পথের মাঝখানেই থমকে পড়ে রোনাটা। প্রতিপ্রশ্ন করে, তুমি কি খ্রিস্টান?
–আমার বাবা তো বটেই!
–বাবার কথা তুলো না! তার নাম উচ্চারণ করারও যোগ্য নও তুমি।
–কী মুশকিল। আমার বাবার নাম আমি বলব না?
–না বলবে না। যে সেন্ট জর্জের নাম শোনেনি—
টিলার মাথায় সত্যই ছিল একটা অদ্ভুত জিনিস। প্রায় দু-হাজার বছরের প্রাচীন ছবি। পাথরের গায়ে খোদাই করে আঁকা-ঘোড়া একটা। সাদা চকের পাহাড়, তাই ওটা সাদা ঘোড়া। কিংবদন্তির সেন্ট জর্জ নাকি সাদা ঘোড়ায় চড়ে গিয়েছিলেন ড্রাগনকে বধ করে বন্দিনী ‘ড্যামসেল-ইন-ডিস্ট্রেস’কে উদ্ধার করে আনতে। বিগত যুগের ওই শিল্পকর্মটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে যাত্রীরা আসে হারওয়েলে।
টিলার ওপর থেকে দেখা গেল ট্যাক্সিটা। খেলাঘরের গাড়ি যেন। প্রফেসর কার্ল পায়চারি করছেন; আর বনেট খুলে ক্যাব-ড্রাইভার হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ইঞ্জিনের ওপর।
পাকদণ্ডী পথে ফেরার সময় রোনাটা বললে, আচ্ছা ক্লাউস, ধর আমি যদি একদিন ওইরকম বন্দিনী হয়ে পড়ি–তুমি অমন সাদা ঘোড়ায় চেপে আমাকে উদ্ধার করতে আসবে।
হঠাৎ আকাশ-ফাটানো অট্টহাস্য করে ওঠে ক্লাউস। বলে, কী পাগল তুমি, রোনাটা! এযুগে কি ড্রাগন পাওয়া যায় পথে-ঘাটে?
রোনাটা অপ্রস্তুত হল না মোটেই। বললে, কেন পাওয়া যাবে না? হয়তো তার চেহারাটা পালটেছে–তাই সহজে চেনা যায় না; কিন্তু ড্রাগন আছে বইকি আজও।
ওর কথার মধ্যে কী যেন একটা বেদনার সুর ছিল। চমকে উঠল ক্লাউস।
***
হারওয়েল জায়গাটাকে কিন্তু ভালো লেগে গেল ক্লাউস ফুকস-এর। শুধু জায়গাটাই নয়, গোটা প্রকল্পটা। আলাদিনের আশ্চর্য-প্রদীপ থেকে ওঁরা বার করেছেন একটা দৈত্যকে–কিন্তু তাকে দেওয়া হল শুধুমাত্র ধ্বংসের আদেশ। এ ঠিক হয়নি–এজন্য এ গুপ্তধনের সন্ধানে প্রাণপাত করেননি-রাদারফোর্ড-কুরি দম্পতি-চ্যাডউইক-ফের্মি আর অটো হান। হ্যাঁ, ফুকস্ স্বীকার করে, প্রথম সাফল্যে সে নিজেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে মদ কিনতে ছুটেছিল–কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। এতদিনে সে পথের সন্ধান পেয়েছে। মানব-কল্যাণে যদি এই মহাশক্তিকে কাজে লাগানো যায়, তবেই সার্থক হবে অর্ধশতাব্দীব্যাপী বিজ্ঞানীদের সাধনা। সেই আয়োজনই হচ্ছে হারওয়েলে। মনপ্রাণ তাই ঢেলে দিল ফুকস্।
সমস্ত কারখানাটা উঁচু কাটা-তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। সামনে লোহার বড় গেট। বন্দুকধারী পাহারা। তাকে ‘পাস্ দেখিয়ে তবে তুমি ঢুকতে পারবে এ-রাজ্যে। ঢুকতেই সামনে একটি দ্বিতলবাড়ি। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিস। এখানেই কাজ করতে হয় তাকে। স্যার জনের পাশের ঘরে। ও-পাশে প্রফেসর কার্লের অফিস। আগে এটা ছিল রয়েল এয়ার ফোর্সের একটা আস্তানা। বিমানবাহিনীর কর্মীদের ঘরগুলোই পাওয়া গিয়েছে আপাতত। নতুন নতুন বাড়িও হচ্ছে। একতলা বাড়ি সব–সামনে ফুলের বাগান, পিছনে সবজির। স্টাফ-কোয়ার্টার্সকে বাঁ-হাতে রেখে যদি এগিয়ে যাও তাহলে আবার একটা কাঁটাতারের বেড়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। আবার পাস দেখাতে হবে। ভেতরটা কারখানা নয়, বিজ্ঞানগার। সবচেয়ে অবাক হয়ে যাবে অ্যাটমিক পাইলটাকে দেখে। প্রকাণ্ড একটা গোলাকৃতি গম্বুজ–যেন রোমের কলোসিয়ামের অনুকৃতি। ওর কাছে গিয়ে দাঁড়াতে ভয় হবে তোমার। সজ্ঞানে হয়তো ঠিক হিরোশিমা-নাগাসাকির কথা মনে পড়বে না, তবুও গা-ছমছম করবে। মনে হবে অজানা-অচেনা এক অরণ্যের মাঝখানে এসে পড়েছ বুঝি। চারদিক ঝকঝক তকতক করছে–হ্যাঁসপাতালের অপারেশন থিয়েটার যেন। হঠাৎ নজরে পড়বে একটা বিজ্ঞপ্তি : ধূমপান নিষেধ। হয়তো ধড়াস করে উঠবে বুকের ভেতর। হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা কোথায় ফেলবে ভেবে পাবে না। তখনই একজন কর্মী হয়তো এগিয়ে আসবে, বলবে–অমন আঁৎকে উঠবেন না স্যার; অ্যাটমিক-পাইলটা কোনো ডিনামাইটের স্তূপ নয়–সিগারেটের আগুনে ওটা জ্বলে। উঠবে না। ওই বিজ্ঞপ্তি দেওয়া আছে যাতে জায়গাটা নোংরা না হয়।
ফুকস্ আর কার্ল এখানে পৌঁছানোর বছর দেড়েক আগেই এ প্রকল্পে হাত দেওয়া হয়েছে। এখন এখানে শ-দুয়েক কর্মী কাজ করে। তার মধ্যে জনাত্রিশেক হচ্ছে বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান-চর্চা তারা করেছে সামান্যই, জ্ঞানও অল্প। বয়স বিশ-পঁচিশ। আসলে ওরা সবাই যুদ্ধ-ফেরত। ফিজিক্সের চর্চা ছেড়েছে তিন-চার বছর আগে–কেমব্রিজ-অক্সফোর্ড- হ্যাঁরো-ইটনে। চলে গিয়েছিল মরণপণ যুদ্ধে–ওরা মূলত টেকনিশিয়ান, হাতে-কলমে কলকজার কাজই শুধু জানে। স্যার জন তাই ব্যবস্থা করেছেন সপ্তাহে চারদিন তাদের নিয়ে থিওরেটিক্যাল ক্লাস করতে হবে। ক্লাস নেন তিনি নিজে, আর তার দুই সহকর্মী–প্রফেসর কার্ল আর ডক্টর। ছেলেগুলো প্রাণবন্ত-মৃত্যুকে বারে বারে দেখেছে চোখের সামনে। নীতিবাধের বালাই কম-কিন্তু নতুন পৃথিবী গড়ে তোলার সংকল্প আছে।
ওঁরা তিনজনই মাত্র পদস্থ অফিসার-বাদবাকি তো ছেলে-ছোকরা। আরও দুজনের সঙ্গে আলাপ হয়েছে ফুকস-এর। উইং-কমান্ডার হেনরি আর্নল্ড আর ডক্টর স্যামুয়েল স্কট। আর্নল্ড ছিলেন বিমানবাহিনীতে, প্রৌঢ় গম্ভীর স্বভাবের মানুষ, বিপত্নীক। তিনি হারওয়েলের স্পেশাল সিকিউরিটি অফিসার। এখানে অবশ্য সিকিউরিটির অতটা কড়াকড়ি নেই, যেমন ছিল লস অ্যালামসে। সেখানে প্রত্যেকের ছদ্মনাম ছিল, স্বনামে কারও পরিচয়ই ছিল না। এখানে সেসব কিছু নেই। তবু পারমাণবিক-তত্ত্বের পরীক্ষা-নিরীক্ষা যখন হচ্ছে তখন গোপনীয়তার প্রয়োজন আছে বইকি। আর ডক্টর স্কট এখানকার মেডিক্যাল অফিসার। ছোটো একটা আউটডোর ডিসপেন্সারি আছে তার। অমায়িক মানুষ। আছেন সপরিবারে, স্ত্রীপুত্র পরিজনদের নিয়ে। সুখী পরিবার।
