তড়াক করে লাফিয়ে ওঠেন হেইসেনবের্গ। কেমন করছেন মানে? কী করছেন?
–আমার আশঙ্কা হচ্ছে, উনি আত্মহত্যার কথা ভাবছেন।
ওঁরা ধীরপদে একে একে আসেন এ ঘরে। মোমবাতি জ্বলছে বন্দিশালায়। স্তিমিত আলোকে দেখা যায় খাটের ওপর চুপ করে বসে আছেন বৃদ্ধ। চোখে উদ্ভান্ত পাগলের দৃষ্টি। হেইসেনবের্গ সন্তর্পণে এগিয়ে আসেন। হাতটা তুলে নেন তাঁর। সম্বিত ফিরে পান বৃদ্ধ। বিহুলের মতো তাকিয়ে দেখেন পুত্রপ্রতিম শিষ্যের দিকে। হেইসেনবের্গ বললেন, স্থির হোন প্রফেসর! হেরে গেছি তাতে হয়েছেটা। কী? হারতেই কি চাননি এতদিন? আপনি নিজেই তো একদিন বলেছিলেন–হিটলারের হাতে অ্যাটম বোমা তুলে দেওয়ার আগে আত্মহত্যা করব আমি।
বৃদ্ধের ঠোঁট দুটি নড়ে ওঠে। অস্ফুটে বলেন, সেজন্য নয়, ওয়ার্নার, সে জন্য নয়।
–তবে কী জন্য?
–ঐ ম্যাথমেটিক্যাল ফিগারটা। হান্ড্রেড থাউজেন্ড। টেন টু দি পাওয়ার ফাইভ।
-কিন্তু আপনি তার কী করবেন, স্যার? আপনি কেন এতটা ভেঙে পড়ছেন?
দু-হাতে মুখ ঢেকে বৃদ্ধ হাহাকারে ভেঙে পড়েন: আমি..আমিই যে ওদের প্রথম পথ দেখিয়েছিলাম মাই বয়!…আমার হাতটা আজ রক্তে লাল হয়ে গেছে…. দেখছ না! হান্ড্রেড থাউজেন্ড সোস্।
বলিরেখাঙ্কিত হাতটা বাড়িয়ে ধরেন মোমবাতির স্তিমিত আলোয়।
হেইসেনবের্গ ওঁর মাথাটা নিজের বুকের ওপর টেনে নেন। পাকা চুলে ভরা মাথার ওপর হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন। যেন বাচ্চা ছেলেকে ঘুম পাড়াচ্ছেন।
***
6.8.1945। বিজয়ী পৃথিবী আনন্দ-উৎসবে নাচছে। গোটা আমেরিকা আজ আলো-ঝকমল। কম-বেশি সবাই মাতাল। শুধু একটি লোক দৃঢ় পদবিক্ষেপে এগিয়ে আসছিল সান্তা-ফের কাছে, কাস্টিলো ব্রিজ স্টেশনের দক্ষিণতম প্রান্তে। জায়গাটা জনবিরল। লোকটার পরনে গ্রে রঙের স্যুট। মাথার টুপিটা নামানো, মুখে আলো পড়েনি। হাতে কিছু নেই। ঠোঁটে ঝুলছে সিগারেট। স্টেশনের শেষ প্রান্তে এখানটা আলো-আঁধারি। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল লোকটা। দেশলাইয়ের শেষ কাঠিটা জ্বেলে নিবে যাওয়া সিগারেটটা ধরালো। সেই আলোয় মুখের একটা আভাস দেখা গেল।
হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যে এগিয়ে এল আর একজন। বললে, পূর্বদিকে যাবার ট্রেন কখন পাওয়া যাবে বলতে পারেন?
লোকটা আগন্তুককে আপাদমস্তক দেখে নিল একবার। হা পোশাকের বর্ণনা নিখুঁত। যেমনটি হবার কথা। নীল স্যুট, সাদা-কালো ডোরাকাটা টাই, মাথায় বাউলার হ্যাট। তবু সন্দেহ ঘোচে না লোকটার। বলে, জানি না। কোথা থেকে আসছেন আপনি?
অতি নিম্নস্বরে লোকটা বলল; I come from Julius!
এতক্ষণে নিশ্চিত হওয়া গেল। শেকহ্যান্ড করল আগন্তুকের সঙ্গে। বললে, আমার নাম ডেক্সটার। আপনার?
–চার্লস রেমন্ড। হাউ ডু য়ু ডু?
