পৃথিবীর বুক থেকে মুছে গেছে একটা জনপদ। তার নাম হচ্ছে, হচ্ছে নয়, ছিল–হিরোশিমা!
***
পরদিন সাতই অগাস্ট সকাল নয়টার সময় টোকিও শহরপ্রান্তে একটি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল একটি মিলিটারি জিপ। একজন মিলিটারি অফিসার এসে কড়া নাড়লেন দরজায়। কিমোবনা-পরা এক বৃদ্ধ বার হয়ে এলেন : কী চাই?
প্রফেসর নিশিনা, এখনই আমার সঙ্গে আসতে হবে। গতকাল থেকে আমরা হিরোশিমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারছি না। না টেলিফোনে, না রেডিওতে। এইমাত্র খবর পেলাম সেখানে নাকি একটা-আজ্ঞে হ্যাঁ, একটা মাত্ৰ-বোমা পড়েছে। তাতে শহরটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আপনি এসে দেখুন।
প্রফেসর য়োমিও নিশিনা হচ্ছেন জাপানের সবচেয়ে বড় নিউক্লিয়ার ফিজিসিস্ট। নীলস বোহর-এর সঙ্গে কাজ করতেন। অটো হানের বন্ধু!
মুহূর্তমধ্যে তৈরি হয়ে নিলেন নিশিনা।
জিপে উঠতে যাবেন এক সাংবাদিক দৌড়ে এল। বললে, প্রফেসর, ওরা বলছে এটা পরমাণু বোমা। এইমাত্র মার্কিন ব্রডকাস্ট শুনে এলাম। নির্জলা মিথ্যা প্রচার। কী বলেন?
-আমি তো এখনও কিছুই দেখিনি। যা শুনছি তাতে মনে হয়…মিথ্যা নয়।
যা দেখলেন তাতে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন প্রফেসর নিশিনা। তবু মনোবল হারাননি। সমস্ত দিন অম্লত অভুক্ত বৃদ্ধ প্রফেসর ধ্বংসস্তু’ পরিদর্শন করলেন, মাপ-জোখ নিলেন–যেস্থানের ওপর বোমাটা ফেটে পড়েছিল সেখানে মাটি খুঁড়ে রেডিও-অ্যাকটিভিটির পরিমাণ নিরূপণ করলেন নিজের বিপদ তুচ্ছ করে (চার মাস পরে তাঁর দেহে রেডিও-অ্যাকটিভিটির লক্ষণ দেখা যায় এবং দীর্ঘদিন তিনি নার্সিংহোমে চিকিৎসাধীন ছিলেন)। দুদিন পরে (9 অগাস্ট) ক্লান্তদেহে ফিরে এলেন যখন টোকিওতে, তখন উনি জানেন… তাপমাত্রা কতটা উঠেছিল, কত উঁচুতে বোমাটা ফেটেছিল, বায়ুর গতি কতটা হয়েছে, কতটা টি.এন.টি. বোমার বিস্ফোরণের সমতুল্য এই দুর্ভাগ্য। পরে হিসাব কষে দেখা গেছে প্রফেসর নিশিনার এই প্রাথমিক হিসাব নিখুঁত হিসাবের 97 শতাংশ নির্ভুল।
টোকিওতে ফিরে এসেও রেহাই নেই। মিলিটারির লোকেরা বাড়ি যেতে দিল না ওঁকে। সোজা নিয়ে গেল সমরদপ্তর।
একজন সামরিক বড়কর্তা বললেন, প্রফেসর। কতদিন লাগবে অমন বোমা তৈরি করতে? মাসছয়েক পর্যন্ত আমরা ওদের ঠেকিয়ে রাখতে পারি।
প্রফেসর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, বর্তমান পরিস্থিততে ছয় মাস কেন, ছয় বছর লাগা উচিত। আর আপনারা একটা কথা খেয়াল করছেন না–জাপানে। ইউরেনিয়াম ধাতু আদৌ নেই।
প্রফেসর। এই নতুন বিপদ থেকে উদ্ধারের কোনো পথই কি আপনি দেখাতে পারেন না? ক্লান্ত প্রফেসর বললেন, পারি। জাপান ভূখণ্ডের ওপর কোনো মার্কিন বিমান এসে পৌঁছাবার আগেই তাকে গুলি করে নামাতে হবে। সমুদ্রে।
এতক্ষণে নিশিনা ছুটি পেলেন। প্রায় মাতালের মতো টলতে টলতে ফিরে এলেন সমরদপ্তর থেকে নিজ আবাসে। বাড়িতে ঢুকেই দেখেন সেখানে অপেক্ষা করছেন দুজন সামরিক অফিসার। ওঁকে দেখেই একজন লাফিয়ে ওঠেন: প্রফেসর। এখনি আমার সঙ্গে একবার আসতে হবে। নাগাসাকির সঙ্গে আমাদের সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ওরা কোনো সাড়া দিচ্ছে না। না টেলিফোন, না রেডিওতে! কী হতে পারে বলুন তো?
