ওদের সমাদর করে বসালেন ফ্রাউ কার্ল। শ্যাম্পেন বার করে আনলেন। ফুকে ধমক দিলেন, আজকাল তো এ পাড়া মাড়াতেই দেখি না।
আর এ পাড়ায় আসব কী করতে? দরকার ছিল প্রফেসরের সঙ্গে অ্যাটম-বোমার জন্য। সে দরকার তো মিটেই গেছে।
–ও! অর্থাৎ আমার সঙ্গে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই। কেমন তো? অকৃতজ্ঞ কোথাকার! একদিন তোমার বিছানা সাফা করা থেকে ঘরদোর পরিষ্কার করা সবকিছু আমাকে দিয়ে করাওনি?
নিশ্চয়ই না। তুমি নিজের গরজে ওগুলো করতে।
–নিজের গরজ! কী গরজ ছিল আমার?
–তোমার ফিগার ঠিক রাখতে।
প্যাশ বাধা দিয়ে বলে ওঠে–প্লিজ, মিসেস কার্ল। তৃতীয় ব্যক্তির সামনে এভাবে হাটে হাঁড়ি ভাঙবেন না।
রাঙিয়ে ওঠে রোনাটা। হাত দিয়ে মাথার চুলগুলো পিছনে সরিয়ে দিতে দিতে বলে, আপনি যা ভাবছেন মোটেই তা নয়। ক্লাউস যখন নাৎসিদের লাথি খেয়ে ইংল্যান্ডে পালিয়ে এল তখন প্রথমে আমাদের বাড়িতেই আশ্রয় পায়। ছেঁড়া পালুন, জুতোয় তাপ্লিমারা-নেহাৎ দয়াপরবশ হয়ে আমি তখন আমার পকেট-মানি থেকে
হঠাৎ নিজেই কী ভেবে থেমে পড়ে।
ফুকস্ বলে, কেন মিছে কথা বলছ রোনাটা? সত্যি কথাটা চেপে যাবার চেষ্টা করে লাভ নেই। কর্নেল প্যাশ জাত-গোয়েন্দা। ঠিকই আন্দাজ করছে সে।
-কী সত্যি কথা?–গর্জে ওঠে রোনাটা।
–সে সময় তুমি আমার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলে!
রোনাটা হয়তো মেরেই বসত ফুকসকে। বাধা দিল প্যাশ। বললে, মিসেস কার্ল, আপনি কি ফাইনম্যানের সেই বিখ্যাত তানকাটা শুনেছেন, ডক্টর ফুকসের ওপর।
–’তানকা’ কাকে বলে?
–জাপানি কবিতা–তিন-চার লাইনের। প্রফেসর ফাইনম্যান মুখে মুখে অমন কবিতা-রচনায় সিদ্ধহস্ত। উনি ডক্টর ফুকস্ সম্বন্ধে বলেছেন :
“Fuchs…Looks…An ascetic… Theoretic.” অর্থাৎ ফুকসকে দেখলে মনে হয় ভালো মানুষ। আসলে ডক্টর ফুকস্..পাদপূরণ করে রোনাটা নিজেই–পাজির পা-ঝাড়া! অকৃতজ্ঞ! শয়তান!
ফুকস উঠে দাঁড়ায়। আভূমি নত হয়ে ‘বাও’ করে : থ্যাংকস ফর দ্য কমপ্লিমেন্টস্।
কাজের কথায় আসে প্যাশ। বলে, মিসেস কার্ল, আপনার দ্বারস্থ হয়েছি একটা বিশেষ কৌতূহল মেটাতে। এই ফটোখানি প্রফেসর কার্ল উপহার দিয়েছিলেন ডক্টর ফুককে। এটা তিনি কেমন করে তুলেছেন জানেন?
ফটোখানি হাতে নিয়ে রোনাটা হাসে। বলে, আপনিই বলুন না?
আমি প্রথমে ভেবেছিলাম–ট্রিক ফটোগ্রাফি। দুটো নেগেটিভ সুপার-ইম্পোজ করা। কিন্তু পরে পরীক্ষা করে দেখলাম, তা নয়। আপনি কিছু জানেন?
