এর সঙ্গে ভালো করে কথা বলার সময়ই যেন নেই।
এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন দুজন পরিচিত ব্যক্তি-সস্ত্রীক ডক্টর স্কট এবং সিকিউরিটি অফিসার আর্নল্ড। খানাপিনা মিটতে বেশ রাত হল। বিদায় নিয়ে বের হবার সময় আর্নল্ড বলল, ডক্টর ফুকস্ আসুন আমার গাড়িতে। আপনাকে পৌঁছে দিয়ে যাই।
–চলুন।
গাড়িতে উঠে আর্নল্ড বললে, কেমন লাগল ওই ব্রুনো পরিবারকে?
–চমৎকার। ডক্টর ব্রুনো তো খুবই অমায়িক লোক। খুব হাসিখুশি, আমুদে। ভদ্রলোক এখানে চাকরি পেলে আমাদের জীবনযাত্রাটাই বদলে যাবে।
-তা হবার নয় ডক্টর। খুব সম্ভব ডক্টর ব্রুনো এখানে চাকরি পাবেন না।
–কেন? উনি তো নিজের বিষয়ে অত্যন্ত পণ্ডিত।
–পাণ্ডিত্যের জন্য আটকাবে না। ওঁর সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স পাওয়া শক্ত।
ক্লাউস ধমক দিয়ে ওঠে, ওই আপনাদের এক বাতিক। সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি। সবাইকে শুধু সন্দেহ করেই জীবনটা গেল আপনাদের
-কী করব বলুন? এটাই তো আমাদের চাকরি। ডক্টর ব্রুনোকে চাকরি দেওয়ার মানে হয়তো আপনার মতো একজন নিরীহ বৈজ্ঞানিকের প্রাণ বিপন্ন করা।
–আমার? কেন, আমার প্রাণ বিপন্ন হতে যাবে কোন দুঃখে?
ধরুন দূর থেকে কেউ হয়তো একটা রাইফেল তাক করল ডক্টর ব্রুনোকে বধ করতে। লং রেঞ্জের রাইফেল। এবং গুলিটা আপনার সিটের আরও চোদ্দো ইঞ্চি ডাইনে সরে এসে বিধল। আপনাকে বাঁচাতে পারব তাহলে?
স্তম্ভিত হয়ে গেল ক্লাউস। বাক্যস্ফূর্তি হল না তার। আর্নল্ড নিজেই হেসে বলল, কই, নামুন এবার। আপনার বাসায় এসে গেছেন যে।
.
০৩.
ওই ঘটনার মাসখানেক পরে হঠাৎ মুক্তিপথের সন্ধান পেল ক্লাউস ফুকস। নতুন করে বাঁচবার একটা সম্ভাবনা দেখা দিল আচমকা। ওর বাবা প্যাস্টর এমিল ফুকস্ ওকে কিয়েল থেকে হঠাৎ একটা চিঠি লিখে এই নূতন জীবনের ইঙ্গিত পাঠিয়েছেন। ডক্টর এমিল ফুকসের বয়স তখন আশির কাছাকাছি। যুদ্ধ চলার সময় তিনি দীর্ঘদিন নাৎসি বন্দীশিবিরে কাটিয়েছেন। যুদ্ধান্তে মুক্তি পেয়ে চলে গেছেন কিয়েল-এ। এখন সেখানে চার্চের যাজক তিনি। এই কিয়েল-এই একসময় পড়ত ক্লাউস। বৃদ্ধ চিঠিতে জানিয়েছেন, কিয়েল বিশ্ববিদ্যালয় ডক্টর ক্লাউস ফুকে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপকপদে বরণ করতে ইচ্ছুক। সে যদি তার বর্তমান চাকরি ছেড়ে দেয় এবং ন্যাশনালিটি পরিবর্তন করতে রাজি থাকে তবে এই বৃদ্ধ বয়সে তিনি পুত্রের কাছাকাছি থাকতে পারেন।
ক্লাউসের জীবনে ওই বৃদ্ধের অবদান অসামান্য। এই দুনিয়ায় সে যে-কজন মহাপুরুষকে শ্রদ্ধা করে তার অন্যতম তার জনক ওই পাদরি ফুক। সারা জীবন তিনি সংগ্রাম করে গিয়েছেন। একা হাতে। নাৎসি অত্যাচারের চুড়ান্ত হয়েছিল ওদের পরিবারে–যদিও ওরা ইহুদি ছিল না। ক্লাউসের মা সে অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন, ক্লাউসের ছোটোবোনও আত্মহত্যা করে। ক্লাউসের দাদা নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। তবু ঈশ্বরে বিশ্বাস হারাননি বৃদ্ধ। আজীবন একা হাতে লড়াই করে গেছেন। ক্লাউস নিজে জার্মানি থেকে পালিয়ে আসায় বৃদ্ধকে কোনোভাবেই সাহায্য করতে পারেনি। তাই বৃদ্ধ পিতার আহ্বানে সে বিচলিত হয়ে উঠল। বৃদ্ধ অবশ্য কিয়েলে একা থাকেন। মানুষ করেছেন ওঁর মা-হারা একমাত্র নাতিটিকে। ও যদি কিয়েলে গিয়ে অধ্যাপনা শুরু করে, সংসার পাতে, তাহলে ওই নাবালকটিরও ব্যবস্থা হয়। এ বিষয়েও ওই বৃদ্ধটি বিচলিত।
