ভ্রমণকাহিনীর উপসংহারে ট্রুম্যান লিখেছেন
“It is a demonstration of what can happen when a man over reaches himself…. I never saw such destruction. I don’t know whether they learned anything from it or not.”
অর্থাৎ মানুষ তার ক্ষমতার বাইরে হাত বাড়ালে কী পায় তারই প্রদর্শনী যেন!… আমি এমন ধ্বংসস্তূপ কখনো দেখিনি। জানি না, ওরা এ থেকে আদৌ কোনো শিক্ষা পেল কিনা।
ইতিহাস এর জবাব দিয়েছে। ওরা কোনো শিক্ষা পাক আর না পাক, প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান যে কোনো শিক্ষাই পাননি তার প্রমাণ হিরোশিমা এবং নাগাসাকি!
When a man over-reaches himself….
পরদিন সতেরোই জুলাই সকালে মার্কিন যুদ্ধসচিব এসে দেখা করলেন প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের সঙ্গে। বাড়িয়ে দিলেন একটি টেলিগ্রাফ। তাতে লেখা–সন্তান নির্বিঘ্নে জন্মলাভ করেছে।
চার্চিল আনন্দে আত্মহারা। তখনই দেখা করলেন ট্রম্যানের সঙ্গে। পরামর্শ দিলেন–এ কথা স্তালিনকে ঘুণাক্ষরেও জানাবার প্রয়োজন নেই। তুরুপের টেক্কা লুকিয়ে রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। শুধু দেখতে হবে, রাশিয়া যেন এই শেষ মওকায় জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা না করে বসে। তাহলেই তাকে লুটের ভাগ দিতে হবে। জাপানের সঙ্গে রাশিয়ার বর্তমানে আনাক্রমণাত্মক চুক্তি বজায় আছে। তাই থাক। স্তালিন যেন অ্যাটম বোমার কথা জানতে না পারে। ট্রম্যানের এটা ঠিক পছন্দ হল না। চার্চিল তাঁর সঙ্গে একমত হলেন না। ঐদিনই পটসড্যামে এসে উপস্থিত হলেন ইউরোপ-খণ্ডে মিলিত মিত্র বাহিনীর সেনাপতি জেনারেল আইসেনহাওয়ার। অ্যাটম-বোমার বিষয়ে বিন্দুবিসর্গও তিনি জানতেন না। সব কথা শুনে তিনি নাকি বলেছিলেন আশা করি এমন অস্ত্র আমাদের ব্যবহার করতে হবে না।
অথচ ঐদিনই ট্রুম্যান তাঁর দিনপঞ্জিকায় লেখেন—
“I then agreed to the use of the A-bomb if Japan did not yield.’
–অর্থাৎ সেই দিনই ঠিক করলাম জাপান আত্মসমর্পণ না করলে আমি। পরমাণু-বোমা ব্যবহার করব।
অবশেষে স্তালিন এসে পৌঁছালেন পটসড্যাম-এ। শুরু হল ঐতিহাসিক অধিবেশন। তিন রাষ্ট্রের প্রধান, তাঁদের ধুরন্ধর রাজনৈতিক সহকর্মী আর দোভাষীদের দল। যুবরাজ উইলহেমের ঐতিহাসিক প্রাসাদ গমগম করছে। যুদ্ধকালে এটা হাসপাতালরূপে ব্যবহৃত হয়েছিল। যুদ্ধান্তে হাসপাতাল সাফা করে এই সম্মলনের ব্যবস্থা হয়েছে। হাসপাতাল ছিল নাৎসি জার্মানির। জার্মানরা রাজপ্রাসাদের ভিতর একটি ফুলের বাগান বানিয়েছিল। এত বোমা-বর্ষণেও ফুলগাছগুলি নিঃশেষিত হয়নি। হল এই অনুষ্ঠানে। ফুলগুলো তুলে এনে ওরা বিজয়-উৎসবের তোড়া বাঁধল। হল-এর কেন্দ্রস্থলে রাখা ছিল এক হাজার জেরেনিয়াম ফুলের প্রকাণ্ড একটা ‘রেড স্টার’–স্তালিনকে সম্বর্ধনা জানাতে।