ডেক্সটার বললে, কোথাও গিয়ে কিছু খেলে হত।
–আসুন। স্টেশনের কাছেই আমার জানা একটা ভালো রেস্তোরাঁ আছে।
দুজনে এগিয়ে গেল জনাকীর্ণ প্ল্যাটফর্ম দিয়ে। আর কোনো কথা হল না পথে। প্ল্যাটফর্ম টিকিট ছিল দুজনেরই। দাখিল করে বেরিয়ে এল রাস্তায়। অনতিদূরের এক পানাগারে ঢুকল দুজন। দূরের একটা আলো-আঁধারি কোণে গিয়ে বসল। তখনও দুজন নির্বাক। এতক্ষণে নজর হল ডেক্সটারের, চালর্স-এর হাতে রয়েছে। একটা অ্যাটাচি-কেস। কিন্তু ওর তো খালি হাতে আসার কথা।
ওয়েটার এসে দাঁড়ায়। দু-পেগ কনিয়াকের অর্ডার নিয়ে চলে গেল। ডেক্সটার সন্তর্পণে তার পকেট থেকে বার করে আনল একটা কাগজের টুকরো। নিঃশব্দে রাখল সেটা টেবিলের ওপর। কোনো একটা রেস্তোরাঁ-রসিদের একটা ছেঁড়া টুকরো। চালর্স নজর করলে দেখতে পেত রসিদটা ‘গোল্ডেন ড্রাগন’ পাব-এর মদের বিল। সানফ্রান্সিস্কোর একটি পানাগারের। তারিখটা চার মাস আগেকার। সে কিন্তু নজরই করল না এসব। সন্তর্পণে তার বাঁ-পকেট থেকে বার করল অনুরূপ একখণ্ড ছেঁড়া কাগজ। ডেক্সটার দুটো টুকরো পাশাপাশি জোড়া দিচ্ছিল যখন, তখন চার্লস নজর রাখছিল চারদিকে। না, কেউ লক্ষ্য করছে না ওদের। দুটি ছেঁড়া কাগজ খাঁজে খাঁজে মিলে গেল। কুচিকুচি করে কাগজটা ডেক্সটার ফেলে দিল অ্যাশট্রেতে।
ওয়েটার এসে দাঁড়াল। নামিয়ে রাখল দুটি পানপাত্র। হলুদ রংএর পানীয়। পরস্পরের স্বাস্থ্য পান করল ওরা নীরবে।
এরপর ডেক্সটার তার পকেট থেকে বার করল একটা পলমল সিগারেটের প্যাকেট। প্যাকেট থেকে সিগারেট বার করল না কিন্তু। গোটা প্যাকেটটাই চার্লস-এর দিকে বাড়িয়ে ধরে বললে, গট ম্যাচেস্?
-ইয়াহ!
চার্লস গ্রহণ করল সিগারেটের গোটা প্যাকেটটা। মুষ্টিবদ্ধ হাতটা ঢুকিয়ে দিল পকেটে। পরমুহূর্তেই হাতটা বার করে আনল। তাতে পলমলের প্যাকেটটা তো আছেই, আছে একটা লাইটারও। দুজনে দুটো সিগারেট বার করে ধরালো। ডেক্সটার এবার সিগারেটের প্যাকেটটা নিয়ে নিজের পকেটে রাখল। যার সিগারেট তার পকেটেই ফিরে গেল।
ইতিমধ্যে ঠিক ওদের পাশের টেবিলে এসে বসেছে একটি ছেলে আর মেয়ে। তাদের চোখের সামনেই ঘটল ব্যাপারটা। মেয়েটা কেমন যেন ওদের দিকে তাকাচ্ছে বারে বারে। চার্লস অস্বস্তি বোধ করছে। ইঙ্গিত করল সে বন্ধুকে। দুজনে উঠে পড়ল। অতি দ্রুতচ্ছন্দে গ্লাস দুটো শেষ করে।
ওয়েটার এসে দাঁড়াল। দাম মিটিয়ে দিল চার্লস।
ম্লান হাসল ডেক্সটার। কী আশ্চর্য! চার্লস লোকটাকে টিপস্ দিল বিলের মাত্র শতকরা দশের হিসাবে। কী কৃপণ লোকটা! ভাবছিল ডেক্সটার। আর কেউ না জানলেও ওরা দুজন এবং রেমন্ডের ডান-পকেটের ইনসাইড লাইনিংটা তো জানে, সিগারেট প্যাকেটের বদল হয়ে গেছে। লোকটার পকেটে এখন যে প্যাকেটটা আছে তার দাম মিলিয়ান নয়– বিলিয়ন ডলারের হিসাবে।
