সেটা বোঝা গেল আরও চার বছর পর। 1949-এর অগাস্ট মাসে একটি মার্কিন বি-29 বিমান কতকগুলি ফটো দাখিল করল। ওয়াশিংটনের বিশেষজ্ঞরা সেই ফটো পরীক্ষা করে বুঝলেন, সাইবেরিয়ার কোনো নির্জন অঞ্চলে রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। তাই ফটো-প্লেটে রেডিও-অ্যাকটিভিটির দাগ পড়েছে! অর্থাৎ পাল্লা এতদিনে সমান-সমান হয়েছে। এতদিনে বোঝা গেল, পটসড্যামে স্তালিন এবং মস্কো সম্মেলনে মলোটভ কেন অমন ঔদাসীন্য দেখিয়েছিলেন। কিন্তু রাশিয়ায় তো ইউরেনিয়াম নেই। কেমন করে পরমাণু-বোমা বানালো ওরা?
তখন ওরা তা বুঝতে পারেননি। ৎজিলাৰ্ডকে তো বার্জে ঠাট্টা করে একদিন বলেই ছিলেন, ফর্মুলাটা পেলেও রাশিয়া কোনোদিন অ্যাটম বোমা বানাতে পারবে না। তার ভাঁড়ারে ইউরেনিয়াম নেই। আজ এ গ্রন্থ রচনাকালে পৃথিবী অবশ্য জানতে পেরেছে এ ধাঁধার সমাধান। রাশিয়ান জিওলজিস্ট বিখ্যাত পণ্ডিত ভরনাভস্কি মহান নেতা লেনিনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার অবকাশে এ ধাঁধার সমাধানটা ঘটনাচক্রে জানিয়ে দিয়েছেন আমাদের। ভরনাভস্কি বলেছেন, 1921 সালেই লেনিন তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন রাশিয়ায় প্রত্যেকটি প্রত্যন্ত দেশে যেসব খনিজ সম্পদ আছে তার বিধিবদ্ধ অনুসন্ধান চালাতে। ওঁরা অর্থাৎ ভূতত্ত্ববিদেরা ইউরেনিয়ামের সন্ধান পেয়েছিলেন। বস্তুত লেনিন জীবিত থাকতেই (1870 1924) সোভিয়েত রাশিয়ার পাঁচ-পাঁচটি কেন্দ্রে নিউক্লিয়ার রিসার্চের কাজ শুরু হয়ে যায়। এই চারটি কেন্দ্র হল–লেনিনগ্রাডের রেডিয়াম ইন্সটিটুট এবং ফিজিক্স ইন্সটিটুট আর মক্সোর লেবেডফ ইন্সটিটুট এবং ইন্সটিটুট ফর ফিজিকাল প্রবলেম। পঞ্চম প্রতিষ্ঠানটি ছিল খারখভে অবস্থিত। অটো হানের আবিষ্কারের ঠিক পরেই রাশিয়ার শিক্ষামন্ত্রী–বৈজ্ঞানিক কাফতান-বার্লিনে এসেছিলেন। অটো হানের বিজ্ঞানাগার তিনি খুঁটিয়ে দেখেন এবং অটো হানকে নানান প্রশ্ন করে ব্যাপারটা জেনে নেন। তখনও, সেই 1939-এও, এটাকে গোপন তথ্য বলে কেউ মনে করত না। লেনিনের দূরদর্শিতা, রাশিয়ার মূল-ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম আবিষ্কার, এবং ওদের এতদিনের সাধনার কথা লৌহ-যবনিকার এপারে কেউ জানত না। প্রথম জানল ওই বি-29 প্লেনের রিপোর্ট পেয়ে, সাইবেরিয়ার আকাশে অ্যাটম-বোমা বিস্ফোরণের নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়ার পর।
***
কিন্তু সেসব কথা তো অনেক পরের। আগের কথা আগে বলি।
দুসপ্তাহের মধ্যেই কর্নেল প্যাশ এসে রিপোর্ট করল কর্নেল ল্যান্সডেলের কাছে : স্যার, জাল ক্রমশ ছোটো হয়ে আসছে। আপনার নির্দেশ অনুযায়ী পাঁচ-পাঁচটি টিমই কাজে লেগে গিয়েছে; কিন্তু আমার দৃঢ় ধারণা হচ্ছে তিনজনের মধ্যেই মূল অপরাধীকে খুঁজে পাওয়া যাবে।
-কোন তিনজন?
