ফলে অ্যালেবাই-এর হিসাব অনুসারে তিনটি নাম লিপিবদ্ধ হল প্যাশ-এর ডায়েরিতে। ফাইনম্যান, ওপেনহাইমার এবং ৎজিলাৰ্ড।
***
দ্বিতীয় পর্যায়ের অনুসন্ধান প্যাশ শুরু করে অন্যদিক থেকে। ফটো তোলার। বাতিক কার আছে। মাইক্রোফিল্ম তৈরি করবার মতো উপযুক্ত যন্ত্র কার কাছে থাকতে পারে? এই সূত্র ধরে একটা অদ্ভুত তথ্য পেয়ে গেলো। ওর প্রথমেই মনে হল, লস অ্যালামসে ফটো-ডিলার কে কে খোঁজ করতে হবে। তার কাছেই সন্ধান পাওয়া যাবে কে কে তার গ্রাহক, ফটোগ্রাফির বাতিক আছে কার কার। কথাপ্রসঙ্গে সে ক্লাউস ফুকসকে প্রশ্ন করল, ‘আই সে ডক্টর, লস অ্যালামসে কোনো ফটোগ্রাফারের দোকান আছে? কিছু ফটো তুলেছি, ডেভেলপ করতে দিতাম।
ক্লাউস ফুকস্ জবাবে বলেন, লস অ্যালামসে কোনো ফটোগ্রাফার নেই। সান্তা ফে-তে পাবেন। তবে তাড়াতাড়ি থাকলে আপনি প্রফেসর কার্ল-এর দ্বারস্থ হতে পারেন। ওঁর ফটোগ্রাফিতে ভীষণ ঝোঁক। নিজস্ব ডার্করুম আছে : সব কিছু নিজ হাতে করেন।
প্যাশ নির্বিকারভাবে বললে, না, শৌখিন ফটোগ্রাফার দিয়ে চলবে না। আমি যেটা ডেভেলপ করাতে চাই তা হচ্ছে মাইক্রোফিল্ম।
হা, হা তার ব্যবস্থাও আছে। প্রফেসর কার্ল ছাত্রজীবন থেকেই ওই মাইক্রোফিলম ব্যবহার করছেন। লাইব্রেরিতে বসে উনি নাকি কখনও লঙহ্যান্ডে নোট নেননি। পটাপট ছবি তুলে নিয়ে চলে আসতেন।
এবারও নির্বিকার ভাবে প্যাশ বলে, তাই নাকি। তবে তো ভালই। ওঁর কাছেই যাই
–কিন্তু প্রফেসর বোধ হয় কাল সানফ্রান্সিস্কো গেছেন। দাঁড়ান, জেনে নেই
ফুকস্ একটি ফোন করলেন। ও প্রান্তে ধরলেন ফ্রাউ কার্ল। শোনা গেল, ফুকসের অনুমানই সত্য। প্রফেসর তার ডেরায় নেই।
প্যাশ বলে–এখানে আর কেউ নেই যে ওঁর ডার্করুমটা ব্যবহার করে এটা ডেভেলপ করে দিতে পারে? আপনি পারেন?
–সর্বনাশ! আমি ফটোগ্রাফির কিছুই জানি না। আমার ক্যামেরাই নেই। আর তাছাড়া তেমন ফটোগ্রাফি-বিশারদ পেলেও কাজ হবে না। আমি নিশ্চিত জানি, প্রফেসর ওঁর ডার্করুম তালাবন্ধ করে গিয়েছেন। কাউকে ব্যবহার করতে দেন না সেটা। ওই ডার্করুমটা ওঁর প্রাণ। কাউকে ঢুকতেই দেন না সে ঘরে।
কর্নেল প্যাশ তখন মনে মনে দুইয়ে-দুইয়ে-চার করছে। অটো কার্ল জার্মান। তার ইংরেজি উচ্চারণ বিদেশির মতো। তিনি মাইক্রোফিল্ম তৈরি করতে পারেন। যন্ত্র নিজস্ব। ডেভেলপ করেন নিজে। ডার্করুমটা তার প্রাণ। কাউকে ঢুকতে দেন না। বাড়ির বাইরে গেলে সেটা তালাবন্ধ থাকে।
ফুকস্ আন্দাজ করতে পারে না, প্যাশের মনে তখন ঝড় উঠেছে। সে তখনও খোশগল্প চালায়। বলে, অদ্ভুত ফটো-তোলার হাত ভদ্রলোকের। বিশেষ করে ট্রিক-ফটোগ্রাফি। আমি তো ওঁর সহকারী হিসাবে পাঁচ বছর কাজ করছি, দেখেছি কী চমৎকার…আচ্ছা দাঁড়ান, ওঁর তোলা একটি ট্রিক-ফটোগ্রাফ আপনাকে দেখাই
