-হারওয়েলেই ফিরব। আপনি এখানে?
-ওয়েম্বেলেতে গিয়েছিলাম। জি. ই. সি. কোম্পানিতে। কাজ মিটে গেল, এখন ফিরে যাচ্ছিলাম।
প্রফেসর কার্ল গাড়ি নিয়ে এসেছিলেন। নিজের গাড়ি। এখানে এসে কিনেছেন। নিজেই ড্রাইভ করছেন। ফুকস্ উঠে বসল ওঁর পাশে। মালপত্র তুলে দিল পিছনের সিটে।
–প্যারাম্বুলেটার কী হবে হে? তুমি তো ব্যাচিলার।
–ওটা মিসেস স্কটের অর্ডার। ডাক্তারবাবুর বাচ্চার জন্য।
–বেশ আছ তুমি। এবার নিজের ল্যাজটা কাটো। আমাদের দলে নাম লেখাও।
ক্লাউস হাসল। জবাব দিল না।
শহর ছেড়ে শহরতলীতে এল ওরা। ক্রমে অক্সফোর্ডের দিকে ফাঁকা রাস্তায় পড়ল। বেলা তখন পাঁচটা। গ্রীষ্মকাল। সূর্য অস্ত যেতে তখনও ঘণ্টাচারেক। বেশ রোদ আছে। ফাঁকা অ্যাসফল্টের রাস্তায় পড়ে স্পিড বাড়ালেন প্রফেসর। বললেন, অনেকদিন আমার বাড়ি আসছ না তো। কেন?
কী বলবে ক্লাউস? প্রফেসর কার্ল-এর বাড়ি তাকে টানে; কিন্তু ইচ্ছে করেই সে এড়িয়ে চলে। রোনাটার মুখোমুখি দাঁড়ালেই আজকাল সে বিবেকের দংশন অনুভব করে। রোনাটা দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। বেশ রোগা হয়ে গিয়েছে। মানসিক অবসাদে ভুগছে যেন। দেখলেই মনে হয়, মেয়েটা অসুখী। ওর নীরবতাকে পাত্তা না দিয়ে প্রফেসর আবার বলেন, সময় পেলে এস। মাঝে মাঝে তোমাকে দেখলে রোনাটা তবু একটু খুশি হয়।
কেমন আছে সে আজকাল?-মামুলি প্রশ্ন।
–ভালো নেই ক্লাউস। মাঝে মাঝে ফিট হচ্ছে আজকাল।
–ফিট হচ্ছে! কেন? ডক্টর স্কট দেখেছেন? কী বলছেন তিনি?
–বলছেন মানসিক অসুখ। সাইকিয়াট্রিস্টকে দিয়ে দেখাতে বলছেন।
–আশ্চর্য তো। এ খবর তো জানতাম না।
–এস একদিন, কেমন? কালই এস না। কাল তো রবিবার। আমার ওখানে ডিনার খাবে। ডক্টর ব্রুনোর সঙ্গেও আলাপ হয়ে যাবে।
–ডক্টর ব্রুনো কে?
–কাল এস। আলাপ করিয়ে দেব।
***
সূর্য পশ্চিম দিগ্বলয়ে হেলে পড়েছে। সড়ক জনমানব শূন্য। অক্সফোর্ড রোডে ওরা তখন গেরার্ড ক্রস আর বেকন্সফিল্ডের মাঝামাঝি। সন্ধ্যা তখন ঠিক ছটা বেজে সাত মিনিট। কোথাও কিছু নেই হঠাৎ কী একটা বস্তু এসে প্রচণ্ড আঘাত করল সামনের উইন্ডস্ক্রিনে। চৌচির হয়ে ফেটে গেল সেটা। গাড়ি তখন ঘণ্টায় ষাট কিলোমিটার বেগে যাচ্ছিল। ক্লাউস ফুকস্ এ আকস্মিক ঘটনায় একেবারে ভয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে যেন। প্রফেসর কিন্তু নির্বিকারভাবে মাইলতিনেক অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে এলেন। তারপর গাড়ি থেকে নেমে ভাঙা উইন্ডস্ক্রিনটা পরীক্ষা করে বললেন–ইট মেরেছে কেউ।
ততক্ষণে অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে ক্লাউস। ইতিমধ্যে সে লক্ষ্য করে দেখেছে, ড্রাইভার আর তার সিটের মাঝামাঝি খাড়াপিঠ গদির মাঝখানে একটা নিটোল ছোট্ট গর্ত হয়েছে। তার ভিতর আঙুল চালিয়ে সে উদ্ধার করে আনল ছোট্ট একটা সীসার গোলক। বললে, না। একটা রাইফেল থেকে ছোঁড়া হয়েছে এটা।