–ডিক ফাইনম্যান, ওপেনহাইমার অথবা অটো কার্ল।
কর্নেল ল্যান্সডেল বলেন, ফাইনম্যান আর ওপেনহাইমার সম্বন্ধে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে। ওঁদের দুজনের মধ্যে একজন যদি ডেক্সটার হন আমি বিস্মিত হব না। কিন্তু আমার এক মাসের বেতন এক বোতল হুইস্কির বিনিময়ে তোমার সঙ্গে বাজি রাখতে রাজি আছি, অটো কার্ল এর ভেতর নেই।
কৌতুক উপচে পড়ল প্যাশের দু-চোখে। বলল, স্যার, আপনার গোটা মাসের মাইনেটা এভাবে হাতিয়ে নিতে আমার বিবেকে বাধছে। যা হোক, এত বড় কথাটা কেন বললেন?
–অটো কার্ল-এর ‘অ্যালেবাই’টা আমি যাচাই করে দেখেছি। নিখুঁত, নীর। পাঁচই অগাস্ট প্রফেসর কার্ল সান্তা ফে থেকে প্লেনে চড়েন। ছয়ই সমস্তটা দিন তিনি ছিলেন নিউইয়র্কে। ছয়ই তারিখ সন্ধ্যায় তিনি স্বয়ং জেনারেল গ্রোভসসের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
–সো হোয়াট?
-কী আশ্চর্য। তুমি ভুলে গেছ প্যাশডেক্সটার ছয়ই অগাস্ট রাত্রে সান্তা ফে-র একটা আসবাগারে মাইক্রোফিল্মটি হস্তান্তরিত করে। যেহেতু ওই সময়ে প্রফেসর কার্ল সান্তা ফে থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে ওয়াশিংটনে ছিলেন তার অকাট্য প্রমাণ রয়েছে–
বাধা দিয়ে প্যাশ বলে, স্যার! ও ‘অ্যালেবাই’টা আমিও যাচাই করে দেখেছি। শুধু তাই নয়, প্রফেসর কার্লের হঠাৎ ওয়াশিংটনে আসার কোনো জোরালো যুক্তি আমি খুঁজে পাইনি–একমাত্র যুক্তি ওই ‘অ্যালেবাই’ প্রতিষ্ঠা করা। তা থেকেই আমার মনে হয়েছে
কর্নেল ল্যান্সডেল বাধা দিয়ে বলেন, তুমি পাগল না আমি পাগল বুঝে উঠতে পারছি না। কার্ল কেমন করে একই সময়ে কয়েক হাজার মাইল দূরত্বে….
–তাহলে আমার ইনভেস্টিগেশন রিপোর্টটা বিস্তারিত শুনুন
ধুরন্ধর গোয়েন্দা কর্নেল প্যাশ। প্রতিটি পদক্ষেপ তার নিখুঁত। ছয়ই অগাস্ট কার কার ‘অ্যালেবাই’ আছে প্রথমেই সে সেটা যাচাই করে দেখে নেয়। ফাইনম্যানের। নেই, ওপেনহাইমারের নেই, ৎজিলার্ডের নেই। আছে যাদের তারা হলেন–ফন নয়ম্যান, ম্যাক্স বর্ন, ক্লাউস ফুকস, অটো কার্ল প্রভৃতির। নয়ম্যান লস অ্যালামসে ছিলেন, ম্যাক্স বর্ন রুদ্ধদ্বার কক্ষে সস্ত্রীক উপস্থিত ছিলেন, ক্লাউস ফুকস্ এদিন রাত্রে সবাইকে প্রচুর মদ এনে খাওয়ায়। মদের আসরে অধিকাংশই অংশগ্রহণ করেন। একমাত্র ৎজিলাৰ্ড ও ফাইনম্যান জাপানে বোমাবর্ষণের জন্য কোনো আনন্দ উৎসবে যোগ দিতে অস্বীকার করেন। তারা দুজনে ভোজনাগার ছেড়ে চলে যান। বাকি রাত তারা কোথায় কাটান তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। আর অটো কার্ল আগের দিন থেকে ওয়াশিংটনে ছিলেন।
