একটিমাত্র পারমাণবিক বোমায় কতটা ক্ষতি হতে পারে সেটা নির্ধারণ করার উদ্দেশ্যে অনেক আগে থেকেই নির্দেশ জারি করা হয়েছিল–ঐ পাঁচটি শহরে আদৌ কোনো সাধারণ বোমা বর্ষণ করা হবে না। ঐ পাঁচটি শহরবাসী তাদের দুর্লভ সৌভাগ্যে এতদিন উৎফুল্ল ছিল। তাদের ধারণা–এটা নিতান্তই কাকতালীয় ঘটনা। তারা জানত না যে, তারা একদল সাইকোপ্যাথের জিয়ানো কই মাছ।
.
১৩.
ছাব্বিশে জুলাই পটন্ড্যাম থেকে ঘোষিত হল তিন বিশ্ববিজয়ীর শেষ চরমপত্র : অবিলম্বে জাপান যদি আত্মসমর্পণ না করে তবে চরম সর্বনাশ অনিবার্য।
তারপর যা ঘটেছে তা সর্বজনবিদিত ইতিহাস। বাস্তবপক্ষে স্তালিন জার্মানিতে এসে পট্ল্ড্যামে মিলিত হবার আগেই জাপান রাশিয়ার কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল–সে নাকি আত্মসমর্পণ করতে চায়। রাশিয়া যেন মধ্যস্থতা করে। স্তালিন জাপানকে সে সুযোগ দেননি। সে ইতিহাস আমি বিস্তারিত বলেছি আমার ‘জাপান থেকে ফেরা’ গ্রন্থে। পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। মোটকথা জাপানের জবাব কী হবে তা ধরে নিয়েই যাবতীয় ব্যবস্থা ঘড়ির কাঁটা ধরে করা হচ্ছিল। গ্রোভস-এর। ভাষায়, ‘কোটি কোটি ডলার খরচ করে আমরা কী বানালাম তা পাঁচজনকে না দেখালে কৈফিয়ৎ দেব কী?’ অন্যত্র–
‘No need to get so excited! It’s better for a few thousand Japs to perish than a single of our boys.’
: ‘অতটা উত্তেজিত হবার কী আছে? আমাদের একটা ছোকরার প্রাণ রক্ষা করতে কয়েক হাজার জাপানিকে প্রয়োজন হলে প্রাণ দিতে হবে বৈকি।
এসব যুক্তি আপনারা শুনেছেন। খবরের কাগজে পড়েছেন। বোধকরি শোনেননি তার জবাবটা। খ্রিস্টান পাদরি শীল ওর প্রত্যুত্তরে যে কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন–
‘ঠিক ঐ যুক্তিই একদিন দেখিয়েছিলেন হিটলার-হল্যান্ডে বোমাবর্ষণের আগে, অথবা ইহুদি নিধনযজ্ঞকালে!
সে যাই হোক, ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে এগিয়ে চলেছে। জাপান জানে না, পৃথিবী জানে না সে কথা। প্রশান্ত মহাসাগরের এক অখ্যাত দ্বীপে একটি ব্রহ্মাস্ত্র। প্রহর গুনে চলছে। টাইম-বম্ব! কোনো দুর্ঘটনা না হলে সে বোমা ফাটবেই!