এক সপ্তাহে ধরে চলল অধিবেশন। পৃথিবীর ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হল। ফিলিপাইন, ভারতবর্ষ, পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, জার্মানির ভবিষ্যৎ লিপিবদ্ধ হল। স্তালিন বললেন, ইতিপূর্বে তিনি বলেছেন–জার্মানির পতনের তিন মাসের মধ্যেই তিনি জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন। তিনমাস প্রায় পূর্ণ হয়ে এসেছে। এখন সময় হয়েছে নিকট, অনুমতি পেলেই তিনি জাপানের সঙ্গে বাঁধন ছিঁড়তে প্রস্তুত। চার্চিল ভাব দেখাচ্ছেন, তুমি আর কেন মিছে কষ্ট করবে ভাই? আমরা দুজনেই ব্যাপারটা ম্যানেজ করে নেব।
সম্মেলন শেষ হয়ে এল প্রায়। ট্রুম্যান প্রতিদিনই স্তালিনকে মারাত্মক সংবাদটি জানাবেন মনে করেন, অথচ হয়ে ওঠে না। চার্চিল এর ঘোরতর বিরোধী। হয়তো তাই ইতস্তত করছিলেন।
উনিশে জুলাই প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান সকলকে নৈশভোজে আপ্যায়ন করলেন। বিরাট আয়োজন। খানা আর পিনার অঢেল ব্যবস্থা। ডিনারের সময় পিয়ানো বাজাল মার্কিন বাহিনীর সার্জেন্ট ইউজিন লিস্ট। ভাল পিয়ানোর হাত ছিল ছোকরার। বাজালো ‘এ মাইনর’, ওপাস 42-এ শর্পা-র একখানা বিখ্যাত ওয়ালটজ। চমৎকার বাজালো। সঙ্গীত শেষ হতেই মহান নেতা স্তালিন প্রস্তাব করলেন, সঙ্গীতজ্ঞের সম্মানে ওঁরা তিন নেতা একটি ‘টোস্ট’ দেবেন। তৎক্ষণাৎ তিন নেতা মদের পাত্র হাতে এগিয়ে এলেন মার্চ করে। সার্জেন্ট লিস্ট-এর নাকের ডগায় এসে পানপাত্র তুলে ধরে তার স্বাস্থ্য পান করলেন। অ্যাডমিরাল লেহি তার স্মৃতিচারণে লিখেছেন–উৎসব শেষে সার্জেন্ট লিস্ট ওঁকে বলে, স্যার যুদ্ধের সময় অনেকবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি, কিন্তু এমন আতঙ্কগ্রস্ত আমি জীবনে হইনি। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি স্তালিন, চার্চিল আর আমাদের প্রেসিডেন্ট মার্চ করে আমার দিকে এগিয়ে আসছেন।
তার দুদিন পরে একুশে জুলাই ডিনার ‘থ্রো করলেন কমরেড স্তালিন। ট্রুম্যান সাহেবের ওপর টেক্কা ঝাড়লেন তিনি। আগেকার ভোজের থেকে পাঁচ কোর্স বেশি খাবার এল। শুধু তাই নয়, ইতিমধ্যে তাঁর নির্দেশে একটি জঙ্গী বিমানে মস্কো থেকে এসে উপস্থিত হল শ্রেষ্ঠ পিয়ানোবাদকের দল। আগের দিন খানাপিনা মিটেছিল রাত একটায়–এবার রাত দেড়টা পর্যন্ত চলল সঙ্গীতের আসর। আধ ঘন্টা বেশি। চার্চিল মশাই নাকি গান ভালবাসেন নানা শেক্সপীয়র পড়ে কোনো অনুসিদ্ধান্ত হিসাবে এটা আমি অনুমান করছি না। তিনি নিজেই তা লিখেছেন:
