লন্ডনের ওল্ড বেইলি কোর্টে তার বিচার হয়। সংক্ষিপ্ত বিচার। নান দোষ স্বীকার করে। দশবছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়ে যায় তার।
অ্যালেন নান-এর জবানবন্দী থেকে ডেক্সটার অথবা ডগলাস সম্বন্ধে কোনো তথ্যই জানা গেল না। বস্তুত সে ওই দুজনের সঙ্গে কোনো সময়েই যোগাযোগ করেনি।
ইতিমধ্যে অন্যান্য সূত্র থেকে এটুকু বোঝা গেছে, ডগলাস মধ্য-য়ুরোপের লোক। আমেরিকান বা ইংরেজ নয়। প্যাশ-এর ধারণা ডগলাস এবং ডেক্সটার একযোগে কাজ করেছে। তারা পরস্পরকে চেনে। এ-ক্ষেত্রে তারা নিশ্চয়ই সেই যোগসূত্রটুকু বজায় রেখে চলেছে। এখন দুজনেই দুজনের মৃত্যুবাণ। একজন ধরা পড়লেই অপরজন বেশি করে বিপদগ্রস্ত হবে। এই যুক্তি অনুসারে কর্নেল প্যাশ তীক্ষ্ণ নজর রাখবার ব্যবস্থা করল সম্ভাব্য ডেক্সটারদের ওপর–অর্থাৎ ফাইনম্যান, অটো কার্ল এবং ওপেনহাইমারের সঙ্গে কে কে দেখা করতে আসছে। হারওয়েল থেকে এই সূত্রে তাকে স্কার্ডন জানালো একজনের নাম–ব্রুনো পন্টিকার্ভো। সংক্ষেপে ব্রুনো অথবা পন্টি। জাতে ইটালিয়ান। এনরিকো ফের্মির ছাত্র, কিছুদিন জোলিও-কুরির বিজ্ঞানাগারেও রেডিও অ্যাকটিভিটির ওপর কাজ করেছে। পরে পালিয়ে আসে কানাডায়। ‘চক-রিভার’-প্রকল্পে যুক্ত ছিল। পরমাণু-বোমার বিষয়ে অনেক কিছু জেনেছে সে। যুদ্ধান্তে ফিরে গেছে ইংল্যান্ডে। হারওয়েলে চাকরির ধান্দায় আছে। তাকে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে অটো কার্লের বাড়িতে। মনে হয়, দুজনের দীর্ঘদিনের জানাশোনা। প্রফেসর অটো কার্ল বর্তমানে হারওয়েল ইনস্টিটুটের দু-নম্বর কর্ণধার। প্রধান কর্মকর্তা হচ্ছেন ডিরেক্টর স্যার জন ককট। ব্রিটিশ ডেলিগেশানের কর্ণধাররূপে মানহাটান প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন যুদ্ধের সময়। তার অধীনে আছেন প্রফেসর কার্ল। তিন নম্বর চেয়ারে বসেছেন ডক্টর ক্লাউস ফুকস্। শোনা গেল, প্রফেসর কার্ল নাকি ভিতরে ভিতরে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন যাতে ব্রুনো একটা চাকরি পেয়ে যায় ওখানে। কেন?