প্রফেসর কার্ল গুলিটাকে হাতে নিয়ে পরীক্ষা করলেন অনেকক্ষণ ধরে। তারপর বললেন, ঠিক বলেছ। এটা রাইফেলের গুলি বলেই মনে হচ্ছে। নিশ্চয় কোনো শিকারীর কাণ্ড। খরগোশ মারতে গিয়ে আমাদের শেষ করে ফেলেছিল একেবারে।
পাহাড়ের ওপরে চারিদিকে তাকিয়ে দেখেন। খুঁজতে থাকেন শিকারীকে।
ক্লাউস বললে, বুলেটটা দিন। ওটা আর্নল্ডকে দেখাতে হবে।
-পাগল। ঘুণাক্ষরেও এ-কথা ওকে বোলো না। বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা। আমাদের ধরে টানাটানি শুরু করবে। নাও ওঠ। চল, ফেরা যাক।
ফুকস গাড়িতে ওঠে না। বলে, প্রফেসর, আপনি একটা কথা খেয়াল করছেন না। এখানে বাঘ, হরিণ বা বাইসন নেই। খরগোশ মারতে শিকারীরা এ অঞ্চলে আসে বটে, কিন্তু খরগোশ শিকারে কেউ এ জাতীয় বুলেট ব্যবহার করে না।
ভ্রূদুটি কুঁচকে যায় প্রফেসর কার্লের। গম্ভীর হয়ে বলেন–কী বলতে চাইছ তুমি?
–আমি বলতে চাইছি, কেউ আপনাকে অথবা আমাকে হত্যা করবার উদ্দেশ্য নিয়ে একটা রাইফেল থেকে এটা ফায়ার করেছে। খবরটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখনই গিয়ে আমাদের আর্নল্ডকে সব কথা বলতে হবে।
দু-এক মিনিট চুপ করে বসে থাকেন প্রফেসর। তারপর গম্ভীরভাবে বলেন, আমার সেটা ইচ্ছে নয়।
–আমি এক শর্তে ব্যাপারটা গোপন রাখতে রাজি আছি।
চমকে মুখ তুলে ওর দিকে তাকালেন প্রফেসর কার্ল-কী শর্তে?
–আপনি যদি স্বীকার করেন, আমাকে নয়–আপনাকে গুলি করতেই হত্যাকারী গুলিটা ছুঁড়েছে।
-বাঃ। তা কেমন করে জানব আমি?
–আপনি জানতেন। না হলে উইন্ডস্ক্রিনটা চুরমার হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আপনি ব্রেক কষতেন। এমন দশ মিনিট পাগলের মতো ড্রাইভ করে এসে তিন মাইল দূরে গাড়ি দাঁড় করিয়ে পাহাড়ের ওপর শিকারীকে খুঁজতেন না।
মুখটা সাদা হয়ে গেলো প্রফেসর কার্লের। জবাব দিতে পারলেন না তিনি।
–দ্বিতীয়ত, ব্যাখ্যার প্রয়োজন ছিল না-রাইফেল দিয়ে এমন বুলেটে যে খরগোশ শিকার করা হয় না, তা আপনারও জানা ছিল। এবং তৃতীয়ত, আমি ঘটনাচক্রে এ গাড়িতে উঠেছি। হত্যাকারী অনেক আগে থেকেই এখানে আপনার পথ চেয়ে বসে আছে। আমি যে এ-গাড়িতে ফিরব-তা সে আদৌ জানত না। জানতে পারে না।
আবার অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকলেন প্রফেসর কার্ল। তারপর হঠাৎ মুখ তুলে বললেন, ডক্টর ফুক। প্রত্যেকের জীবনেই এমন কিছু অধ্যায় থাকে যা অন্যকে বলা যায় না। আমি স্বীকার করছি–আমাকে হত্যা করবার জন্যই রাইফেলধারী এ কাজ করেছে। কিন্তু আমি চাই না সেটা উইং কমান্ডার আর্নল্ড জানতে পারুক। সময় হলেই আমি তাকে বলব। কথা দাও, তুমি নিজে থেকে কিছু বলবে না?
