এখানে এসে এতদিন পরে ক্লাউস-এর মনে হচ্ছে, জীবনে নোঙর ফেলার দিন এসেছে বুঝিবা। এখন ওর বয়স পঁয়ত্রিশ। এতদিন সংসার করার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। এখন আর পাঁচজনের পরিবারের দিকে তাকিয়ে ওরও মনে হচ্ছে এই নির্বান্ধব ব্যাচিলারের জীবনে সে কোনদিনই শান্তি পাবে না। 1946-এ প্রথম যখন। চাকরিতে ঢোকে তখন ওর রোজগার ছিল বছরে 275 পাউন্ড, এখন উপার্জন করছে 1,500 পাউন্ড। অর্থাৎ মাসে প্রায় আড়াই হাজার টাকা। 1946-এ যুদ্ধোত্তর ইংল্যান্ডে এ উপার্জন বড় কম নয়। কিন্তু বিবাহ করে সংসার করায় তার একটি প্রচণ্ড বাধাও আছে। সে বাধা–ফ্রাউ রোনাটা কার্ল।
***
এ ধাঁধার সমাধানটা বুঝতে হলে ক্লাউস ফুকস্-এর অতীত জীবনটাকে জানতে হবে। ক্লাউস জার্মানি থেকে প্রাণ নিয়ে যখন ইংল্যান্ডে পালিয়ে এসেছিল তখন ওর বয়স মাত্র বাইশ। জার্মানির কিয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন উৎসাহী ছাত্রনেতা ছিল সে। রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে সে ছিল ন্যাশনাল সোসালিস্ট পার্টির বিরুদ্ধ দলে। ছাত্র-আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল। হঠাৎ দেখা গেল ওর বিরুদ্ধ দল, ওই ন্যাশনাল সোসালিস্ট পার্টি, জার্মানির ক্ষমতা দখল করেছে তার নাম হয়েছে নাৎসি পার্টি। ওই দলের নেতা অ্যাডলফ হিটলার হয়েছে জার্মানির দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। 1933-এর তিরিশে জানুয়ারি–যেদিন হিটলার জার্মানির ক্ষমতা দখল করল, সেদিন কিয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে হিটলারের অনুগামীরা তন্নতন্ন করে খুঁজেছিল বিপক্ষদলের ওই ছাত্রনেতাকে–পাদরি ফুকসের সেই দুর্বিনীত পুত্র ক্লাউস-কে। খবর পেয়ে ক্লাউস আত্মগোপন করে। প্রথমে পালিয়ে যায় পারিতে, সেখান থেকে কপর্দকহীন অবস্থায় ইংল্যান্ডে।
ফ্রলাইন রোনাটা হেল্মহোল্টৎজ-এর বয়স তখন মাত্র সতেরো। হাইস্কুলের ছাত্রী। তার বাবা ছিলেন পাদরি ফুকসের একজন গুণগ্রাহী। ফুকস্ আশ্রয় পেল তার পরিবারে। সমারসেট-এ। মিস্টার হেল্মহোল্টজ বিপত্নীক। তার বড় মেয়ে ফ্রলাইন রোনাটাই ছিল গৃহকর্ত্রী–মাত্র সতেরো বছর বয়সে। আরও দুটি ছোটো ছোটো ভাইবোন-এর দায়িত্ব ছিল তার ওপর। এর ওপর এসে জুটল। ক্লাউস-বাইশ বছরের প্রাণবন্ত তরুণ ফুকস ভর্তি হল ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ে। চার। বছর সে ছিল এই পরিবারে, রোনাটার অভিভাবকত্বে। শুধু তাই নয়, রোনাটা ছিল তার মাস্টারনি, দিদিমণি আর কি। তার কাছেই ইংরেজি ভাষাটা শিখেছিল। পরিবর্তে ক্লাউস রোনাটার শক্ত শক্ত অঙ্কগুলো কষে দিত। সে সময় ক্লাউস ছিল মুখচোরা, বইপোকা। চার বছর পরে ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সে যে বছর দর্শন ও অঙ্কশাস্ত্রে ডক্টরেট পায় রোনাটা সে বছরই গ্রাজুয়েট হল। আর সেই বছরই মারা গেলেন ওর আশ্রয়দাতা–রোনাটার বাবা।
