***
নির্ধারিত দিনে প্রায় আড়াই শতজন বৈজ্ঞানিক সমবেত হলেন ‘ট্রিনিটি-টেস্ট’ দেখতে। দুর্ভাগ্যক্রমে বৃষ্টি শুরু হল। আবহাওয়াবিদরা বললেন, রাত দুটোর পর আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাবে। গ্রাউন্ড-জিরো থেকে দশহাজার গজ দূরে (প্রায় নয় কিলোমিটার) তিনটি অবজারবেশন পোস্ট তৈরি হয়েছে। বিশেষভাবে নির্মিত ভূগর্ভস্থ গুহায়। এখানে কয়েকটি যন্ত্রের মাধ্যমে রেকর্ড করা হবে বিস্ফোরণের ফলাফল। বেস-ক্যাম্পের দূরত্ব ষোলো কিলোমিটার। সেখানে ফাঁকায় দাঁড়ানো-না দাঁড়ানো নয়, শোওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ঐ দশ হাজার গজ দূরে থেকে বোতাম টিপে রেডিও-র মাধ্যমে বোমাটাকে ফাটানো হবে। তাই বলে অত দামি জিনিসটাকে তো বিনা রক্ষকে ফেলে রাখা যায় না। তাই স্থির হয়েছে। দু-জন মেশিনগানধারীসহ দুঃসাহসী ক্রিস্টিয়াকৌস্কি ঐ বোমার কাছে পাহারা দেবেন পাঁচটা পর্যন্ত। এঞ্জিন-চালু অবস্থায় একটা জিপ খাড়া থাকবে। ঠিক পাঁচটায় ওঁরা রুদ্ধশ্বাসে জিপে করে পালাবেন। কিস্টি পাকা ড্রাইভার। আধঘন্টায় অনায়াসেই পৌঁছে যাবেন ষোলো কিলোমিটার দূরের নিরাপদ বেস ক্যাম্পে।
কে যেন বলল, কিন্তু ধরুন জিপটা যদি যান্ত্রিক গণ্ডগোলে অচল হয়ে পড়ে?
গ্রোভস্ বলেন, সে কথাও ভেবেছি আমি। তাই তো কিস্টিকে পছন্দ করলাম। ও ভাল দৌড়ায়। কলেজ স্পোর্টস-এ প্রাইজ পেয়েছে। এবার প্রাইজটা তো বড় সামান্য নয়–ওর প্রাণ-কিস্টি আধঘন্টায় নিরাপদ দূরত্বে যাবেই।
ওপেহাইমারকে দশ হাজার গজ দূরত্বে ভূগর্ভস্থ কক্ষে রেখে গ্রোভূস্ চলে গেলেন বেস ক্যাম্পে। অনেকেই আছেন সেখানে। প্রত্যেককে নির্দেশ দেওয়া। হয়েছিল–গণনা শুরু হতেই মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তে হবে। ঠ্যাঙ বোমার দিকে, মাথা উল্টোদিকে। কানে তুলো। চোখ বন্ধ। তার উপর হাত চাপা দিতে হবে। আলোর ঝলকানি চুকে যাওয়ার পর ওদিকে তাকাতে পার–তবে খালি চোখে নয়, বিশেষ পদ্ধতিতে বানানো গগলস পরে। প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছে। সেই চশমা।
ঘোষক গুনতি শুরু করল 5-10 মিনিট থেকে। প্রথমে পাঁচ মিনিটের তফাতে, পরে প্রতি মিনিটে। পাঁচটা উনত্রিশে মিনিটের প্রতি সেকেন্ডে।
পাঁচটা উনত্রিশেও কিন্তু জিপটা এসে পৌঁছাল না। উত্তেজনায় ছটফট করছে সবাই। স্যাশ অ্যালিসন নির্বিকারভাবে সেকেন্ড ঘোষণা করে চলছে: উনষাট… আটান্ন…সাতান্ন….
মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড বাকি থাকতে জিপটা এসে থামল। পড়ি-তো-মরি করে তিনজনে ঢুকে পড়লেন ভূগর্ভস্থ নিরাপদ কক্ষে।
নয়… আট….সাত….
