ৎজিলাৰ্ড জবাব দিলেন না। নীরবে বেরিয়ে এলেন ব্যাঙ্কোয়েট হল ছেড়ে। উৎসব গৃহের বাইরে এসে দেখেন ফাইনম্যান অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনিও এ উৎসবে যোগদান করতে অস্বীকার করেছেন।
ৎজিলাৰ্ড ফাইনম্যানকে বললেন, আশ্চর্য। আমি ভাবতেই পারিনি ফুকস্ লোকটা এমন। লক্ষাধিক জাপানির মৃত্যুতে নোকটা পৈশাচিক উল্লাসে একেবারে নাচছে!
ফাইনম্যান বলেন, কেন প্রফেসর? আমি তো সেদিনই বলেছিলাম–
Fuchs/Looks/An ascetic/Theoretic!
***
পৃথিবীর অপর প্রান্তে ঐ ছয়ই অগস্টের রেডিও নিউজের প্রতিক্রিয়ার কথা বলি এবার :
ইংল্যান্ডে ‘ফার্ম হল’ কারাগারে সন্ধ্যা ছয়টার নিউজ বুলেটিন শুনে লাফিয়ে ওঠে কারারক্ষক মেজর রিটনার। রেডিও নিউজে বলছে, লর্ডস মাঠে অস্ট্রেলিয়া পাঁচ উইকেটে 265 করেছে। তার সঙ্গে একটা অদ্ভুত সংবাদ। আজ সকালে একটি মার্কিন বি-29 বিমান হিরোশিমায় একটা পারমাণবিক বোমা ফেলেছে। মুহূর্তমধ্যে এক লক্ষ জাপানি হতাহত। বিস্ফোরণের প্রচণ্ডতা নাকি বিশ হাজার টি.এন.টি. বোমার সমতুল। জাপানে হিরোশিমা নামে কোনো শহর আজ আর নেই।
মেজর রিটনার লোভ সামলাতে পারে না। তার বন্দিশালায় তখন আটক আছেন পরাজিত জার্মানির সর্বশ্রেষ্ঠ নিউক্লিয়ার ফিজিসিস্টবৃন্দ। যাঁদের তৈরি অ্যাটম বোমার ভয়েই এতদিন কাটা হয়ে ছিল মিত্রপক্ষ। মেজর রিটনার তৎক্ষণাৎ তলব করে বন্দিদলের বয়োজ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিকটিকে।
অনতিবিলম্বে লাঠি ঠুকঠুক করতে করতে এসে দাঁড়ালেন বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক অটো হান। ইউরেনিয়াম-পরমাণুর হৃদয় যিনি সর্বপ্রথম সজ্ঞানে বিদীর্ণ করেছিলেন, সেই বিশ্ববরেণ্য বৈজ্ঞানিক। রিটনার তাঁকে সমাদর করে বসালেন। খবরটা রসিয়ে রসিয়ে শোনালেন তাকে। শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন বৃদ্ধ অধ্যাপক। চুপ করে বসে রইলেন কয়েকটা মুহূর্ত–যেন মৌনতা অবলম্বন করছেন কোনো শোকের বার্তা শুনে। তারপর মুখ তুলে হঠাৎ বলেন, নিউজ-এ কি বলেছে, এটা পারমাণবিক বিস্ফোরণ?
-ইয়েস প্রফেসর।
বৃদ্ধ অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন আবার। তারপর হঠাৎ কী যেন মনে পড়ে যায়। চমকে উঠে আবার বলেন, এক্সকিউজ মি! কী বললেন তখন? হান্ড্রেড থাউজেন্ড জাপানি মারা গেছে একটি বিস্ফোরণে?
-ইয়েস প্রফেসর। তাই তো বলল রেডিওতে।
হানড্রেড থাউজেন্ড! একলক্ষ!-বৃদ্ধ উঠে দাঁড়াতে গেলেন। পারলেন না। টলে পড়লেন সোফায়। মেজর রিটনার ছুটে আসে। ওঁর নাড়ির গতি পরীক্ষা করে তৎক্ষণাৎ কিছুটা ব্রান্ডি খাইয়ে দেয়। বলে, আপনি এখানেই কিছুক্ষণ বিশ্রাম করুন বরং…..