হারওয়েল-এ প্রথম আবির্ভাবের দিনটির কথা কোনোদিন ভুলবে না রোনাটা। জুন 1946। রৌদ্রকরোজ্জ্বল সুন্দর একটি প্রভাত। অক্সফোর্ড থেকে একটি ট্যাক্সি নিয়ে প্রথম এল ওরা। ওরা তিনজন। প্রফেসর অটো কার্ল, তার স্ত্রী রোনাটা আর ক্লাউস ফুকস্। তার মাসতিনেক আগে আমেরিকা থেকে ফিরে এসেছেন স্যার জন–হারওয়েলের ডিরেক্টার। মালপত্র তখনও এসে পৌঁছায়নি। লন্ডন থেকে ট্রেনে চেপে এসেছিল অক্সফোর্ড। সেখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে হারওয়েল।
রোদ ঝলমল সবুজ-প্রান্তরের মাঝখান দিয়ে কুমারী মেয়ের সিঁথির মতো পড়ে আছে সড়কটা। মাঝে মাঝে খামারবাড়ি-যব আর বার্লির ক্ষেত। পাতা-ঝরার দিন শুরু হয়নি, রৌদ্রে ঝলমল করছে সবুজ সতেজ পপলার আর এম গাছের সারি। বিসর্পিল পথে গাড়ি চলেছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। নীরবে উপভোগ করছে এই প্রথম আবির্ভাব মুহূর্তটি; আর নতুন যুগে, নতুন পৃথিবীতে নতুন করে বাঁচার প্রভাতী সুর।
হঠাৎ দূর থেকে দেখা গেল পুরানো হারওয়েল গ্রাম। খড়, টালি আর স্লেটের ছাদ। যেন সারি সারি খেলাঘর। চিমনি দিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে। গ্রাম্য কুকুরগুলো এখনও বোধ হয় মোটর-কারে অভ্যস্ত হয়নি। তারস্বরে প্রতিবাদ জানাচ্ছে তারা। হঠাৎ রোনাটার নজরে পড়ল একটা উঁচু টিলা। তার মাথায় একটা ছোটো বাংলোর মতো মনে হচ্ছে।
-ওটা কী?–কৌতূহলী রোনাটা প্রশ্ন করে।
নিউক্লিয়ার-ফিজিক্স-এর দুই পণ্ডিত শ্রাগ করলেন। অজ্ঞতা প্রকাশ করা ছাড়া উপায় কী? জবাব দিল ক্যাব-ড্রাইভার। বললে, ম্যাডাম, ওটা হচ্ছে ‘হোয়াইট-হর্স অফ উফিংটন। এখানেই একদিন সেন্ট জর্জ সেই ড্রাগনটাকে বধ করেছিলেন। আজ সেই সেন্ট জর্জও নেই, ড্রাগনও নেই–পড়ে আছে শুধু সাদা ঘোড়াটা।
–সাদা ঘোড়াটা! বল কী! এতদিন ধরে আছে?
–আছে ম্যাডাম। বিশ্বাস না করেন তো দেখে আসুন। আমি না হয় আধঘন্টা অপেক্ষা করছি। কারবুরেটারটাও গণ্ডগোল করছে। এই ফাঁকে দেখে নিই।
রোনাটা তো তৎক্ষণাৎ একপায়ে খাড়া। নিষ্ঠাবতী খ্রিস্টান সে। বাইবেল তার কণ্ঠস্থ। সেন্ট জর্জ এখানেই সেই ড্রাগনটাকে বধ করেছিলেন শুনে রোমাঞ্চ হয়েছে তার। গাড়ি থামতেই সে নেমে পড়ে। বলে, এস তোমরা।
বৃদ্ধ প্রফেসর কার্ল বলেন, ওহ মাই! আমাকে মাপ কর ডার্লিং। আমি অত্যন্ত ক্লান্ত।
তবে তুমিই এস–রোনাটা ডাক দেয় ক্লাউসকে।
ক্লাউস ইতস্তত করে। প্রফেসর কালই তাকে উৎসাহ জোগান-যাও, দেখে এস। আমি বরং এখানেই আছি। একটু পায়চারি করি ততক্ষণে।
পায়ে পায়ে ওরা দুজন এগিয়ে চলে। রোনাটা আর ক্লাউস। বিসর্পিল পথে পাকদণ্ডীর একটা মোড় ঘুরেই রোনাটা বলে, তুমি অত মুখ গোমড়া করে আছ কেন বলতো ক্লাউস? জোর করে ধরে আনলাম বলে?
জোর করে মানে? আমি তো স্বেচ্ছায় এ চাকরি নিয়েছি। তোমার উপরোধ পড়ে মোটেই নয়।
-জানি। আমার উপরোধে পড়ে তুমি কবে কোন্ কাজটা করেছ?
মনে মনে কাঁটা হয়ে ওঠে ক্লাউস। এই প্রসঙ্গটিকে সে সবচেয়ে ডরায়। সে কিছুতেই ভুলতে পারে না সাত-আট বছর আগেকার একটা ঘটনা–চিরাচরিত রীতি লঙ্ঘন করে কুমারী রোনাটাই একদিন প্রস্তাব তুলেছিলক্লাউস ফুকসকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল তার জীবনের ভোগে। ক্লাউস নিজেই সে প্রস্তাবটা প্রত্যাখ্যান করেছিল সেদিন। তাই প্রসঙ্গটা ঘোরাবার জন্য তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, সেন্ট জর্জ আর ড্রাগনের ব্যপারটা কী?
