তৃতীয় অনুসন্ধানী দল পরীক্ষা করবে অপর চারজন বৈজ্ঞানিককে। এই দলের কার্যপ্রণালী উপবৃত্তের আকার নেবে। কেন্দ্র একটা নয়; দু-দুটো। উপবৃত্তের এক কেন্দ্র ডি ফাইনম্যান-সেই আপাত-ছেলেমানুষ দুর্ধর্ষ প্রতিভাবান ব্যক্তিটি, এবং দ্বিতীয় কেন্দ্র অটো কার্ল।
চতুর্থ দল যাচাই করবে ভিক্টর ওয়াইস্কফ আর এনরিকো ফের্মিকে। প্রফেসর নীলস বোহরকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তার মতো অন্যমনস্ক মানুষের পক্ষে কোনো ষড়যন্ত্রে অংশ নেওয়া একেবারেই অসম্ভব।
পঞ্চম দলের লক্ষ্য একমাত্র একজন বৈজ্ঞানিক : রবার্ট জে ওপেনহাইমার।
কর্নেল ল্যান্সডেলের বিশ্বাস ‘ডেক্সটার’ একা নয়, অ্যালেক্স এবং ডাসকেও এই পাঁচটি দলের অন্তর্ভুক্ত এই বারোজনের সন্ধানকালেই হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে, হয়তো উপগ্রহ হিসাবে। কর্ণেল প্যাশকে তিনি বললেন, পাঁচটি যুনিটের জন্য পাঁচজন দলপতিকে এখনই নির্বাচিত করতে হবে, এবং তুমি থাকবে এই পাঁচজনের শীর্ষস্থানে, যোগাযোগ-রক্ষাকারী হিসাবে।
কর্নেল প্যাশ জবাবে সবিনয়ে বললেন, স্যার, আপনি যদি অনুমতি করেন তবে আমি একটি বিকল্প প্রস্তাব রাখতে চাই।
–বল।
–আপনি নিজেই এই পাঁচটি দলের শীর্ষস্থানে অধিষ্ঠিত হয়ে হোয়েলার্স-স্কোয়াড’ পরিচালনা করুন। আমি ওই পাঁচটি দলের একটি বিশেষ দলের দলপতি হতে চাই।
-কেন? কোন্ দলের?
–পঞ্চম দলের। আমি ওই ডক্টর ওপেনহাইমারের কেসটার তদন্তভার নিতে চাই।
কর্নেল ল্যান্সডেল নীরবে কিছুক্ষণ ধূমপান করেন। তারপর বলেন, ও. কে.। তাই হোক। এবার বাকি চারটি দলপতি কাকে কাকে করতে চাও বল?
-আমার মনে হয় তৃতীয় দলটিকেও আপনি দুভাগ করুন। তার কারণ প্রফেসর অটো কার্ল শীঘ্রই ইংল্যান্ডে ফিরে যাচ্ছেন, অথচ প্রফেসর ফাইনম্যান কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নিয়েছেন। একজন গোয়েন্দার পক্ষে পৃথিবীর দু প্রান্তে
-কারেক্ট। তাহলে আমাদের পাঁচজন লোকের প্রয়োজন।
প্রফেসর ফাইনম্যানের পেছনে লেগে থাকবে ম্যাককিলভি–যে ছিল লস অ্যালামসে আমাদের সিকিউরিটি অফিসর। ম্যাককিলভি আমাকে জানিয়েছে যে, ইতিমধ্যেই প্রফেসর ফাইনম্যানের বিরুদ্ধে কিছু গোপন তথ্য সংগ্রহ করেছে। ব্যাপারটা কী তা সে বলেনি, ওর মতে আরও একটু নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগৃহীত না হলে সে রিপোর্টটা দিতে পারছে না। ভাবছি, ম্যাককিলভিকে কলোম্বিয়ায় বদলি করে দেব। দ্বিতীয়ত, প্রফেসর অটো কার্ল-এর বিরুদ্ধে নিযুক্ত করতে চাই উইলিয়াম জেমস্ স্কার্ডনকে। ছোকরা আমেরিকান নয়, ব্রিটিশ-বর্তমানে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে নিযুক্ত আছে। আমার সঙ্গে দীর্ঘদিনের আলাপ। আপনি অনুরোধ জানালে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড স্কার্ডনকে হারওয়েলে বদলি করবে।
–হারওয়েল কোথায়? সেখানে কেন?