“থ্যাঙ্কু মেজর। হ্যাঁ তাই করতে হবে। আমি….ঠিক…মানে দাঁড়াতে পারছি না।
সন্ধ্যা সাতটায় বন্দিদের নৈশ আহার পরিবেশন করা হল। বন্দি-বিজ্ঞানীরা। যে-যার চিহ্নিত চেয়ারে গিয়ে বসলেন। ফন লে, ওয়াইৎসেকার, গেলার্চ, উইটজ, হেইসেনবের্গ প্রভৃতি। দলে ওঁরা দশজন। হঠাৎ সকলের নজর পড়ল টেবিলের মাঝখানের সিটটা খালি। প্রফেসর অটো হান আসেননি। তিনিই বয়োজ্যেষ্ঠ, সর্বজনশ্রদ্ধেয়। মাঝখানের চেয়ারখানা তাঁর।
ডক্টর কার্ল উইটজ বললেন, প্রফেসর হানকে মেজর রিটনার ডেকে পাঠিয়েছিল ঘন্টাখানেক আগে। এখনও ফিরলেন না কেন তিনি? তোমরা অপেক্ষা। কর, আমি ওকে নিয়ে আসি।
মিনিট-দশেক পবে ডক্টর উইটজ-এর কাঁধে ভর দিয়ে বৃদ্ধ অধ্যাপক এলেন।
–কী হয়েছে স্যার? আপনি কি অসুস্থ?
-না না, আমার কিছু হয়নি। একটা খবর আছে। এইমাত্র বি. বি. সি. রেডিও ব্রডকাস্ট করেছে….
খবরটা বিস্ফোরকের মতোই ফাটল-কিন্তু কেউ কোনো শব্দ করল না। পুরো দেড় মিনিট।
স্তব্ধতা ভেঙে প্রফেসর হানই প্রথম কথা বললেন। ইতিমধ্যে তিনি সামলেছেন অনেকটা। হেসে বললেন, হেইসেনবের্গ, মাই বয়। তুমি হেরে গেছ। আমেরিকান বৈজ্ঞানিকদের কাছে। তোমার স্থান এখন দ্বিতীয় সারিতে।
দ্বিতীয় সারি! প্রফেসর হেইসেনবের্গ জীবনে কোনো পরীক্ষায় কখনও দ্বিতীয় হননি। ম্লান হাসলেন তিনি। বললেন, ইয়েস প্রফেসর। সে কথা আর বলতে!
সহ্য হল না ওয়াইৎসেকার-এর। বললেন, না! আমেরিকান-বৈজ্ঞানিকদের কাছে নয়।
-নয়?
-না, প্রফেসর হান। আমরা হেরে গেছি হিটলারের ইহুদি-বিদ্বেষ নীতির কাছে। আমেরিকান কে? আইনস্টাইন, ম্যাক্স বর্ন, জেমস ফ্রাঙ্ক, নীলস বোহর? নাকি ৎজিলাৰ্ড, টেলার, ফের্মি, ফুস্, ওয়াইসকফ, কিস্টি, রবিননাভিচ? কে? কে আমেরিকান?
মাথা নেড়ে প্রফেসর হান বলেন, আমি জানি না–এ বোমা কে বানিয়েছে। আমি শুধু জানি, আমার অপরাজিত শিষ্য হেইসেনবের্গ আজ দ্বিতীয় সারিতে।
–আমি স্বীকার করছি, স্যার। মাথাটা নিচু করলেন হেইসেনবের্গ।
কিন্তু অত সহজে ওয়াইৎসেকার মেনে নিলেন না এ অভিযোগ। দৃঢ়স্বরে বললেন, আমি মানি না একথা। হিটলারের হাতে তুলে দেব না বলেই আমরা ওটা বানাইনি–না হলে ওদের আগে, অনেক-অনেক আগে ওটা তৈরি করতে পারতাম আমরা।
আহারান্তে রাত নয়টায় বিস্তারিত রেডিও বুলেটিন শুনলেন ওঁরা। তারপর একে একে যে যার বিছানায় চলে গেলেন। শুভ রাত্রি’ ঘোষণা করার কথা আজ আর কারও মনেও পড়ল না। হলের মধ্যে আটখানা খাট পাতা আর বয়োজ্যষ্ঠ দুজনের জন্য আছে একটি পৃথক ঘর। ফন লে আর অটো হানের ঘর। সকলেই শুয়ে পড়েছেন, কিন্তু ঘুম আসছে না কারও। হঠাৎ রাত দুটোর সময় প্রফেসর ফন লে এ ঘরে এসে বললেন–তোমরা একবার ও ঘরে চল। প্রফেসর হান যেন কেমন করছেন!