জার্মান বিজ্ঞানের সেই দুর্লভ প্রতিভা বাস্তুচ্যুত মাক্স বর্ন তখন এডিনবরায় পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। ক্লাউস ফুকস-এর প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন এবং তার অধীনে একটি স্কলারশিপ জুটিয়ে দেন। ক্লাউস সমারসেট ছেড়ে চলে আসে স্কটল্যান্ডে, এডিনবরায়।
সেই বিদায়মুহূর্তেই ঘটল একটা ঘটনা যার প্রতিক্রিয়া সারাজীবন ধরে অনুভব করছে ক্লাউস। রোনাটা ততদিনে একটা চাকরি জুটিয়ে নিয়েছে। সংসারটা চালাবার মতো ব্যবস্থা হয়েছে তার। একুশ বছরের তারুণ্যে ভরপুর। ক্লাউস এতদিনে প্রফেসর ম্যাক্স বর্নের অধীনে রিসার্চ করার সুযোগ পেয়েছে শুনে সে অভিনন্দন জানাতে এল ক্লাউসকে। কথা প্রসঙ্গে বললে, তুমি তো এবার এডিনবরায় চলে যাচ্ছ। আমাদের সঙ্গে এই বোধহয় ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল।
ক্লাউস বললে, তা কেন? এডিনবরা এমন কিছু সাগরপারে নয়। যোগাযোগ রাখলেই রাখা যেতে পারে। অবশ্য তোমার যদি গরজ থাকে।
–আমার? কী মনে হয় তোমার?
–কী জানি। চিঠি লিখলে জবাব দেবে তো?
হঠাৎ মুখটা নিচু করলে রোনাটা। বললে, আর আমি যদি বলি–চিঠি লেখার দূরত্বে থাকতে চাই না আমি?
-মানে?
ওর চোখে চোখ রেখে রোনাটা বললে, আমি তোমার কাছেই থাকতে চাই। লেটস্ গেট ম্যারেড, ক্লাউস।
–তা কেমন করে সম্ভব? আমার ছাত্রজীবন এখনও শেষ হয়নি।
একটা দীর্ঘশ্বাস পড়েছিল রোনাটার। তারপর বললে, আমি কি তাহলে তোমার প্রতীক্ষায় থাকব?
এবার জবাব দিতে দেরি হল ফুকস-এর। একটু ভেবে নিয়ে বললে, আমি দুঃখিত রোনাটা। তা হবার নয়। বাধা যে কী, তা তোমাকে আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না। কিন্তু আমি আমার জীবনের সঙ্গে তোমাকে কোনোদিনই জড়িয়ে নিতে পারব না।
স্তম্ভিত হয়ে গেল যেন রোনাটা। বহু কষ্টে সে আত্মসম্বরণ করল। তারপর প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট উচ্চারণ করে বললে, তাহলে তোমার আগের প্রশ্নটার জবাব দিই, আমাকে চিঠি লিখ না। কারণ জবাব আমি দেব না।
ক্লাউস শুধু বলেছিল, আয়াম সরি।
ঝড়ের বেগে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল রোনাটা।
***
সে আজ নয়-দশ বছর আগেকার কথা। ক্লাউস কিন্তু ওর কথা মেনে নেয়নি। এডিনবরায় পৌঁছে চিঠি লিখেছিল। একাধিক পত্র। রোনাটাও ছিল তার সংকল্পে অটুট। একটি চিঠিরও জবাব দেয়নি। তারপর যেমন হয়। ক্রমশ ক্লাউস ভুলে গেল তার প্রথম যৌবনের বান্ধবীকে। তিন বছর পর ম্যাক্স বর্নের কাছে থিসিস দাখিল করে পেল ডক্টর অফ সায়েন্স উপাধি। ইতিপূর্বে হয়েছিল পিএইচ. ডি.এবার হল ডি. এসসি.। খবরটা উৎসাহভরে জানালো রোনাটাকে।