–হারওয়েল অক্সফোর্ডের কাছাকাছি একটা আধা-শহর। সেখানে একটা নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরি তৈরি হচ্ছে। পারমাণবিক-শক্তিকে যুদ্ধোত্তরকালে মানবকল্যাণে লাগানো যায় কিনা গ্রেট ব্রিটেন তাই দেখতে চায় হারওয়েলে। প্রফেসর অটো কার্ল সেই প্রকল্পে একটা চাকরি নিয়ে যাচ্ছেন। স্যার জন কক্ৰক্ট-এর অধীনে। ক্লাউস ফুকসও যাচ্ছেন সেখানে।
***
লস অ্যালামসে তখন ভাঙা হাট। শিবির ভাঙার পালা। অথবা বলা যায় ফুলশয্যা-বৌভাত মিটে যাবার পর বিয়েবাড়ির অবস্থা। দেশ-বিদেশ থেকে বরযাত্রীরা এসে জুটেছিল নিমন্ত্রণ পেয়ে। শুভকাজ নির্বিঘ্নে মিটে গেছে। পরের ঘরের মেয়ে এ বাড়িতে নববধূ হয়ে ঘোমটা টেনে বসেছে অন্দরমহনের গোপন একান্তে। এবার বরযাত্রীরা যে যার ডেরায় ফিরে যাবে। বিজ্ঞানীর দল প্রতিদিনই নতুন নতুন চাকরির নিয়োগপত্র পাচ্ছেন। ঘরোয়া বিদায়পর্ব লেগেই আছে। যুদ্ধজয়ের মাত্র দু-মাসের মধ্যে ওপেনহাইমার পদত্যাগ করলেন। কার্যভাব বুঝে নিলেন ব্র্যাডলি। ওপেনহাইমার তখন জাতীয় বীর। প্রথম মাসখানেক অভিনন্দন-সভায় উপস্থিত থাকাই ছিল তার একমাত্র কাজ। টের হাইড্রোজেন-বোমা আবিষ্কারের নতুন প্রকল্প নিয়ে মেতেছেন। ৎজিলাৰ্ড বিরক্ত হয়ে ফিরে এসেছেন এ নারকীয় মারণযজ্ঞ থেকে। অটো কার্ল আর ক্লাউস ফুৰ স্ ফিরে যাচ্ছেন ইংল্যান্ডেহারওয়েল-এ এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে, পারমাণবিক-শক্তিকে মানব কল্যাণে ব্যবহার করা যায় কিনা তাই পরীক্ষা করে দেখতে।
মার্কিন কর্মকর্তারা এতদিনে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ভেবে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ভুল বললাম, পৃথিবীর নয়, আমেরিকার। রাশিয়ার সঙ্গে একটা চুক্তিবদ্ধ হলে ভালো হয়। ওঁদের বক্তব্য : হে বন্ধু, তোমাদের অ্যাটম-বোমা নেই, আমাদের আছে–তবু বিশ্বশান্তির মুখ চেয়ে আমরা নিজে থেকেই প্রস্তাব তুলছি; এস, একটা ভদ্রলোকের চুক্তি করা যাক–আমরা দুজন কেউ কারও ওপর অ্যাটম-বোমা ঝাড়ব না।
1945 সালে মস্কোতে হল একটি মহাসম্মেলন–চতুঃশক্তির শীর্ষ বৈঠক। ফোর-পাওয়ার কনফারেন্স। অথচ কিমাশ্চর্যমতঃপরম। যাদের এ-বিষয়ে সবচেয়ে উৎসাহিত হবার কথা, তারাই ধামা চাপা দিল প্রস্তাবটা। রাশিয়ার ডেলিগেট মলোটভ বললেন, আপাতত ও আলোচনাটা মুলতুবি থাক। পরবর্তী অধিবেশনে এটা নিয়ে আলোচনা করা যাবে বরং।
আমেরিকা এটা আদৌ প্রত্যাশা করেনি। মলোটভের ঔদাসীন্যের কোনো হেতুই সেদিন বোঝা গেল না।