দুর্ঘটনা ঘটেছিল। একটা নয়–দু-দুটো। তবু হিরোশিমা মুক্তি পেল না।
প্রথম দুর্ঘটনা–’ইন্ডিয়ানাপোলিস্’ যুদ্ধ জাহাজ জাপানি সাবমেরিনে সলিলসমাধি লাভ করল। ঐ জাহাজেই পাঠানো হয়েছিল পরমাণু বোমাটিকে, আমেরিকার কোনো বন্দর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট দ্বীপপুঞ্জে। জাহাজের ক্যাপ্টেনও জানতো না, কি মহামূল্য সম্পদ সে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নৌবাহিনীর চিরাচরিত রীতি লঙ্ঘন করে তাকে যে আদেশ দেওয়া হয়েছে তাতে সে স্তম্ভিত হয়ে গেছে! ডেক-এর উপর ঐ যে বিচিত্র বস্তুটি রাখা আছে ঐটাকে বাঁচাতে হবে–প্রয়োজনবোধে আকাপ্টেন জাহাজের সমুদয় নাবিকের জীবনের বিনিময়েও। জাহাজ ডুবে গেলেও ওটা সমুদ্রে ভাসবে এমন বন্দোবস্ত করা আছে। ইন্ডিয়ানাপোলিস এই অভিযান থেকে ফিরে আসেনি নিরাপদ বন্দরে–জাপানি সাবমেরিনে সেটা ডুবে যায়–কিন্তু নিরাপদে ওই অজানা বস্তুটি প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট বন্দরে নামিয়ে ফিরে আসার পথে।
দ্বিতীয় দুর্ঘটনাটা রাজনৈতিক। চৌঠা জুলাই গ্রেট ব্রিটেনে গণভোট হয়। পটসড্যামে যখন মহাসম্মেলন চলছে তখন ব্রিটেনে ভোটের গুনতি হচ্ছে। চার্চিল নিশ্চিন্ত ছিলেন সাফল্যের বিষয়ে–এত বড় বিশ্বযুদ্ধে তিনি বিজয়ী। তবু ফলাফল ঘোষিত হবার পূর্বমুহূর্তে তিনি ফিরে এলেন স্বদেশে। ছাব্বিশে জুলাই মধ্যরাত্রে ঘোষিত হল পল্ড্যামের শেষ হুঙ্কার আর ঐ দিনই শেষ রাত্রে হল নির্বাচনের ফলাফল। চার্চিল হেরে গেছেন! বিকাল চারটার সময় চার্চিল এলেন বাকিংহাম প্যালেসে। পদত্যাগপত্র দাখিল করতে। এতবড় আঘাত আর অপমান তিনি কল্পনাই করেননি। বেরিয়ে যাওয়ার মুখে সাংবাদিকদের শুধু বলেছিলেন–”আমি দুঃখিত, যুদ্ধটা চূড়ান্তভাবে শেষ করার সুযোগ আমাকে দেশবাসী দিল না। তবে জাপানের পতন আসন্ন। আজ্ঞে হ্যাঁ আপনারা যত তাড়াতাড়ি ভাবছেন, তার আগেই। তার ব্যবস্থাও আমি করে এসেছি।
ছয়ই অগাস্ট, রাত্রি দুটো পঁয়তাল্লিশ মিনিট। তিনটি বিমান রওনা হল জাপানের দিকে। একটি বোমারু বিমান-নাম ‘এনোলা গে’। তার গর্ভে একটি মাত্র বোমা। প্রকাণ্ড বোমা, অথচ তার নাম লিটল বয়’!! তার পাইলট কর্নেল টিবেট এবং বোমারু ক্যাপ্টেন পার্সন জানে কী বস্তুটি। আর কেউ তা জানে না। সকাল আটটা পনেরো মিনিটে রেডিওতে নির্দেশ এল-নির্বাচিত তিনটি শহরের সবগুলিতেই যদি আবহাওয়া খারাপ থাকে তবে বোমাবর্ষণ না করেই ফিরে এস।
পরপর তিনটি শহরের নাম মনে আছে পাইলটের: হিরোসিমা, ককুরা আর নীগাতা।
নটা বেজে পনেরো। বিমান তখন 9,632 মিটার উঁচুতে, গতিবেগ ঘন্টায় 525 কিমি। পিছনে পিছনে আসছে দুটি ফাইটার প্লেন।
দূরে দেখা গেল হিরোশিমা। ইতিপূর্বে বোমাবর্ষণ হয়নি সেখানে। শহরবাসী নিশ্চিন্ত।
পার্সন বোতামটা টিপল। বোমাটা বেরিয়ে যেতেই খানিকটা লাফিয়ে উঠল প্লেনটা। পরক্ষণেই প্লেনের মুখটা ঘুরিয়ে দিল টিবেট। ফুলস্পীড! পালাও পালাও।
হঠাৎ আলোয় আলো হয়ে উঠল সমস্ত জগৎ। পরমুহূর্তেই একটা ধাক্কা খেল প্লেনটা। কয়েক সেকেন্ড পরে আবার একটা ধাক্কা। প্রথমটা প্রাথমিক বিস্ফোরণের। বিস্ফোরণ হয়েছে মাটি থেকে দু-হাজার ফুট (600 মিটার) ওপরে। দ্বিতীয়টা সেই বিস্ফোরণের প্রতিঘাত। পৃথিবীর বুকে আঘাত খেয়ে শব্দতরঙ্গের প্রতিধ্বনি। প্লেনটা তখন পনের মাইল (24 কিমি) দূরে।