***
পরমাণু-বোমার সাফল্যে ম্যানহাটান-প্রজেক্টে যে অবিমিশ্র আনন্দের হিল্লোল বয়ে গিয়েছিল এমন কথা বলতে পারি না। ৎজিলাৰ্ড বলেছিলেন, ছয়ই অগাস্ট তারিখটা আমার জীবনে একটা কালো দিন। আইনস্টাইন, ফ্রাঙ্ক, রোবিনোভিচ প্রভৃতি মর্মাহত হয়েছিলেন এ সংবাদে। উইনি হিগিবথাম নামে একজন বৈজ্ঞানিক রেডিওতে খবর শুনে মাকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘যে কাজ এতদিন ধরে করলাম তার জন্য বিন্দুমাত্র গর্ববোধ করছি না। I am afraid that Gandhi is the only real disciple of Christ at present!’
আর একজন বাস্তুচ্যুত জার্মান কবি হেরম্যান হেজভর্ন লিখলেন একটা এপিক কবিতা
The Bomb that Fell on America
তার একস্থানের অনুবাদ :
“বোমাটি পড়ল মার্কিন মুলুকে–মাটিতে নয়, মাথায়।
কই? মানুষগুলো ছাই হয়ে গেল না তো?
যেমন গেছিল হিরোশিমায়?
না! মানুষের দেহ রইল অবিকৃত।
বিকৃত শুধু মন!
গলে পচে খসে পড়ছে মানুষের অন্তঃকরণ!
সর্বজনশ্রদ্ধেয় আর নরাধম এক সারিতে এসে দাঁড়াল।
হারিয়ে গেল একটা সেতু….অতীতের সঙ্গে বর্তমানের।
এতদিনের শক্ত পৃথিবীটা প্রকাণ্ড জেলির মত থকথকে।
ক্লেদাক্ত পূতিগন্ধময় কৃমিকুণ্ড একটা।
না! পৃথিবীটা নেই। হারিয়ে গেছে!
এ আমরা কী করলাম!
হে আমার স্বদেশবাসী। এ তোমরা কী করলে!”
এজাতীয় চিন্তা করার মানুষ কিন্তু মুষ্টিমেয়। লস অ্যালামসে অধিকাংশই সেদিন আনন্দে আত্মহারা। জ্বলন্ত মশাল হাতে শোভাযাত্রায় পথে নেমেছে সবাই। নাচে গানে হৈ-হল্লায় ফেটে পরছে। সবাই সবাইকে অভিনন্দন জানাচ্ছে।
ক্লাউস ফুকস্ বললে, আজ উৎসব হবে। সারারাত সবাই নাচব। ভোজের আয়োজন কর। খানা, পিনা ঔর নাচনা! দাঁড়াও গাড়িটা বার করি। মদের বন্যা বইয়ে দেব।
ফুকস্ বেরিয়ে গেল তার গাড়িটা নিয়ে সান্তা-ফের দিকে। সান্তা-ফে লস অ্যালামস থেকে মাইল চব্বিশ ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যেই প্রচুর মদ কিনে ফিরে এল আবার। মধ্যরাত পর্যন্ত চলল মদ্যপানের আসর। একমাত্র প্রফেসর ফ্রাঙ্ক সস্ত্রীক উঠে চলে গিয়েছিলেন। এক লক্ষ জাপানির মৃত্যুকে মদ্যপানের মাধ্যমে অভিনন্দিত করতে তিনি গররাজি। ফুকস্ মদ নিয়ে ফিরে আসার পর উঠে গেলেন ৎজিলাৰ্ড আর ফাইনম্যান। তাঁরাও উৎসবে যোগদান করতে অস্বীকার করলেন। ফুকস্ বলে, প্রফেসর ৎজিলাৰ্ড!