সবাই উপুড় হয়ে শুয়ে আছেন চোখ-কান বন্ধ করে।
একটিমাত্র ব্যতিক্রম। একজন এ আদেশ মানেননি। সজ্ঞানে। সাত সেকেন্ড বাকি থাকতে তড়াক করে লাফিয়ে ওঠেন তিনি। বলে ওঠেন : দুত্তোর! দশ মাইল দূরত্বে এখানে ঘোড়ার ডিম হবে।
নোবেল লরিয়েট লরেন্স শুয়ে ঠিক পাশেই। কানে তুলো গোঁজা, তবু শুনতে পেলেন তিনি কথাটা। কে এমনভাবে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল বুঝতে পারলেন না। মুখ তুলতেও সাহস হল না-: চার ….তিন….দুই….
চীৎকার করে ওঠেন আর্নেস্ট লরেন্স, শুয়ে পড়ো! মরবে তুমি!
লোকটাও চীৎকার করে ওঠে: কী বকছেন স্যার পাগলের মত।
তৎক্ষণাৎ চিনতে পারেন লরেন্স। কিন্তু জবাব দেবার সময় ছিল না। ঘোষক বললে, নাউ।
***
ট্রিনিটি-টেস্ট-এ যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা পরে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন। বৈজ্ঞানিক ছাড়া একজন মাত্র সাংবাদিককে এ পরীক্ষায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনি নিউ ইয়র্ক টাইমস্-এর উইলিয়াম লরেন্স। সকল বর্ণনাই এক সুরে বাঁধা। সুপারলেটিভের ছড়াছড়ি। সেটাই স্বাভাবিক। অভিধান হাতড়ে কেউ উপযুক্ত বিশেষণ খুঁজে পাননি।
ফাইনম্যানের কথা বলি। একমাত্র তিনিই সোজা দাঁড়িয়ে ওদিকে চোখ বুজে তাকিয়েছিলেন। অভিজ্ঞতাটা উনি এমনভাবে বর্ণনা করেছেন: মুহূর্তে সব সাদা হয়ে গেল। যেন অজস্র সূর্য একসঙ্গে আকাশে উঠেছে! চোখ ঝলসে গেল। চোখে ও মাথায় যন্ত্রণা বোধ হল। আমার চোখ বন্ধ ছিল, গগলস-এর নিচে। তাতেই ঐ অনুভূতি হল আমার। পরমুহূর্তেই যন্ত্রণা সত্ত্বেও আমি চোখ খুললাম। সাদা আলোটা ততক্ষণে হলুদ হয়ে গেছে। প্রকাণ্ড একটা ধোঁওয়ার বলয় পাক খেতে খেতে ওপরে উঠে যাচ্ছে। ধোঁয়ার ঐ কুণ্ডলিগুলি ওপরে কমলা রঙের আর একটা আগুনের বলয়–তার কিনারগুলো সিঁদুরে লাল। ওপরে ওপরে আরো ওপরে উঠে গেল। অনাবিষ্কৃত একটা নগ্ন সত্য প্রকাশিত হল যেন–পারমাণবিক বন্ধনমুক্ত মহামৃত্যু। অপূর্ব দৃশ্য! তারপর অস্বাভাবিক একটা নিস্তব্ধতা। আমাদের বেস ক্যাম্পের কেউ কোনো কথা বলেনি। পুরো দেড় মিনিট। তারপর এল বিস্ফোরণের শব্দটা!
দেড় মিনিট পরে। লরেন্স এতটা আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন যে, হঠাৎ বলে ওঠেন, ওটা কিসের শব্দ?
যেন এত বড় একটা বিস্ফোরণের পরে কোনো শব্দই হবে না!
ওপেনহাইমার দশ হাজার গজ দূরের ‘এম’-পয়েন্টে। মন্ত্রমুগ্ধের মত তিনি নাকি বলে ওঠেন :
“নভঃস্পৃশং দীপ্তমনেকবর্ণং ব্যাত্তাননং দীপ্তবিশালনেত্রম্।
দৃষ্টা হি ত্বাং প্ৰব্যথিতান্তরাত্মা ধৃতিং ন বিন্দামি শমং চ বিষ্ণো।”
–ইস দ্যাট গ্রিক প্রফেসর?– প্রশ্ন করেন জেমস ফ্রাঙ্ক।
–নো স্যার। ইটস স্যানস্কৃট! জবাব দিলেন ওপেনহাইমার!
