এবারও কোনো জবাব এল না।
ক্লাউস ক্রমশ ভুলে গেল মেয়েটিকে। তারপর রোনাটার সঙ্গে ওর দেখা হল সুদূর সাগরপারের দেশে। আমেরিকায়। লস অ্যালামসে। ততদিনে রোনাটা হয়েছে মিসেস কার্ল। একটি সন্তানের জননী। দুর্ভাগ্যক্রমে সন্তানটি বাঁচেনি। তাকে চোখেই দেখেনি ক্লাউস। দেখেছে ফটো। অসংখ্য ফটো। একটা গোটা অ্যালবাম ভরা ছিল অ্যালিসের ছবিতে। রঙিন ছবি। সদ্যোজাত অবস্থা থেকে তার সংক্ষিপ্ত তিন-বছরের জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত। প্রফেসর কার্ল-এর ছিল ফটো তোলার বাতিক। রঙিন ছবিও তুলেছেন অনেক। মুভি ক্যামেরাতেও। তাই চোখে না। দেখলেও রোনাটার কন্যা অ্যালিসকে ক্লাউস ভালোভাবেই চেনে। মেয়েটা রোনাটার মতো দেখতে হয়নি মোটেই। রোনাটা ‘ব্লন্ডি’–সোনার বরণ তার। মাথাভরা চুল, রোনাটার মুখটা টিকলো–মেয়েটি ছিল ‘ব্রুনেট’; তার মুখটাও গোলগাল।
রোনাটার চেয়ে তার স্বামী বাইশ বছরের বড়। এমন বিবাহে রোনাটা যে জীবনে সুখী হয়নি তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এমন অসম বয়সের পুরুষকে কেন পছন্দ করল রোনাটা? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে পায়নি ক্লাউস। জিজ্ঞাসাও করা যায় না এ কথা। প্রফেসর কার্ল মহাজ্ঞানী-অধ্যাপক অথবা পণ্ডিত হিসাবে তাকে যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন করবে; কিন্তু পঁচিশ বছরের একটি মেয়ে তার কোন্ গুণে অভিভূত হয়ে স্বামী হিসাবে তাকে নির্বাচন করল?
তাই আজ এতদিন পরে সেই মেয়েটির চোখের সামনেই সংসারী হতে কেমন যেন অস্বোয়াস্তি বোধ করে ক্লাউস। বান্ধবী তার হয়েছে অনেক। তার রূপ, যৌবন এবং রোজগার দেখে অনেক মেয়েই উৎসাহ বোধ করছে। ও নিজেই কেমন যেন অপরাধী বোধ করে তাতে। মদের মাত্রাটা বাড়িয়ে দেয় শুধু।
হারওয়েলে এসে আরও একটা অনুভূতি হয়েছে। তার মনে হয়, সর্বদাই যেন একজোড়া অদৃশ্য চোখ লক্ষ্য করছে ওকে–ওকে নয়, ওদের। প্রফেসর কার্ল, রোনাটা আর ক্লাউসকে ক্রমাগত লক্ষ্য করে যাচ্ছে কেউ। প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই, কিন্তু সর্বদাই যেন এক অদৃশ্য সন্ধানীর দৃষ্টির শিকার হয়ে রয়েছে ওরা। কেন এমন মনে হয় ওর? রোনাটার প্রতি তার, অথবা তার প্রতি রোনাটার অন্তরে যে গোপন অনুভূতি আছে সেটাই কি আবিষ্কার করতে চায় ওই অদৃশ্য গোয়েন্দা চোখজোড়া? স্যোসাল স্ক্যান্ডাল? বুঝে উঠতে পারে না। শেষ পর্যন্ত একদিন সে মরিয়া হয়ে এসে হাজির হল হেনরি আর্নল্ডের দরবারে। খুলে বললে তার ওই অদ্ভুত অনুভূতির কথা। সব কথা শুনে হো-হো করে হেসে উঠল আর্নল্ড। বললে,–না না, ডক্টর ফুকস, আমি আপনার পেছনে কোনো গোয়েন্দা লাগাইনি। বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা। সুন্দরী মিসেস কার্ল এবং যৌবনদীপ্ত প্রফেসর ফুকস্ যে পরস্পরকে কী চোখে দেখেন, তা আমার ভালোই জানা আছে। এবং এ কথাও জানি যে, মিসেস রোনাটা কার্লের প্রাকবিবাহ জীবনের বন্ধু ছিলেন আপনি। নিশ্চিত থাকুন ডক্টর ফুকস, আপনাকে কোনো সামাজিক কেলেঙ্কারির মধ্যে ফেলবার শুভ উদ্দেশ্য আমার আদৌ নেই।
ডক্টর ফুকস্ রাঙিয়ে ওঠে। বলে, না না, আপনার বিরুদ্ধে আমা? কোনো অভিযোগ নেই। আপনি গোয়েন্দা লাগিয়েছেন এ কথাও বলছি না। কি আমার এমন মনে হচ্ছে কেন?
