–কী অর্থ কবিতাটার?
–হে পরমপিতা! আপনার আকাশস্পর্শী তেজোময় নানাবর্ণযুক্ত ঐ বিস্ফারিত মুখমণ্ডল এবং উজ্জ্বল চোখের দিকে তাকিয়ে আমার হৃদয় আজ ব্যথিত। আমি ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছি, আমি ‘শম’ অর্থাৎ শান্তি হারিয়ে ফেলেছি।
অধ্যাপক ফ্রাঙ্ক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আশ্চর্য কবিতা। ঐ কথাটাই ঠিক মনে হচ্ছিল আমার। জার্মান ভাষায় অবশ্য। এ বিস্ফোরণে একটা জিনিস হারিয়ে গেল শুধু–সেটা শান্তি! আমার হৃদয়ও আজ ব্যথিত।
গ্রোভস অনতিবিলম্বে একটি টেলিগ্রাফ করেন পটসড্যামে, যুদ্ধসচিব স্টিমসনকে–
“সন্তান নির্বিঘ্নে জন্মলাভ করেছে। স্বাস্থ্যবান শিশু। সে হাইহোল্ডে* [*হাইহোল্ড স্টিমসনের বাড়ি। গ্রোভসের অফিস থেকে তার দূরত্ব কত তা টেলিগ্রাফক্লার্ক না বুঝলেও স্টিমসন বুঝবেন।] থাকলেও এখানে বসে তাকে দেখতে পেতাম। তার চিল্লানি এখান থেকে আমার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাবে।”
টেলিগ্রাফটা পাঠানো হল পটসড্যামে। জার্মানিতে। যুদ্ধসচিব তখন সেখানে। শুধু তিনি একা নন। হ্যারি ট্রুম্যানও। ঐ পটসড্যামে।
পটসড্যাম।
সাধারণজ্ঞানের প্রশ্নপত্রে প্রশ্নটা করে দেখবেন : পটসড্যাম কোথায়? কীজন্য বিখ্যাত?
শতকরা নিরানব্বই জন ছাত্র লিখবে নির্ভুল উত্তর-’বার্লিন শহরের দক্ষিণপশ্চিম শহরতলি। বার্লিনের পতনের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে এখানে বিজয়ী মিত্রপক্ষের শীর্ষ সম্মেলন হয়েছিল। এখান থেকেই জাপানকে নতজানু হবার আদেশ প্রচারিত হয়।
শতকরা একজন হয়তো ভুল উত্তর লিখে বসবে। খোঁজ নিয়ে দেখবেন, বেচারি ফিজিক্স কিংবা ম্যাথুসের। ভুল উত্তর লেখায় নিশ্চয় তাকে আপনি নম্বর দেবেন না। বোকাটা লিখেছে: পটসডামে আলবার্ট আইনস্টাইনের বাড়ি। বিতাড়িত হবার পূর্ব জীবনের কুড়িটি বছর তিনি ওখানে কাটিয়েছেন।
স্থান-কাল-পাত্র। একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। স্থানটাকে আপাতত ধ্রুবক বলে ধরে নিন–দেখবেন, পাত্র কাল এর সঙ্গে তাল রেখে চলছে। ধরুন কালটা বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় দশক। দেখবেন, পটসড্যামের রাস্তায় সারি সারি পপলার গাছের তলা দিয়ে প্রত্যষে প্রাতভ্রমণে বার হয়েছেন একজন প্রোঢ়। সারা শহরতলি তখন ঘুমোচ্ছে, কুয়াশার ঘোর ভেদ করে পুবআকাশ থেকে সোনালি হাতছানি এসে পড়েছে ভ্রমণরত প্রৌঢ় মানুষটির কালো ওভারকোটে। ওঁর এক হাতে ছড়ি, অপরহাতে ধরা আছে কুকুরের চেন। মুখে মোটা চুরুট। সারা শহরতলি ঘুমোচ্ছে, শুধু কৌতূহলী একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছুটছে তাঁর পিছন পিছন–ওঁরই চুরুটের ধোঁয়া। অনুগামী ধূমকুণ্ডলী আর অগ্রগামী কুকুর, মাঝখান চলছেন আইনস্টাইন। শুধু ঐ কুকুরটাই নয়, প্রৌঢ় বৈজ্ঞানিককে পিছনে ফেলে আগে আগে ছুটছে আরও একটা জিনিস। সেটা ঐ বৈজ্ঞানিকের চিন্তাধারা। শুধু বৈজ্ঞানিককেই নয়, বিশ্বকেই যেন কয়েক দশক পিছনে ফেলে যেতে চায় সেটা।