আলমারি খুলে একটি ফটো বার করে আনে। পোস্টকার্ড সাইজ। ছবির ক্যাপশন, ‘হোয়েন কার্ল কনগ্রাচুলেটস কার্ল’। প্রফেসর কার্ল এটা ফুকসকে উপহার দিয়েছিলেন।
আশ্চর্য ছবিটা। প্রফেসর কার্ল নিজেই নিজের করমর্দন করছেন। অর্থাৎ দুপাশেই অটো কার্ল। ফুকস্ বললে, কী একটা পরীক্ষা সাফল্যমণ্ডিত হওয়ায় কার্ল নাকি এই ফটোটা তোলেন। তিনি নিজেই নিজেকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। আমি তো আজও ভেবে পাই না, কেমন করে এটা ভোলা গেল–
–সুপার-ইম্পোজিশন! দু দিকে দাঁড়িয়ে দুখানা সেলফ-ফটো নিয়েছিলেন প্রথমে, তারপর প্রিন্ট করার সময়–জাস্ট এ মিনিট…
মাঝপথেই থেমে যায় প্যাশ। পকেট থেকে ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা বার করে গভীর অভিনিবেশের সঙ্গে দু-তিন মিনিট পরীক্ষা করে ছবিটা। তারপর বলে, আশ্চর্য!
–আশ্চর্য নয়?
–না, সেজন্য নয়। আমি যে ব্যাখ্যা দিচ্ছিলাম তা ঠিক নয়। এ ছবি ‘সুপার-ইম্পোজিশন’ নয়। মানে দুবার ফটো তুলে একটি প্রিন্ট বানানো হয়নি। একবারই স্ন্যাপ হয়েছে।
-কেমন করে বুঝলেন?
প্যাশ হেসে বলেন, ডক্টর! এটা নিউক্লিয়ার ফিজিক্স নয়। কেমন করে আপনাকে বোঝাবো? ফটোগ্রাফি হচ্ছে ক্রিমিনোলজির একটি বিশেষ শাখা। এই গ্রেনগুলো লক্ষ্য করুন…ওয়েল, এককথায় এটা সুপার-ইম্পোজিশন আদৌ নয়।
–কী জানি মশাই, আমি ওসব বুঝি না।
একটু ইতস্তত করে প্যাশ বলে, আচ্ছা ফ্রাউ কার্লকে আপনি চেনেন?
–ঘনিষ্ঠভাবে। প্রফেসর কার্লের সহকারী হিসাবেই শুধু নয়, তার বিবাহ যুগ থেকে। কেন?
–আপনি ওঁকে আর একবার ফোন করুন। আমি ওঁর সঙ্গে দেখা করতে যাব। আপনিও আসুন না? অসুবিধা আছে?
-কিছু না। ফ্রাউ কার্ল আমার বান্ধবী পর্যায়ের। তার সান্নিধ্যে আধঘণ্টা সময় কাটাতে পারলে খুশিই হব আমি।
***
ফ্রাউ কার্ল অতি সুন্দরী। বয়স বছর ত্রিশেক। প্রফেসর কার্ল-এর চেয়ে অন্তত কুড়ি বছরের ছোটো। নিষ্ঠাবতী ক্রিশ্চান। কোয়েকার। জন্ম ভিয়েনায়-বাল্যকাল কেটেছে জার্মানিতে। ক্লাউস ফুকস-এর পিতা ডক্টর প্যাস্টর ফুকসের মন্ত্রশিষ্যা। ক্লাউস ফুকস-এর পিতৃদেব প্যাস্টর ফুকস্ ছিলেন তার আমলে একজন বিখ্যাত জার্মান কোয়েকার। বিশ্বভ্রাতৃত্বের পূজারী। নাৎসিদের হাতে নিগৃহীত হয়েছিলেন–জেল খেটেছেন, কিন্তু জার্মানি ত্যাগ করে যেতে অস্বীকার করেন। ফ্রাই রোনাটা কার্ল তার আদর্শে এই বিশ্বভ্রাতৃত্বে অনুপ্রাণিত, সেই সূত্রেই ক্লাউস ফুকস-এর সঙ্গে তার আলাপ। ছিপছিপে একহারা চেহারা, সাদা ধপধপে প্ল্যাটিনাম ব্লন্ড চুলের গোছা লুটিয়ে পড়েছে কাঁধের ওপর, যৌবন অটুট। এক সন্তানের জননী। সন্তানটি মারা গিয়েছে, অথচ দেখলে মনে হয় অবিবাহিতা তরুণী।