এর জবাবে হেনরি আর্নল্ড হ্যামলেট থেকে একটি উদ্ধৃতি শুনিছিলেন— ডক্টর অফ ফিলসফি তার দর্শনের মাধ্যমে যে স্বপ্ন দেখতে অক্ষম তাও নাকি দুনিয়ায় সম্ভব।
আদ্যোপান্ত কিছু বোঝা যায় না। উঠে আসছিল ক্লাউস। তাকে আবার ফিরে ডাকল আর্নল্ড, বাই দ্য ওয়ে ডক্টর, এই ফটোগুলো দেখুন তো। এদের কাউকে চেনেন?
খান তিন-চার ফটো বার করে দেখায়। ক্লাউস ছবিগুলো উল্টেপাল্টে দেখে। আর্নল্ড বলে, এঁদের কাউকে কখনও লস অ্যালামসে দেখেছেন? ধরুন প্রসের কার্ল-এর বাড়িতে?
–হ্যাঁ, এঁকে দেখেছি। এঁকে চিনিও। এঁর নাম ডক্টর অ্যালেন নান মে।
–আর দুজনকে?
–না চিনি না। কিন্তু কেন বলুন তো? কে এঁরা?
–আপনি খবরের কাগজ পড়েন না?
–বিশেষ নয়। কেন?
–ডক্টর অ্যালেন নান মে-র নাম এ সপ্তাহে প্রতিদিন খবরের কাগজে ছাপা হচ্ছে। দেখেননি?
–না। কেন? তিনি কি নতুন কিছু আবিষ্কার করেছেন?
-না। বাড়ি গিয়ে ক-দিনের পুরানো খবরের কাগজ উল্টে দেখবেন। আর একটা কথা। এখানে, এই হারওয়েলে-বিশেষ করে প্রফেসর কার্ল-এর বাড়িতে–অস্বাভাবিক কিছু দেখলে আমাকে গোপনে এসে জানিয়ে যাবেন।
অবাক হয়ে যায় ক্লাউস। বলে, কেন বলুন তো? কী ব্যাপার?
আর্নল্ড জবাব দেয় না। র্যাক থেকে খানকতক ‘লন্ডন টাইমস’ নিয়ে গুঁজে দেয়। ওর হাতে। বলে, শুধু নিউক্লিয়ার ফিজিকস্ পড়লেই চলবে না ডক্টর, একটু-আধটু দুনিয়ার খবরও রাখতে হবে। যান, এগুলো পড়ে দেখুন। আপনার প্রশ্নের জবাব ওতেই পাবেন।
তা পেল ক্লাউস। কাগজে সাড়ম্বরে বার হয়েছে অ্যালেন নান মের গুপ্তচরবৃত্তির কাহিনি।
***
তার দিনসাতেক বাদে ঘটল ঘটনাটা। অদ্ভুত একটা অভিজ্ঞতা।
কী একটা কাজে ক্লাউস এক সপ্তাহান্তে লন্ডনে গিয়েছিল। একাই মাসে দু-একবার সে এভাবে শহরে যেত। সঙ্গে নিয়ে যেত লম্বা লিস্ট। হারওয়েল মিসেসদের নানান শৌখিন জিনিসের অর্ডার। কোনো কোনো দিন রবিবারটা সে লন্ডনেই কাটিয়ে আসত–কোনো হোটেলে। সেবার কী মনে হল, ও ফিরে আসবে বলে স্থির করল। সাউথ কেনসিংটন স্টেশনের দিকে যাচ্ছে, হঠাৎ পথের মাঝখানেই ওকে পাকড়াও করলেন প্রফেসর কার্ল, কোথায় চলেছ হে?