-জানি। আপনি যে অনবদ্য তানকাটা এই মাত্র শুনিয়েছেন, তার প্রতিদান হিসাবে এ গোপন রহস্যটা আপনার কাছে ফাঁস করে দেব। কেবল একটি শর্তে–প্রফেসরকে বলবেন না। এই ফটোখানা দেখিয়ে সে অনেককে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
বেশ বলব না, এবার বলুন।
এ ছবি একবার মাত্র এক্সপোজ করে তোলা হয়েছে। কোনো ফটোগ্রাফিক ট্রিক এর মধ্যে নেই। এ-পাশে অটো কার্ল, ও-পাশে হান্স কার্ল।
–হ্যান্স কার্ল! তিনি কে?
প্রফেসর কার্ল-এর যমজ ভাই। মস্কোতে আছেন। তিনিও ফিজিসিস্ট।
অনেক কষ্টে কর্নেল প্যাশ তার অভিব্যক্তি গোপন রাখল। কী আশ্চর্য! কী অপরিসীম আশ্চর্য! প্রফেসর অটো কার্লের এক যমজ ভাই আছে, যে নিজেও পদার্থবিজ্ঞানী, সেও নিউক্লিয়ার ফিজিসিস্ট এবং মস্কোতে থাকে।
সেদিনই প্রফেসর অটো কার্ল-এর ব্যক্তিগত ফাইলটা প্যাশ আবার হাতড়ে দেখল। হ্যাঁ, ‘কোশ্চেনেয়ারে’ প্রফেসর কার্ল লিখেছেন, তার একটি ভাই আছে। সে বিজ্ঞানী। মস্কোর লেবেডফ ইন্সটিটুটে গবেষণা করছে। তার বয়স যা উল্লেখ করা হয়েছে তা প্রফেসর অটো কার্ল-এর সঙ্গে হুবহু এক। অর্থাৎ একটু অঙ্ক কষলেই এফ. বি. আই. বুঝতে পারত–ওই হান্স কার্ল হচ্ছেন অটো কার্লের যমজ ভাই। এতদিন সে অঙ্কটা কেউ কষে দেখেনি। কিন্তু সেকথা স্পষ্টাক্ষরে স্বীকার করা নেই।
…কাহিনিটা শেষ করে প্যাশ কর্নেল ল্যান্সডেলকে বললে, এবার বলুন স্যার, আপনার একমাসের মাইনে বাজি ধরবেন?
কর্নেল ল্যান্সডেল শুধু বললেন, স্ট্রেনজ!
–অর্থাৎ ওই হান্স কার্ল যদি কোনো ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট নিয়ে আমেরিকায় এসে থাকে, এবং প্রফেসর অটো কার্ল-এর আইডেন্টিটি ডিস্ক-এর একটা নকল তাকে রাশিয়ান গুপ্তচরেরা দিয়ে থাকে তাহলে অনায়াসে লস অ্যালামসের প্রতিটি কেন্দ্রে হয়তো সে প্রবেশ করেছে। অপর পক্ষে ছয়ই অগাস্ট ওয়াশিংটনে গ্রোভসের ঘরে যে লোকটা অল্পসময়ের জন্য হাজিরা দেয় সে যদি হান্স কার্ল হয়, তাহলে প্রফেসার অটো কার্ল অ্যালেবাই সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হয়ে সান্তা ফে-তে গিয়ে মাইক্রোফিটা হস্তান্তরিত করতে পারেন।
–আই সি।বললেন সংক্ষেপে কর্নেল ল্যান্সডেল।
.
০২.
‘অ্যালেক’ ধরা পড়ল 1946-এর তেসরা মার্চ।
তার মাসতিনেক পরে স্যার জন, প্রফেসর কার্ল আর ডক্টর ফুকস চলে গেলেন হারওয়েলে।
অ্যালেকের প্রকৃত নাম ডক্টর এ্যালেন নান মে। ইংরেজ। যুদ্ধের প্রথম দিকে এসেছিল কানাডায়। সেখান থেকে শিকাগোতে। সে যে খবর পাঠিয়েছিল তা সামান্যই। প্রথমত বোমাটা ইউ-235 এর; দ্বিতীয়ত সে সময় ম্যাগনেটিক সেপারেশনে দৈনিক চারশ গ্রাম ইউ-235 পাওয়া যাচ্ছিল। এ ছাড়া 162 মাইক্রোগ্রাম পরিমাণ ইউ-235 সে ল্যাবরেটরি থেকে পাচার করে এবং রাশিয়ান গুপ্তচরের হাতে সমর্পণ করে। এই তার অপরাধ।