বদলে দিন ‘কাল’টাকে। এগিয়ে আসুন দশক দুয়েক। আমাদের এ কাহিনির বর্তমান পটভূমিতে। 1945 সালের ষোলোই জুলাই। ট্রিনিটি টেস্টের ঐ চিহ্নিত দিনে। দেখবেন পাত্রও বদলে গেছে। পরিবেশটাও। সেই নীলআকাশ-সন্ধানী পপলারগুলি উলীত। শহরতলি ঘুমোচ্ছে না–সেটা শ্মশান। পথের ধারে ধারে আর কারনেশান-ডায়ান্থাস্- হলিহক নেই, আছে কংক্রিটের চাংক–ইটের স্তূপ আর মিলিটারি ডিসপোসালের শূন্যগর্ভ ক্যান। এবার পাত্রত্রয় হচ্ছেন বিজয়দপী তিন যুদ্ধবাজ–চার্চিল, ট্রুম্যান আর স্তালিন।
যুদ্ধের সময় তিন প্রধান একাধিকবার মিলিত হয়েছিলেন। কুইবেক-এ, তেহেরান-এ এবং ইয়ালটায়। ট্রুম্যান অবশ্য এই প্রথম যোগ দিচ্ছেন শীর্য সম্মেলনে; ইতিপূর্বে এসেছিলেন রুজভেল্ট। শেষ শীর্ষ সম্মেলনের জন্য চিহ্নিত হয়েছিল পরাজিত বার্লিন শহর। দুর্ভাগ্যবশত বার্লিনে এমন একখানা বড় বাড়ি নজর পড়ল না, যেখানে এত বড় সম্মেলন হতে পারে। সমস্ত শহর তখন ধ্বংসস্তূপ। তাই শহরপ্রান্তে ক্রাউন-প্রিন্স উইলহেলম-এর আবাসে আহত হল এই মহাসম্মেলন। ষোলোহ জুলাই প্রথম অধিবেশন বসার কথা, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, স্তালিন সময়মতো এসে পৌঁছাতে পারলেন না। কী করা যায়? সময় কাটাতে প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান গেলেন বার্লিন শহর দেখতে। অর্থাৎ বার্লিনের ধ্বংসস্তূপ দেখতে। সঙ্গে তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ। যুদ্ধসচিব স্টিমসন, সেক্রেটারি অফ স্টেট, নৌবিভাগের অ্যাডমিরাল লেহি প্রভৃতি। এ কাহিনির পক্ষে আপাতদৃষ্টিতে সেই ধ্বংসস্তূপ পরিদর্শনের বর্ণনা বাহুল্য মনে হতে পারে, কিন্তু বোধকরি এরও প্রয়োজন আছে। পরমাণু-বোমা ফেলবার চূড়ান্ত আদেশ যিনি দিয়েছিলেন, সেই মানুষটিকে ঠিকমত চিনে নিতে হলে এটাও উপেক্ষার নয়।
প্রেসিডেন্ট তার স্মৃতিচারণে বলেছেন, “একটা বাড়িও নজর পড়ল না যেটা অনাহত। সবকটিই ক্ষতিগ্রস্ত। হয় ধ্বংসস্তূপ, না হলে হাড়-পাঁজরা বার করে দাঁড়িয়ে আছে প্রেতের মতো। আমাদের গাড়ির ক্যারাভ্যান গিয়ে থামল রাইষ চ্যান্সলারির সামনে। সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। সেই ঝোলা বারান্দাটার চিহ্নমাত্র নেই–যেটির ওপর দাঁড়িয়ে হিটলার তার অনুগামী নাৎসি যুদ্ধবাজদের সামনে বক্তৃতা দিত।”
ট্রুম্যান তো আর সেই ফিজিক্স অথবা ম্যাথসের ছাত্রটি নন–তাহ খোঁজ করে দেখতে চাননি–আইনস্টাইনের বাড়িটা মুখ থুবড়ে পড়েছে অথবা ‘হাড়-পাঁজরা বার করে দাঁড়িয়ে আছে।
